ডেঙ্গুর ‘হট জোন’ টার্গেট: নেত্রকোনায় শুরু হলো তিন মাসব্যাপী মশক নিধন

নিজস্ব প্রতিবেদক: সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মশার বংশবিস্তার রোধ, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেত্রকোনায় শুরু হয়েছে ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’। নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকালে শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এই অভিযান এবং বর্ণাঢ্য র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়।

এদিন সকালে নেত্রকোনা কালেক্টরেট স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অভিযানের নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান। এ সময় তিনি নিজে হাতে ঝাড়ু ও দা নিয়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের আগাছা ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার করেন এবং ফগার মেশিনের মাধ্যমে ধোঁয়া ছিটিয়ে মশক নিধন কার্যক্রম তদারকি করেন। পরে তার নেতৃত্বে শহরের দত্ত উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়। যেখানে শিক্ষার্থী ও স্কাউট সদস্যরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ক্যাম্পাসের আবর্জনা পরিষ্কারে অংশ নেন।

পরিচ্ছন্নতা অভিযান শেষে বর্ণাঢ্য সচেতনতামূলক র‍্যালি বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। র‍্যালিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

কর্মসূচিতে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “নেত্রকোনার বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারি নির্দেশনার আলোকে জনগণকে সচেতন করতে আমরা এই কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। আজ নেত্রকোনায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই অভিযান তিন মাসের ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ হিসেবে চলবে। ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সচেতনতামূলক ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলমান থাকবে।”

নেত্রকোনা পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা ডেঙ্গু প্রতিরোধে পৌরসভার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্মানোই ডেঙ্গু বাড়ার প্রধান কারণ। ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে পৌরসভার মশক নিধন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং শহরের ‘হট জোন’ বা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। আনন্দ বাজার থেকে মোক্তারপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তার ময়লা ফেলার বিষয়ে তিনি জনসাধারণের অসচেতনতাকে দায়ী করে বলেন, “কেবল সরকার বা পৌরসভার একক প্রচেষ্টায় শহর পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়; সকলের সম্মিলিত সচেতনতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলা সম্ভব।”

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিজা খাতুন জানান, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পৌরসভা এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলমান রয়েছে। এই কার্যক্রম ইউনিয়ন পর্যায়েও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের স্কুল ও বাজার কমিটিকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মশক নিধনের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও ওষুধ সরবরাহ করা হবে।

কর্মসূচিতে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ মজিবুর রহমান, জেলা প্রেসক্লাবের সম্পাদক ম. কিবরিয়া চৌধুরী, প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধি পল্লব চক্রবর্তী, এনটিভি স্টাফ রিপোর্টার ভজন দাসসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মূলত পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা থেকে তৈরি হয়। তাই ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং জমে থাকা পানি অপসারণের বিকল্প নেই। আগামী দিনে ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষিত থাকতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ ক্যাম্পাস এবং নাগরিকদের নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখার বিষয়ে বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। প্রশাসনের সমন্বিত এই উদ্যোগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top