নিজস্ব প্রতিবেদক: পাঁচ বছর বয়সী শিশু জান্নাতুলকে নৃশংসভাবে হত্যার দীর্ঘ ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও উদ্ঘাটিত হয়নি প্রকৃত রহস্য। উল্টো মামলার প্রধান আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে বাদী ও সাক্ষীদের প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে দিন কাটছে নিহত শিশুর পরিবারের। সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত খুনিদের বিচার এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষায়িত তদন্তকারী সংস্থার হস্তক্ষেপ কামনা করে নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী।
রবিবার (১ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে নিহত শিশু জান্নাতুলের পরিবার ও স্বজনদের পক্ষ থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
এজাহার ও প্রাথমিক তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ৪ মে ২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানাধীন কৈলাটী ইউনিয়নের হুগলী (জসিউড়া) গ্রামের নিজ বাড়ির পাশে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় শিশু জান্নাতুল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ৬ মে সকালে বাড়ির পাশের ধানক্ষেতের আইলে তার খণ্ডিত মরদেহ পাওয়া যায়।
নিহত শিশুর বাবা মো. আর্শাদ মিয়া জানান, শিশুটির শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে আলাদা করা হয়েছিল, হাত-পায়ের মাংস বিচ্ছিন্ন ছিল এবং গলায় ও মুখে গামছা বাঁধা অবস্থায় মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কলমাকান্দা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নিহত শিশুর ফুফাতো ভাই মিজানুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও এবং ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলেও তদন্তে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও ফরেনসিক পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নিয়ে পরিবারের গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
লিখিত বক্তব্য এবং থানায় দায়ের করা সাধারণ ডায়েরি সূত্রে জানা যায়, মামলার ১ নম্বর আসামি মো. মজিবুর রহমান একজন চিহ্নিত অপরাধী। তার বিরুদ্ধে পূর্বেও শিশু অপহরণ, ধর্ষণ ও মাদক চোরাচালানসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের একাধিক মামলা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সুকৌশলে নিজের অতীতের এসব তথ্য গোপন করে এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করে সে জামিন লাভ করেছে। জিডির তথ্যমতে, জামিনে মুক্ত হওয়ার পর গত ২৬ অক্টোবর প্রকাশ্যে বাদী আর্শাদ মিয়া এবং মামলার সাক্ষীদের মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেয় ওই আসামি। মামলা প্রত্যাহার না করলে সুযোগ বুঝে বাদীসহ পরিবারের অন্যান্য শিশু সন্তান এবং সাক্ষীদের কুপিয়ে হত্যার পর লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয়।
আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিহত শিশুর বাবা মো. আর্শাদ মিয়া বলেন, দীর্ঘ কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও ফরেনসিক রিপোর্টের কোনো খবর নেই এবং তদন্তের অগ্রগতি থমকে আছে। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের জন্য একটি বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থার হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
নিহত শিশুর মা ইয়াসমিন আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়ে খুনিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। শিশুটির মামা মো. মাহববু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সমাজে বাচ্চাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। একজন চিহ্নিত অপরাধী কীভাবে জামিনে বেরিয়ে এসে আবার হুমকি দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি দ্রুত আসামির জামিন বাতিল করে তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর জোর দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলন থেকে পরিবার ও এলাকাবাসী সুস্পষ্ট পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো- জান্নাতুল হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা। মামলাটির জটিলতা বিবেচনায় বিশেষায়িত সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের ব্যবস্থা করা। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ সব ফরেনসিক আলামত যথাযথভাবে পরীক্ষা করা। তথ্য গোপন করে জামিন পাওয়া আসামি মজিবুরের জামিন বাতিল করে বাদী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হুমকির বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। তদন্তের অগ্রগতি বাদীপক্ষকে জানানো এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
পরিবারের দাবি, তারা বিনা প্রমাণে কাউকে অপরাধী সাজাতে চান না, বরং একটি নিষ্পাপ শিশুর নির্মম হত্যার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- নিহতে শিশুর ভাই হৃদয় মিয়া এবং এলাকাবাসী মো. ইমরান হোসেনসহ জেলায় কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।


