শিশুকে ‘হ্যাঁ’ বলুন

0
611

ডঃ রাহেনা বেগম, কলাম লেখক. দ্যা মেইল বিডি ডট কম।

একজন ব্যাক্তির স্বাস্থ্য বলতে শুধু শারিরিক স্বাস্থ্য বুঝায় না বরং শারিরিক ও মানসিক উভয় স্বাস্থ্যকেই বুঝিয়ে থাকে। আমরা ছোট বেলা থেকেই আমাদের সন্তানদের কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করি। যেমন- এটা করো না, ওটা ধরো না, প্রশ্ন করো না ইত্যাদি। এভাবে আমরা আমাদের শিশুদের হরেক রকমের নিয়ম-কানুন শিক্ষা দিয়ে থাকি এবং তাদের বিভিন্ন কাজের উপর বিধি নিষেধ আরোপ করে থাকি। কিন্তু শিশুদের এভাবে নিষেধ করলে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

স্বনামধন্য মনো থেরাপিস্ট Pamela Levin গবেষণার ভিত্তিতে শিশুর বিকাশের বিভিন্ন স্তর সর্ম্পকে বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। যা পরবর্তীতে শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে বিশেষ অবদান রাখে। তিনি শিশুদের অনুমতি প্রদানের  ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। শিশুদের সাথে কাজ করতে গিয়ে দেখা যায় Pamela Levin-এর শিশু বিকাশের বিভিন্ন স্তর অনুযায়ী অভিভাবকদের অনুমতি প্রদান বিশেষভাবে কর্যকরী।

বাবা-মা এবং অভিভাবকদের জন্য বলছি, আপনার শিশুর বয়স যখন ০ মাস থেকে ৬ মাস তখন তাদের বিকাশের প্রথম স্তর হিসেবে গন্য করা হয়। Pamela Levin এর মতে এটা শিশুর অস্তিত্ব স্তর। এ স্তর শিশুর বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। এ সময় শিশু বেঁচে থাকার জন্য তার প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে চায়, শিশু আনন্দ করতে চায়।
এই সময় আপনার শিশুকে এভাবে অনুমতি দিন-
শিশুকে স্পর্শ করে বলুন- আমি ধন্য, তুমি আছ। (শিশু যখন পেটে এই সময় যদি মা ও পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে না চান তবে মার এবং পরিবারের সদস্যদের আচরণের প্রভাব পড়ে শিশুর বিকাশে)।
তুমি বেড়ে ওঠ তোমার চাহিদা অনুযায়ী।
তুমি তোমার সব অনুভূতি অনুভব করতে পার।
আমি সানন্দে ও স্বেচ্ছায় তোমাকে ভালবাসি।

শিশুর ৬ মাস থেকে ১৮ মাস বয়স পর্যন্ত দ্বিতীয় স্তর হিসেবে গন্য করা হয়। এ স্তরকে কার্য স্তর বলে। এ সময় শিশু দাঁড়াবে, হাঁটবে, স্পর্শ, অনুভূতি অনুভব করে জগতের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে, আপনজনকে চিনতে ও বিশ্বাস করতে শেখে।
এই সময় আপনার শিশুকে এভাবে অনুমতি দিন-
তুমি কোন কিছু বলতে ও পর্যবেক্ষণ করতে পার এবং আমি তোমাকে সাহায্য ও রক্ষা করবো।
তুমি কোন কিছু বলার সময় তোমার সব রকম অনুভুতি ব্যবহার করতে পার ( পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের কাজ)।
তুমি যে কোন কাজ করতে পার যতবার তোমার প্রয়োজন।
তুমি যা জান, তা জানাতে পার।
তুমি সব ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করতে পার।

শিশুর ১৮ মাস থেকে ৩ বছর বয়স পর্যন্ত তৃতীয় স্তর হিসেবে গন্য করা হয়। এ স্তর হলো চিন্তা স্তর । এ সময় শিশুর চিন্তা শক্তি প্রখর হয়। শিশু কোন কাজ করার পর বাবা-মা এর প্রতিক্রিয়া জানতে চায় ও সেভাবে কাজ করার ক্ষমতা অর্জন করে।
এই সময় আপনার শিশুকে এভাবে অনুমতি দিন-
আমি খুশি ও ধন্য যে তুমি চিন্তা করতে শরু করেছো (তার কাজের প্রশংসা)।
চাহিদা অনুযায়ী “না” কিংবা “হ্যাঁ” বলতে পার।

তুমি একই সময় চিন্তা করার পাশাপাশি অনুভবও করতে পার।
তুমি প্রয়োজনে রাগ প্রকাশ করতে পার, আমি তাতে কষ্ট পাব না (অনুভূতি প্রকাশ)।
তুমি তোমাকে নিয়ে ভাবতে পার এবং আমি আমাকে (মা) নিয়ে ভাবতে পারি (স্বাবলম্বী করা)।
তুমি তোমার চাহিদা অনুযায়ী সাহায্য পেতে পার।
তুমি আমার থেকে দূরে থাকলেও আমি তোমায় ভালবাসতেই থাকবো।

শিশুর ৩ বছর থেকে ৬ বছর বয়স পর্যন্ত চতূর্থ স্তর হিসেবে গন্য করা হয়। এ স্তর হলো আত্ম পরিচয় স্তর । এ স্তরে শিশু নিজের সম্পর্কে এবং অপরকে জানতে আগ্রহী হয় ও জানার ক্ষমতা অর্জন করে। এ সময় শিশুর সামাজিকতা বৃদ্ধি পায় এবং শিশুরা স্বপ্ন দেখতে শেখে।
এই সময় আপনার শিশুকে এভাবে অনুমতি দিন-
তুমি প্রকাশ করতে পার তুমি কে এবং জানতে পার তোমার চারপাশে অন্য মানুষ কারা।
তুমি নিজেকে শক্তিশালী ভাবতে পার এবংং পাশাপাশি অন্যদেরও সাহায্য নিতে পার।
তোমার আচরণ থেকে তুমি শিক্ষা নিতে পার।
তোমার সব রকমের অনুভূতিই আমি গ্রহণ করছি।

শিশুর ৬ বছর থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত পঞ্চম স্তর হিসেবে গন্য করা হয়। এ স্তর হলো দক্ষতার স্তর । এ সময় শিশুরা কোন কাজের দক্ষতা অর্জন করে। মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা হয়। এ সময় তারা নিজেকে নিজের মতো করে গঠণ করে। এ সময় শিশু বিভিন্ন নিয়ম ও স্বাধীনতা সম্পর্কে ধারণা হয়।
এই সময় আপনার শিশুকে এভাবে অনুমতি দিন-
কোন বিষয় সম্পর্কে না/হ্যাঁ বলার আগে তুমি চিন্তা করতে পার এবং তোমার ভুল থেকে তুমি শেখতে পার।
তোমার ইচ্ছার প্রতি তুমি বিশ্বাস রাখতে পার এবং নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পার।
তুমি তোমার কাঙ্খিত কাজের পথ খুঁজে বের করতে পার।
তুমি কোন বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করতে পার।
তুমি নিয়ম শেখতে পার, যা অন্যদের সাথে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করবে।
তুমি যখন দ্বিমত পোষণ কর, তখনও আমি তোমাকে ভালবাসি।

শিশুর ১৩ বছর থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ষষ্ঠ স্তর হিসেবে গন্য করা হয়। এ স্তর হলো নব জীবন সঞ্চারন স্তর। এ সময় শিশুর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। লিঙ্গের পার্থক্যের অভিজ্ঞতা অর্জন করে ও শারীরিক পরিবর্তন অনুভব করে। তার অপূর্ণ চাহিদাকে পূরণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে।
এই সময় আপনার শিশুকে এভাবে অনুমতি দিন-
তুমি জানতে পার, তুমি কে? এবং তোমার যোগ্যতাকে কিভাবে কাজে লাগাতে হবে।
সম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে নিজের আগ্রহ বাড়াতে সক্ষম।
তুমি বড় হবে/বয়ঃসন্ধিকাল অতিক্রম করবে আমি সে অপেক্ষায় আছি।
আমার ভালবাসা তোমার সাথে আছে এবং আমার বিশ্বাস তোমার কোন সাহায্যের প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবে।
আসুন আমরা আমাদের সন্তানদেরকে এভাবে অনুমতি প্রদান করে তাদের ব্যত্তিত্বের সঠিক বিকাশে সাহায্য করি। সবশেষ বলতে পারি ‘Change your word, Chang your world.’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here