নিজস্ব প্রতিবেদক: আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে নেত্রকোনার পূর্বধলা থানায় গ্রাম পুলিশ সদস্যদের নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার এই প্রহরীদের কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি, দিকনির্দেশনা প্রদান এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলোচনার এক কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে এই আয়োজন।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় পূর্বধলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনের উদ্যোগে থানা কম্পাউন্ডে এই প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
থানার ওসি সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. তরিকুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) স্বজল কুমার সরকার, পূর্বধলা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হাবিবুর রহমান (পিপিএম) এবং শ্যামগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. সেন্টু মিয়া।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম গ্রাম পুলিশ সদস্যদের সততা, দেশপ্রেম ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আইন অনুযায়ী কাজ করতে হবে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা শত্রুতা চরিতার্থ করার কোনো সুযোগ নেই।”
দেশকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “এই দেশ আমাদের মা। মায়ের মুখ কি আমরা মলিন চাই? চাই না। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। আপনারা সঠিক পথে থাকলে যথাযথ বিচার পাবেন।” ২০২৪ সালের ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা বজায় রেখে দেশের সার্বিক উন্নতি সাধনে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করারও তাগিদ দেন তিনি।
নিজ নিজ এলাকায় যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা, চুরি, ডাকাতি বা ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির খবর তাৎক্ষণিকভাবে থানা পুলিশকে জানানোর কড়া নির্দেশ দেন এসপি। ভালো কাজের স্বীকৃতি ও উৎসাহ জোগাতে তিনি ঘোষণা দেন, এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে ভালো কাজের জন্য গ্রাম পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করা হবে। ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি বা মাদক ব্যবসায়ীদের ধরিয়ে দিলে বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকবে।
এরই দৃষ্টান্ত হিসেবে কর্মশালা চলাকালেই নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিহত করার সাহসী ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ উপজেলার খলিশাউড় ইউনিয়নের ‘আহাদ মিয়া’ নামের এক গ্রাম পুলিশ সদস্যকে উপস্থিত সকলের সামনে পুরস্কৃত করা হয়।
মাদক নির্মূলের বিষয়ে উপস্থিত গ্রাম পুলিশ সদস্যরাও তাদের দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, পুলিশের পাশাপাশি নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কাজ করছেন এবং ভবিষ্যতেও এই তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। তবে সীমান্ত এলাকা দিয়ে আসা মাদকের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আরও কঠোর নজরদারির দাবি জানান তারা।
উন্নয়ন ও নির্দেশনার এই আয়োজনের মাঝেই জোরালোভাবে উঠে আসে গ্রাম পুলিশদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর জীবন সংগ্রামের করুণ চিত্র। উপস্থিত সদস্যরা জানান, গত দুই মাস ধরে তাদের বেতন বন্ধ রয়েছে। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কঠিন সময়ে মাত্র সাড়ে সাত হাজার টাকা মাসিক বেতনে সংসার চালানো তাদের জন্য রীতিমতো দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। নিয়মিত ভাতা ও সম্মানজনক পোশাকের অভাব তাদের কাজের পথে বড় বাধা তৈরি করছে।
দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধ, মানসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করতে তারা সরকারের শীর্ষ মহল ও জেলা প্রশাসকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার তৃণমূলের এই প্রহরীদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাদের এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যাতে তারা আরও নিষ্ঠা ও নিশ্চিন্ত মনে দেশের সেবা করতে পারেন।


