রুহুল আমিন,ডিমলা(নীলফামারী)
একসময় এখানে বসে জমিদারের কর্মচারীরা আদায় করতেন প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা। সময়ের পরিক্রমায় সেই কাচারি ঘরই হয়েছে ইউনিয়ন ভূমি অফিস। কিন্তু ভবনটির বয়সের ভার যেন আর সইছে না। দেয়ালে ফাটল, খসে পড়ছে পলেস্তারা, টিনের ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে ভিজছে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। যে স্টোররুমে থাকার কথা ভূমিসংক্রান্ত মূল্যবান দলিল-দস্তাবেজ, সেখানে এখন বাদুড়ের বসবাস। মেঝেতে ছড়িয়ে আছে বাদুড়ের বিষ্ঠা, কক্ষজুড়ে দুর্গন্ধ। পানি নেই নলকূপে, ব্যবহার অনুপযোগী শৌচাগার। তার ওপর কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংকট। এমন পরিস্থিতিতে চলছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম।
সরেজমিনে দেখা যায়, গয়াবাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশের পুকুরের পূর্ব দিকে ছোট একটি টিনশেড ভবনে চলছে ভূমি অফিসের কার্যক্রম। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবনটি একসময় জমিদার সুমেরু গিরির ছেলে জমিদার আশুতোষ গিরির খাজনা আদায়ের কাচারি ঘর ছিল। সেই পুরোনো কাচারি ঘরেই এখন চলছে আধুনিক ভূমিসেবা দেওয়ার দাপ্তরিক কার্যক্রম।
ভবনটিতে রয়েছে ছোট তিনটি কক্ষ। একটি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার, একটি দাপ্তরিক কাজের এবং অন্যটি স্টোররুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কক্ষগুলোর অবস্থা মোটেও কাজের উপযোগী নয়। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা। ছাদের টিন ও কাঠের অংশও নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টির সময় টিনের ছিদ্র ও ফাঁক দিয়ে পানি পড়ে সরাসরি ভিজে যায় সরকারি নথিপত্র। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকায় গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও আসবাবপত্রের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা স্টোররুমের। সরকারি নথিপত্র সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা যে কক্ষটির, সেখানে বাদুড়ের বসবাস। মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বাদুড়ের বিষ্ঠা। কক্ষজুড়ে দুর্গন্ধময় পরিবেশ। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নথিপত্র সংরক্ষণ কতটা নিরাপদ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অফিসের প্রবেশপথের পাশেই রয়েছে একটি শৌচাগার। সেটির দরজা এতটাই জরাজীর্ণ যে সামান্য ধাক্কা দিলেই খুলে যায়। শৌচাগারের পাশে থাকা নলকূপটিও দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। ফলে পানি ব্যবহারের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ভর করতে হচ্ছে পাশের পুকুরের ওপর। অফিসে সরকারি জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে সেটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
অবকাঠামোগত দুরবস্থার পাশাপাশি অফিসটিতে রয়েছে জনবলসংকট। স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্তত পাঁচজন কর্মচারী প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। তাঁরা হলেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রায়হান কবির, জারীকারক শামসুন্নাহার ও অফিস সহায়ক ইমরান হোসেন।
এর মধ্যে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রায়হান কবির সপ্তাহে তিন দিন গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। বাকি দুই দিন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পাশের খালিশা চালানী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কাজ করেন। ফলে গয়াবাড়ি অফিসে তাঁর উপস্থিতি সপ্তাহের সব দিন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে এসে প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশীদের।
দক্ষিণ গয়াবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা হাজরত আলীর অভিজ্ঞতাও তেমন। তিনি বলেন, “এর আগে দুইবার অফিসে এসে তহশিলদারকে না পেয়ে ফিরে গেছি। তৃতীয়বার এসে দুপুর ১২টার দিকে তাঁকে পেয়েছি। তিনি আমাকে ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ দেওয়ার কথা বলেছেন।”
শুধু কর্মকর্তার উপস্থিতি নয়, সেবা পেতেও দীর্ঘ অপেক্ষার অভিযোগ রয়েছে। পশ্চিম খড়িবাড়ি গ্রামের খলিলুর রহমান জানান, সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে নামজারি খতিয়ান সৃজনের জন্য আবেদন করেছিলেন। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন পাওয়ার কথা থাকলেও দেড় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি। এতে তাঁকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হুমায়ুন কবির বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসটির এমন বেহাল অবস্থা। বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে। এ পরিবেশে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ করতেও সমস্যা হয়। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দ্রুত ভবনটি সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন।”
আরেক বাসিন্দা শ্রী পরিমল চন্দ্র রায় বলেন, “ভূমিসংক্রান্ত কাজে অফিসে এলে অনেক সময় প্রয়োজনীয় কর্মকর্তাকে পাওয়া যায় না। জনবল কম থাকায় কাজ শেষ করতেও দেরি হয়। এতে সাধারণ মানুষকে বারবার অফিসে আসতে হয় এবং সময় ও অর্থের অপচয় হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত জনবলসংকট নিরসন করে সেবার মান উন্নত করা।”
গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রায়হান কবিরও ভবনটির দুরবস্থা ও জনবলসংকটের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “ভবনটির দেয়াল থেকে প্রতিদিনই পলেস্তারা খসে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। বৃষ্টি হলে টিনের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে এবং দাপ্তরিক কাগজপত্র ভিজে যায়। নলকূপটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট থাকায় পানি পাওয়া যায় না। পাশের পুকুর থেকে পানি এনে ব্যবহার করতে হয়। এ ছাড়া স্বাভাবিকভাবে অফিস পরিচালনার জন্য অন্তত পাঁচজন কর্মচারী প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রয়েছেন মাত্র তিনজন। জনবলসংকটের কারণে প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।”
এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকার পর্যায়ক্রমে নতুন ভবন নির্মাণ করছে। গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া জনবলসংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।”
জমিদারি আমলের কাচারি ঘর থেকে বর্তমান ইউনিয়ন ভূমি অফিস—সময়ের সঙ্গে বদলেছে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, বেড়েছে ভূমিসেবার ধরন ও মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু গয়াবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অবকাঠামো ও কর্মপরিবেশ যেন আটকে আছে সেই পুরোনো সময়েই। যে অফিস থেকে মানুষের জমিজমার অধিকার, খাজনা ও নামজারিসংক্রান্ত সেবা পাওয়ার কথা, সেই অফিসেরই নথিপত্র আজ বৃষ্টির পানিতে ভিজছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আশ্বাসের মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ না থাকে সমাধান; দ্রুত সংস্কার, নিরাপদ নথি সংরক্ষণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করে ভূমিসেবার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক।


