নোয়াখালী প্রতিনিধি :
ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ নিয়ে নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় তৈরি হয়েছে এক আতঙ্কের সাম্রাজ্য। এই অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল হোতা বাটইয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের জসিম—যিনি এখন এলাকায় ‘চাঁদা জসিম’ নামে পরিচিত। চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল এবং সর্বশেষ সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিক মোহাম্মদ শহিদ কে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যার হুমকির মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
তবে ঘটনার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। কবিরহাট উপজেলা বিএনপি, জেলা বিএনপি এবং নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলামসহ স্থানীয় শীর্ষ নেতারা জনসমক্ষে “ব্যক্তির অপকর্মের দায় দল নেবে না” বলে সাফাই গাইলেও, বাস্তবে জসিমের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিতে নারাজ। এই রহস্যজনক নীরবতা, পরোক্ষ আশ্রয় এবং উপজেলা বিএনপির দুই-তিনজন নেতা জসিমকে বাঁচাতে মরিয়া তৎপরতায় তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে দলের ত্যাগী নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে।
অপরাধের বিস্তার: চাঁদাবাজি, মাদক আর ‘জসিম বাহিনী’র তান্ডব স্থানীয় ভুক্তভোগী, ব্যবসায়ী ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দেওয়া তথ্য এবং গণমাধ্যমে একের পর এক সংবাদ প্রকাশের পরও জসিম বাহিনীর অপরাধচক্র থামেনি।সাধারণ মানুষ ও বাজার জিম্মি: জসিম ও তার গঠিত সন্ত্রাসী বাহিনীর অত্যাচারে পুরো বাটইয়া ইউনিয়নের প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার মানুষ আজ জিম্মি হয়ে পড়েছে। তার বাহিনীর ভয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা স্থানীয় হাট-বাজারে যাতায়াত করতে পর্যন্ত আতঙ্কে ভুগছেন।
মাদক ও দখল বাণিজ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয়দের জমি দখলের পাশাপাশি এলাকায় মাদকের সিন্ডিকেট পরিচালনা করার অভিযোগ রয়েছে এই নেতার বিরুদ্ধে। দায় এড়ানোর রাজনৈতিক কৌশল ও বিতর্কিত ভূমিকা জসিমের বিরুদ্ধে ডজনখানেক লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ জমা পড়লেও কবিরহাট উপজেলা বিএনপি এবং নোয়াখালী-৫ আসনের শীর্ষ নেতাদের অবস্থান কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নেতাদের বুলি বনাম বাস্তব চিত্র নেতারা মুখে বলছেন—“জসিমের অপরাধ একেবারেই তার ব্যক্তিগত বিষয়, দলের নাম ভাঙিয়ে অপরাধ করলে বিএনপি সেই দায় নেবে না।” কিন্তু কবিরহাটের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
বিচারের নামে প্রহসন সাংগঠনিক কঠোরতার দোহাই দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত জসিমকে কোনো কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ দেওয়া হয়নি, স্থগিত বা বহিষ্কার করা হয়নি তার পদ-পদবি। প্রশাসনের নীরবতা: স্থানীয়দের স্পষ্ট অভিযোগ, উপজেলা বিএনপির দুই-তিনজন প্রভাবশালী নেতা জসিমকে রক্ষা করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার কারণ চাঁদা জসিমের চাঁদাবাজির অর্থের একটি অংশ উপজেলার দুই তিন নেতাদের পকেটে যায়।
নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের এই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকার কারণেই পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছে না। তৃণমূলের ক্ষোভ ও বিএনপির ভাবমূর্তি সংকট জসিম ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে ঐতিহ্যবাহী নোয়াখালী-৫ আসনে বিএনপির ভাবমূর্তি আজ চরম হুমকির মুখে।
রাজপথের ত্যাগী নেতারা এই পরিস্থিতিতে চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ। বাটইয়া ইউনিয়নের একাধিক ত্যাগী বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান,আমরা বছরের পর বছর রাজপথে জেল-জুলুম, হামলা-মামলার শিকার হয়ে রক্ত দিয়ে দল ধরে রেখেছি। আর আজ জসিমের মতো দু-একজন চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীর কারণে পুরো দলকে লজ্জিত হতে হচ্ছে।
জসিম বাহিনীর কাছে এলাকার হাজার হাজার মানুষ আজ বন্দি। দলীয় হাইকম্যান্ড যদি এখনই এসব আগাছা দূর না করে, তবে আগামীতে সাধারণ জনগণ বিএনপি থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেবে। জনদাবি ও সচেতন মহলের হুঁশিয়ারি ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক সচেতন মহল অবিলম্বে দুটি সুনির্দিষ্ট দাবি সাংগঠনিক ব্যবস্থা বিতর্কিত নেতা আবদুল কাদের জসিম ওরফে ‘চাঁদা জসিম’কে অনতিবিলম্বে বিএনপি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে।
এবং আইনি পদক্ষেপ: সাংবাদিককে হত্যার হুমকি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ তার সমস্ত অপকর্মের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ আইনি তদন্ত করে তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি নেতৃত্ব যদি অবিলম্বে এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করে, তবে নোয়াখালীর এই ঐতিহ্যবাহী দুর্গে দলের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার পাশাপাশি জনবিচ্ছিন্নতা চরম আকার ধারণ করবে।


