নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রকৃতির সাথে সমন্বয়, টেকসই কৃষি ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত হলো ‘কৃষিপ্রতিবেশ বিদ্যা, জলবায়ু ন্যায্যতা ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব’ শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালা। বুধবার (১৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত নেত্রকোনার বারসিক রামেশ্বরপুর রিসোর্স সেন্টারে সময়োপযোগী এই আয়োজন সম্পন্ন হয়।
নেত্রকোনা অঞ্চলের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় নিজেদের চর্চার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অবদান রাখছেন অভিজ্ঞ একদল কৃষক-কৃষাণি। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে তারা গড়ে তুলেছেন অনন্য প্রকৃতি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা, যা গতানুগতিক রাসায়নিক নির্ভর কৃষি চর্চা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাদের এই উদ্যোগ বর্তমানে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অভিজ্ঞ কৃষকদের উদ্যোগকে আরও বেগবান করতেই এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
এগ্রোইকোলজি বা কৃষি-পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে যুক্ত ২৫ জন কৃষক-কৃষাণিকে নিয়ে এ কর্মশালার আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক। কর্মশালায় বর্তমান কৃষি সংকট, এগ্রোইকোলজির মূল উপাদান ও তার সমাধান, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব, টেকসই কৃষি, খাদ্য সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের নানাবিধ দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন বারসিক কর্মকর্তা শংকর ম্রং, অহিদুর রহমান এবং পার্বতী সিংহ।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী কৃষক-কৃষাণিরা সম্পদ ব্যক্তি (রিসোর্স পারসন) হিসেবে নিজেদের অভিজ্ঞতা, কৃষিকাজের নানা সংকট এবং সফলতার গল্পগুলো তুলে ধরেন। তারা জানান, ফসলের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, মাটির উর্বরতা রক্ষা, পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, জৈব সার প্রস্তুত ও এর প্রয়োগ এবং বাড়ির আঙিনার প্রতিটি স্থানকে উৎপাদনের আওতায় আনার মাধ্যমে তারা ইতোমধ্যে টেকসই কৃষির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের উদ্যোগ শুধু পরিবারের পুষ্টির চাহিদাই পূরণ করছে না, বরং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থারও ব্যাপক বিকাশ ঘটাচ্ছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে কৃষক-কৃষাণিরা মত প্রকাশ করেন, প্রতিটি গ্রামে একটি করে ‘এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার’ এবং ‘বীজঘর’ গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর ফলে কৃষির ওপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি কৃষক, উৎপাদক ও ভোক্তার অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
কর্মশালায় বক্তারা উল্লেখ করেন, এগ্রোইকোলজির মূল দর্শনই হলো প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান বজায় রেখে স্থানীয় জ্ঞান, বীজ ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হয়, ক্ষতিকর রাসায়নিক উপকরণের ব্যবহার কমে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পায় এবং সর্বোপরি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এগ্রোইকোলজি ও খাদ্য সার্বভৌমত্বের সমন্বিত চর্চা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, কৃষকের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত উদ্যোগ দেশের কৃষি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।


