রুহুল আমিন,ডিমলা(নীলফামারী)
একদিকে ডিজেল, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের বাড়তি খরচ, অন্যদিকে ধান বিক্রি করে সেই টাকা উঠবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। এর মধ্যে বৃষ্টির অভাবে জমিতে সেচ দিতে গিয়েও বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। সব মিলিয়ে আমন ধান চাষ করতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কৃষকেরা। তাঁদের ভয়, এত খরচ করে ফসল ঘরে তুললেও শেষ পর্যন্ত লাভের বদলে লোকসান গুনতে হতে পারে।
কৃষকদের এই দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়েছে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি। গত ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। ফলে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের মাধ্যমে জমিতে পানি দিতে আগের চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে না পারলে ধানের ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন তাঁরা।
চলতি আমন মৌসুমে ডিমলা উপজেলায় ২১ হাজার ২৪১ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেই চাষাবাদ নিয়েই এখন চিন্তায় রয়েছেন অনেক কৃষক।
বালাপাড়া ইউনিয়নের সোলেমানের চৌপতি গ্রামের কৃষক সুমন মিয়া বলেন, “ডিজেলের দাম বাড়ার পর সেচের খরচ বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচও বেশি। ধান উৎপাদনে কত খরচ হচ্ছে, কিন্তু বিক্রির সময় সেই খরচ উঠবে কি না, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।”
একই গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলামের চিন্তা জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া নিয়ে। তিনি বলেন, “জমিতে সময়মতো পানি না দিলে ধানের ফলন কমে যেতে পারে। কিন্তু সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ধানের দাম নিয়েও নিশ্চয়তা নেই।”
নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গ্রামের কৃষক কছির উদ্দিন বলেন, “সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকে এখন বৃষ্টির অপেক্ষায় আছেন। সময়মতো বৃষ্টি না হলে সেচ দিতে হবে। কিন্তু প্রতিবার পানি দিতে বাড়তি টাকা লাগছে। এতে ধান চাষ করে লাভ থাকবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।”
একই গ্রামের কৃষক সুজারু আলীর কথায়ও উঠে এসেছে বাড়তি খরচের চাপ। তিনি বলেন, “বীজ, সার, কীটনাশক থেকে শুরু করে জমি তৈরি, শ্রমিক, সেচ, ধান কাটা ও মাড়াই পর্যন্ত সবকিছুর খরচ বেড়েছে। ধানের দাম যদি সেই তুলনায় না বাড়ে, তাহলে কৃষকের লোকসান হবে। ধারদেনা করে চাষ করলে সেই টাকা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে যাবে।”
চাষের শুরু থেকে ধান ঘরে তোলা—সবখানেই খরচ
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমন ধান চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ কেনা, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন—প্রতিটি পর্যায়েই খরচের চাপ রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষিযন্ত্র চালানো এবং কৃষি উপকরণ ও ফসল পরিবহনেও বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।
সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা। খরচ কমাতে কেউ কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম সার বা কীটনাশক ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। এতে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং ভালো ফলন পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের কাছে এখন শুধু ভালো ফলনই যথেষ্ট নয়, ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তোলাও বড় চিন্তা। কারণ, জমিতে ধান ফলাতে কত টাকা খরচ হচ্ছে, তা আগে থেকেই হিসাব করতে হচ্ছে। কিন্তু মৌসুম শেষে বাজারে কী দামে ধান বিক্রি করতে পারবেন, সেই নিশ্চয়তা নেই।
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়লেও ধান বিক্রির সময় সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যায় না। ফলে ফলন ভালো হলেও উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লাভ থাকে না। বিশেষ করে ধারদেনা করে চাষ করা কৃষকেরা ন্যায্য দাম না পেলে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে পারেন।
এ অবস্থায় কৃষকদের দাবি, সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। পাশাপাশি সেচের খরচ কমাতে সাশ্রয়ী ও আধুনিক সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, কৃষি উপকরণ ও ফসল পরিবহন ব্যয় কমানো এবং উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও কৃষি উপকরণের বাড়তি মূল্যের কারণে আমন চাষিদের উৎপাদন ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। তবে সঠিক সময়ে সেচ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কৃষকদের পানি ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “কৃষকেরা যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করেন, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন নিশ্চিত করতে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, রোগবালাই পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে কৃষকের লাভজনকতা ধরে রাখাই কৃষি বিভাগের অন্যতম লক্ষ্য।”
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ডিমলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ৪০০ হেক্টর। এর মধ্যে এক ফসলি জমি ১ হাজার ৩১০, দুই ফসলি ১৩ হাজার ৫২০, তিন ফসলি ৮ হাজার ৬৮০, চার ফসলি ৮৫০ এবং পাঁচ ফসলি জমি ৪০ হেক্টর। সব মিলিয়ে ফসলি জমির পরিমাণ ৫৭ হাজার ৭৯০ হেক্টর।
আমন মৌসুমে কৃষকদের প্রত্যাশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলন হবে। তবে সেই ফলন তাঁদের মুখে হাসি ফোটাবে কি না, তা নির্ভর করছে উৎপাদন খরচের বিপরীতে ধানের বিক্রয়মূল্যের ওপর। কৃষকদের এখনকার দুশ্চিন্তা তাই একটাই—এত খরচ করে ধান ফলিয়ে শেষ পর্যন্ত ন্যায্য দাম পাবেন তো?


