নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রতি মাসের শেষে বিদ্যুৎ বিলের কাগজটি হাতে পেলেই যেন কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার সাউধপাড়া এলাকার বাসিন্দা নয়ন মিয়ার। কারণ একটাই- তিনি যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, বিল আসছে তার দ্বিগুণ বা তারও বেশি। নিজের সমস্যার প্রতিকার খুঁজতে মাসের পর মাস তিনি ধরনা দিচ্ছেন স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সমাধান মিলছে না। নয়ন মিয়ার দীর্ঘশ্বাস কেবল তার একার নয়; এটি এখন পুরো কেন্দুয়া উপজেলার প্রায় আট হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহকের নিত্যদিনের প্রতিচ্ছবি।
গত দুই বছর ধরে এই জনপদে নীরবে চলছে পল্লী বিদ্যুতের তীব্র মিটার সংকট। নষ্ট মিটারের কারণে একদিকে যেমন গ্রাহকরা প্রকৃত ব্যবহারের চেয়ে বেশি বিল দিচ্ছেন, অন্যদিকে হয়রানির শিকার হয়ে প্রতিদিন ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিদ্যুৎ অফিসে।
নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কেন্দুয়া জোনাল অফিসের তথ্যমতে, কেন্দুয়া উপজেলায় আবাসিক, সেচ ও শিল্প খাত মিলিয়ে বর্তমানে গ্রাহক সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি। এই বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের মধ্যে বিশাল একটি অংশের বাড়ির বা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ মিটার বর্তমানে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। গত বছর যেখানে নষ্ট মিটারের সংখ্যা ছিল ছয় হাজারের মতো, এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় আট হাজারে। চাহিদার তুলনায় নতুন মিটারের সরবরাহ প্রায় তলানিতে থাকায় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
মিটার নষ্ট হওয়ার পর গ্রাহকরা নিয়ম মেনে অফিসে আবেদন করলেও দীর্ঘ অপেক্ষায় মিলছে না নতুন মিটার। উল্টো তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘গড় বিল’ বা আনুমানিক বিলের বোঝা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী গ্রাহক জানান, মিটার নষ্ট হওয়ার পর বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করলে তাকে বিগত মাসের বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘গড় বিল’ ধরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে প্রতি মাসেই সেই আনুমানিক হিসাবেই বিল তৈরি হচ্ছে।
বাস্তব চিত্র হলো, আনুমানিক এই হিসাব অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহকের প্রকৃত ব্যবহারের চেয়ে ঢের বেশি। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও মাসের পর মাস পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি বিল পরিশোধ করা অনেকটা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অতিরিক্ত বিলের চাপ এবং মিটার পরিবর্তনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে গ্রাহকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন কেন্দুয়া বিদ্যুৎ অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ তাদের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। বাড়তি বিল নিয়ে কোনো কোনো গ্রাহকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রায় প্রতিদিনই কথাকাটাকাটি ও বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটছে। একদিকে গ্রাহকের পকেট শূন্য হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের সেবার মান নিয়ে জনমনে তৈরি হচ্ছে নেতিবাচক ধারণা।
এমন দমবন্ধ করা পরিস্থিতির বিষয়ে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কণ্ঠেও কিছুটা অসহায়ত্ব আর সীমাবদ্ধতার সুর শোনা যায়। কেন্দুয়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) প্রকৌশলী ওমর ফারুক বলেন, “মিটার সরবরাহ পাওয়ার পর আমরা জরুরি প্রয়োজন বিবেচনা করে সেচ ও শিল্প গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিয়ে মিটার পরিবর্তনের কাজ করছি। আবাসিক মিটারের সামগ্রিক সংকটের বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই এমন পরিস্থিতির অবসান হবে।”


