নিজস্ব প্রতিবেদক: বইয়ের পাতায় পড়া কৃষির গল্পগুলো যখন চোখের সামনে বাস্তবে ধরা দেয়, তখন তা শিক্ষার্থীদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। ঠিক এমন অনন্য এক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলো নেত্রকোনা সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের আব্বাছিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫০ জন শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় তারা ছুটে যায় ফচিকা গ্রামের আদর্শ কৃষাণী আঁখি আকতারের বাড়িতে, যা স্থানীয়ভাবে ‘শতবাড়ি’ নামে পরিচিত। উদ্দেশ্য- সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ও নিরাপদ সবজি উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনার বাস্তব জ্ঞান অর্জন করা।
এদিন আঁখি আকতারের ফুলে-ফলে ভরা সবুজ আঙিনাটি কিছুক্ষণের জন্য পরিণত হয়েছিল ‘জীবন্ত শ্রেণিকক্ষে’। প্রকৃতিপ্রেমী প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের পরিদর্শনের মূল লক্ষ্য ছিল পারিবারিক পর্যায়ে কীভাবে রাসায়নিকমুক্ত কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা।
কৃষাণী আঁখি আকতার তার নিজের বসতবাড়ির আঙিনাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন অনুকরণীয় পরিবেশবান্ধব কৃষি ক্ষেত্র। কোনো প্রকার রাসায়নিক সার ও ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে তিনি ফলাচ্ছেন নানা জাতের বৈচিত্র্যময় মৌসুমি সবজি। কীভাবে সাধারণ বাড়ির আঙিনাকে কাজে লাগিয়ে পরিবারের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও বিষমুক্ত কৃষিবাড়ি গড়ে তোলা সম্ভব, তা তিনি অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন।
পরিদর্শনকালে শিক্ষার্থীরা গভীর আগ্রহ নিয়ে আঁখি আকতারের পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনার মূল কৌশলগুলো শোনে। কীভাবে রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ও গোবর দিয়ে জৈব সার বা কম্পোস্ট তৈরি করতে হয়, প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে কীভাবে মাটির উর্বরতা রক্ষা করা যায় এবং স্থানীয় জাতের বীজ কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়- এসব বিষয়ে তারা সরাসরি কৃষাণীর কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করে।
এছাড়া, ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের বদলে সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে কীভাবে পোকা-মাকড় দমন ও ফসলের যত্ন নিতে হয়, তা জেনে শিক্ষার্থীরা রীতিমতো বিস্মিত হয়। অনেকেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করে নিজেদের বাড়ির আঙিনায় এমন বিষমুক্ত সবজি বাগান করার দৃঢ় আগ্রহ প্রকাশ করে।
শিক্ষার্থীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও শেখার আগ্রহ দেখে আব্বাছিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের শুধু বইয়ের চার দেওয়ালে আটকে রাখলে চলবে না, মাঠপর্যায়ে এসে পরিবেশবান্ধব কৃষির সাথে পরিচিত হওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আঁখি আকতারের মতো উদ্যোমী নারীরাই আমাদের নতুন প্রজন্মকে প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে আসবে এবং বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে।”
শিক্ষার্থীদের নিজ চোখে দেখার অদম্য কৌতূহল এবং সরাসরি শেখার আগ্রহ আগামী দিনে দেশে ‘কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা’ বা এগ্রো-ইকোলজি চর্চাকে বহুদূর এগিয়ে নেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমান সময়ে খাদ্যে বিষক্রিয়া ও রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে যখন জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে, তখন আঁখি আকতারের ‘শতবাড়ি’ মডেল আশার এক আলো।
সুস্থ, রোগমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে পারিবারিক পর্যায়ে এমন নিরাপদ বিষমুক্ত কৃষি উদ্যোগ আজ ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। আব্বাছিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী শিক্ষাসফর প্রমাণ করে, সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আগামী প্রজন্মই গড়ে তুলবে নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবুজ বাংলাদেশ।


