নিজস্ব প্রতিবেদক: চোখে ছিল প্রবাসে গিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও গিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের হাবিবুর রহমান (৪০)। কিন্তু বাড়ি ফেরা হলো না তার; ফিরলো কেবল নিথর দেহ। একটি ‘ক্লুলেস’ বা সূত্রবিহীন হত্যাকাণ্ডের ধোঁয়াশায় ঢাকা পড়েছিল পুরো ঘটনাটি। অবশেষে সেই জমাট বাঁধা রহস্যের জট খুলতে সক্ষম হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার তদন্তে প্রাপ্ত আসামি সাগরকে (৩১) নেত্রকোনা থেকে গ্রেফতার করেছে সিপিএসসি, এসআরবি-১৪, ময়মনসিংহের একটি আভিযানিক দল।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকালে এসআরবি-১৪ এর অধিনায়কের পক্ষে মিডিয়া অফিসার ও সহকারী পরিচালক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
পারিবারিক সচ্ছলতা ফেরাতে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নাসিরনগর থানার কালিউতা গ্রামের মৃত আব্দুস সামাদের ছেলে হাবিবুর রহমান। গত ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় একদিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিতে হাসি মুখেই বাড়ি থেকে বের হন তিনি। কর্মশালা শেষে স্বপ্নজয়ের আনন্দ নিয়ে ঢাকা কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যেই ট্রেনে চেপেছিলেন হাবিবুর। কিন্তু কে জানতো, এটাই তার জীবনের শেষ যাত্রা! ট্রেনে ওঠার পর থেকেই তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায় এবং পরিবারের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
উদ্বিগ্ন পরিবার যখন সম্ভাব্য সব জায়গায় হন্যে হয়ে খুঁজছিল, ঠিক তখনই ৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে হাবিবুরের ফোন থেকে একটি কল আসে। ফোনের ওপার থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি জানায়, হাবিবুর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকার মহাখালীর একটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। চিকিৎসার কথা বলে দ্রুত মোটা অঙ্কের টাকাও দাবি করে ওই ব্যক্তি। সন্দেহ হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা টাকা পাঠানো থেকে বিরত থাকেন। এরপর থেকে ফোনটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
চারদিকে হতাশা আর খোঁজাখুঁজির মধ্যেই গত ৭ সেপ্টেম্বর নাসিরনগর থানার হরিপুর এলাকায় একটি অজ্ঞাত লাশের সন্ধান মেলে। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে স্বজনরা লাশটি নিখোঁজ হাবিবুর রহমানের বলে শনাক্ত করেন। পরিবারের সেই মুহূর্তের কান্না আর আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পুরো হাসপাতাল এলাকা। প্রবাসে যাওয়ার রঙিন স্বপ্ন মুহূর্তেই পরিণত হয় গাঢ় অন্ধকারে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১২ সেপ্টেম্বর নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে নাসিরনগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলাটি ছিল সম্পূর্ণ ‘ক্লুলেস’ বা সূত্রবিহীন। কে বা কারা, কেন এই নিরীহ মানুষটিকে হত্যা করলো- তার কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না কারও কাছে। তবে হাল ছাড়েনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
অপরাধ দমনে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে পেশাদারিত্বের সাথে তদন্তে নামে এসআরবি-১৪। সনাতন পদ্ধতির বাইরে গিয়ে তারা বেছে নেয় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জিপিএস ট্র্যাকিং ও সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা নজরদারি। দিনের পর দিন নিরলস প্রচেষ্টায় তারা আসামির অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
অবশেষে সোমবার দিবাগত রাত (২২ সেপ্টেম্বর) ১২টা ১০ মিনিটের দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নেত্রকোনা সদর থানার ঠাকুরকোনা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে এসআরবি-১৪। সেখান থেকেই গ্রেফতার করা হয় সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা সাগরকে। তদন্তে হাবিবুর হত্যাকাণ্ডে এই সাগরের সম্পৃক্ততার বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে আসে।
এসআরবি-১৪ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেফতারকৃত আসামিকে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।কটি স্বপ্নবাজ মানুষের এমন করুণ মৃত্যুতে কালিউতা গ্রামে এখনো শোকের ছায়া বিরাজ করছে। তবে সূত্রবিহীন এই হত্যার মূল আসামি ধরা পড়ায় হাবিবুরের স্ত্রীর চোখে এখন শুধু ন্যায়বিচারের অপেক্ষা।


