নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের শোকসন্তপ্ত ও অসহায় পরিবারের পাশে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার এবং নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। ঘাতকের বুলেটে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ও দুই অবুঝ শিশু যখন অথৈ সাগরে দিশেহারা, ঠিক তখনই তাদের পাশে দাঁড়িয়ে অনন্য এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তিনি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে ডেপুটি স্পিকারের নির্দেশে স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ দুর্গাপুরে নিহতের পরিবারের কাছে ছুটে যান। এ সময় ব্যারিস্টার কায়সার কামালের পক্ষ থেকে পরিবারটির হাতে এক লাখ টাকা নগদ আর্থিক অনুদান এবং পরিবারের সকল সদস্যের জন্য প্রয়োজনীয় পোশাক সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। তবে শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তাই নয়, পিতৃৃহীন দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে নিহতের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা যাতে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার অবলম্বন পান, সেজন্য তাকে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ারও জোরালো আশ্বাস দিয়েছেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
শনিবার বিকেলে আর্থিক অনুদান ও সহযোগিতা হস্তান্তরের সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি জহিরুল আলম ভূঁইয়া, সহ-সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাব্রতী এম এ জিন্নাহ, শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ শহীদ খান, সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ্ব জামাল উদ্দিন মাস্টার, পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল করিম, ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবুর মাস্টারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি জহিরুল আলম ভূঁইয়া বলেন, “নিহত সাংবাদিক আলিফ ফকিরের পরিবারের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। ভবিষ্যতেও তার পক্ষ থেকে এই পরিবারটির প্রতি আন্তরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। সেইসাথে কোনো অবস্থাতেই যেন দোষীরা পার পেয়ে না যায়, সেজন্য তিনি ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। দলীয়ভাবেও আমরা সকলে এই পরিবারের পাশে থাকব ইনশাআল্লাহ্।”
এদিকে, স্বামীকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছেন আনন্দিতা সাংমা। বিচার চেয়ে তিনি বলেন, “আমার স্বামীকে যারা হত্যা করেছে, আমি তাদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানাই। যারা আমার দুই বাচ্চাকে এতিম করেছে, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে ফাঁসি কার্যকর করা হোক। যাতে আর কোনো সন্ত্রাসী কাউকে এভাবে হত্যা করার সাহস না পায়।”
গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর পৌরসভার তেলুঞ্জিয়া এলাকার দোকানে নিজের রেখে যাওয়া মুঠোফোন আনতে গেলে সন্ত্রাসীরা সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে (৪০) লক্ষ্য করে ছয়টি গুলি ছোড়ে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার চেষ্টা করলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য আলিফ ফকির বেসরকারি আইপি টিভি ‘রূপসী বাংলার’ নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে মাদক কারবার, চোরাচালান ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিয়মিত লেখালেখি এবং ভিডিও প্রকাশ করতেন। তার পৈতৃক বাড়ি কলমাকান্দার পোগলা ইউনিয়নের শুনুই গ্রামে হলেও তিনি দুর্গাপুরের বিরিশিরি এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন।
এ ঘটনায় গতকাল (শুক্রবার) রাতে নিহতের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে অজ্ঞাত আট জনকে আসামি করে দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
সত্যের পথে অবিচল থাকা একজন নির্ভীক সংবাদকর্মীর এমন অকাল মৃত্যুতে পুরো দুর্গাপুরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের মানুষ ইতোমধ্যে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ শুরু করেছেন। তবে শোকের ঘোর অমানিশায় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের মানবিক উদ্যোগ অসহায় পরিবারটিকে কিছুটা হলেও বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছে। এখন পুরো জনপদের একটাই দাবি- অবিলম্বে ঘাতকদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।


