ঢাকা
সাত দিনের ‘প্রক্সি’ থেকে সেরা অভিনেতা, গানের মানুষ মাসুম আজিজের অভিনয়জীবনের গল্প
নিজস্ব প্রতিবেদন | দ্য মেইল বিডি
গান ছিল তাঁর প্রথম ভালোবাসা। কিশোর বয়স থেকেই গানের চর্চা করতেন, বাজাতেন বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু কে জানত, একটি নাটকে অন্যের হয়ে মাত্র সাত দিন অভিনয় করতে গিয়েই বদলে যাবে তাঁর জীবনের গতিপথ! যে মানুষটি নাটকে যুক্ত হয়েছিলেন আবহসংগীত তৈরির জন্য, একসময় অভিনয়ই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—তিন মাধ্যমেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। তিনি অভিনেতা, নাট্যনির্দেশক ও চিত্রনাট্যকার মাসুম আজিজ।
২০২২ সালের ১৭ অক্টোবর পৃথিবী ছেড়ে চলে যান এই গুণী শিল্পী। তাঁর মৃত্যুর চার বছর পূর্ণ হয়েছে। তবে শিল্পের প্রতি গভীর ভালোবাসা, অভিনয়ের প্রতি নিবেদন এবং অসংখ্য স্মরণীয় কাজের মধ্য দিয়ে আজও দর্শকের মনে বেঁচে আছেন তিনি। গানের মানুষ থেকে অভিনয়ের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে সংগ্রাম, পরিশ্রম আর মঞ্চের প্রতি এক অসাধারণ টান।
ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করতে গিয়ে অভিনয়ে হাতেখড়ি
মাসুম আজিজের অভিনয়জীবনের শুরুটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় আন্তবিশ্ববিদ্যালয় হল নাটক প্রতিযোগিতায় একটি নাটকের আবহসংগীত তৈরির দায়িত্ব পান তিনি। তখন নাটকের আবহসংগীত তৈরিতে ক্যাসেট ব্যবহার করা হতো। সংগীতের প্রতি আগ্রহ থেকেই কাজটি নিয়েছিলেন তিনি।
নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল শফিক কামাল নামের এক শিক্ষার্থীর। কিন্তু নিয়মিত মহড়ায় উপস্থিত না থাকায় হলের প্রভোস্ট মাসুম আজিজকে সেই চরিত্রে অভিনয় করার প্রস্তাব দেন। শুরু হয় অন্যের হয়ে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা—যাকে বলা যায় অভিনয়ের ‘প্রক্সি’।
টানা সাত দিন অন্য অভিনেতার পরিবর্তে মহড়ায় অংশ নেন তিনি। পরে শফিক কামাল নাটকটি করবেন না বলে জানালে প্রধান চরিত্র নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত শফিক হায়দার চৌধুরীর পরামর্শে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন মাসুম আজিজ।
এরপর আসে সেই সাফল্য, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রতিযোগিতায় নাটকটি সেরা অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করে। সংগীতের জন্য নাটকে যুক্ত হওয়া মাসুম আজিজের সামনে খুলে যায় অভিনয়ের নতুন দিগন্ত। সেই প্রথম সাফল্যই তাঁকে অভিনয়ের প্রতি আরও গভীরভাবে আগ্রহী করে তোলে।
অভিনয়ের পর নির্দেশনায়ও সাফল্য
প্রথম নাটকে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা মাসুম আজিজকে থিয়েটারের আরও কাছে নিয়ে যায়। চট্টগ্রামের মঞ্চনাটকের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বাড়তে থাকে। পরের বছর আন্তহল নাটক প্রতিযোগিতায় নাটক নির্মাণের দায়িত্বও পান তিনি।
এবার অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনায় নিজের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ আসে। ঋত্বিক কুমার ঘটকের ‘জ্বালা’ নাটকটি পরিচালনা করে প্রশংসা অর্জন করেন তিনি। নাটকটির জন্য আন্তবিশ্ববিদ্যালয় হলের সেরা নির্দেশক নির্বাচিত হওয়াও ছিল তাঁর জন্য উল্লেখযোগ্য অর্জন।
অভিনয় ও নির্দেশনা—দুই ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক সাফল্য তাঁকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়া সম্ভব, এই বিশ্বাস তাঁর মধ্যে দৃঢ় হতে থাকে। একই সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, বড় পরিসরে কাজ করতে হলে তাঁকে ঢাকায় আসতে হবে।
ঢাকায় এসে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় আসেন মাসুম আজিজ। শিক্ষক শফিকুল আমানের মাধ্যমে নাট্যনির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তবে ঢাকায় এসে নাটকের জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করা সহজ ছিল না।
জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন সময়ে চাকরি করেছেন। প্রিন্টিং সরবরাহের ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু পেশাগত ব্যস্ততা কখনোই অভিনয়ের প্রতি তাঁর টানকে মুছে দিতে পারেনি। কাজের বাইরে বাসায় হারমোনিয়াম নিয়ে নিয়মিত রেওয়াজ করতেন। সংগীতের চর্চাও চলত পাশাপাশি।
একসময় চাকরির নিরাপত্তার চেয়ে মঞ্চের টান তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে। অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি মঞ্চনাটককে আরও গুরুত্ব দিতে শুরু করেন।
পরে এস এম সোলায়মানের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। সোলায়মানের মাধ্যমে জামিল আহমেদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর ‘ইন্সপেক্টর জেনারেল’ নাটকে ডিসি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ আসে। এই অভিজ্ঞতা মঞ্চে তাঁর পথচলাকে আরও দৃঢ় করে। এরপর ঢাকা পদাতিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয় চালিয়ে যান তিনি।
মঞ্চ থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্র
দীর্ঘদিন মঞ্চে কাজ করার পর ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে অভিনয় শুরু করেন মাসুম আজিজ। ধীরে ধীরে টেলিভিশন দর্শকের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। চরিত্রের ধরন অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা এবং অভিনয়ে স্বাভাবিকতা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেয়।
হুমায়ূন আহমেদের ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’ এবং সালাহউদ্দিন লাভলুর ‘তিন গ্যাদা’সহ বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করে দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। মঞ্চের অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়ে যে গভীরতা তৈরি করেছিল, টেলিভিশনেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।
শুধু নাটকেই সীমাবদ্ধ থাকেননি মাসুম আজিজ। চলচ্চিত্রেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘ঘানি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০০৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি পান তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্যকার ও নাট্যনির্মাতা হিসেবেও কাজ করেছেন।
সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘সনাতন গল্প’ চলচ্চিত্র পরিচালনা তাঁর সৃজনশীল জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
গান দিয়ে শুরু হওয়া যে যাত্রা একদিন তাঁকে মঞ্চে নিয়ে গিয়েছিল, সেই যাত্রাই তাঁকে পৌঁছে দেয় দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ এক অবস্থানে।
মঞ্চের প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা
মাসুম আজিজের শিল্পীসত্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মঞ্চের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে পরিচিতি অর্জন করলেও মঞ্চের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আবেগের, ভালোবাসার।
এক সাক্ষাৎকারে মঞ্চের প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যদি মঞ্চে অভিনয় করতে করতেই মারা যেতাম, তাহলে আমি হতাম ভাগ্যবান ব্যক্তি।’
এই বক্তব্যের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে তাঁর শিল্পীজীবনের দর্শন। অভিনয় তাঁর কাছে শুধু পেশা ছিল না; ছিল বেঁচে থাকার আনন্দ, নিজেকে প্রকাশ করার মাধ্যম এবং জীবনের গভীরতম ভালোবাসা।
মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে দর্শকের সামনে চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার যে আনন্দ, সেটিই তাঁকে বারবার ফিরিয়ে এনেছে অভিনয়ের কাছে। জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়েও তিনি শিল্পচর্চা চালিয়ে গেছেন।
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই, তারপর চিরবিদায়
জীবনের শেষ অধ্যায়ে দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে মাসুম আজিজকে। তিনি ক্যানসার ও হৃদ্রোগে ভুগছিলেন। ২০২২ সালের শুরুর দিকে তাঁর ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ে। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মৃত্যুর চার দিন আগে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ২০২২ সালের ১৭ অক্টোবর দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।
তাঁর চলে যাওয়ায় দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিনের কাজের মধ্য দিয়ে যে অবস্থান তিনি তৈরি করেছিলেন, তাঁর প্রয়াণে সেই জায়গায় তৈরি হয় শূন্যতা।
স্মৃতিতে মাসুম আজিজ, বেঁচে থাকবেন তাঁর অভিনয়ে
মাসুম আজিজের জীবন কেবল একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়; এটি নিজের ভালোবাসার পথে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। সংগীতের প্রতি আগ্রহ নিয়ে নাটকে যুক্ত হওয়া, অন্যের পরিবর্তে অভিনয় করতে গিয়ে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পাওয়া, ঢাকায় এসে সংগ্রাম করা এবং শেষ পর্যন্ত অভিনয়কে জীবনের প্রধান পরিচয় করে তোলা—প্রতিটি অধ্যায়ই অনুপ্রেরণার।
তিনি আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্র, মঞ্চের প্রতি নিবেদন এবং শিল্পের জন্য নিরলস পরিশ্রম তাঁকে দর্শকের স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখবে। একজন শিল্পীর প্রকৃত সার্থকতা হয়তো এখানেই—শারীরিক অনুপস্থিতির পরও তাঁর কাজ মানুষের মনে অনুভূতি জাগায়, নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
গানের মানুষ মাসুম আজিজ শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিলেন অভিনয়ের এক নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী। তাঁর জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দ্য মেইল বিডি — শিল্প, সংস্কৃতি ও বিনোদনজগতের গুরুত্বপূর্ণ খবর জানতে আমাদের সঙ্গে থাকুন।


