শেখ শামীম: নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় চুরির অভিযোগে এক কিশোরকে জনসম্মুখে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে মূল অভিযুক্ত রতন রবি দাশকে মঙ্গলবার (৩০ জুন) আটক করেছে পুলিশ। সে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের একজন গ্রাম পুলিশ সদস্য। আটকের পর তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ওই কিশোরের নাম মো. রাব্বিল (১৪)। সে কলমাকান্দা উপজেলার বানাইকোনা গ্রামের মো. রফিকুল ইসলামের ছেলে। অন্যদিকে, আটককৃত অভিযুক্ত রতন রবি দাশ একই উপজেলার পাচগাঁও গ্রামের বিন্দু রবি দাশের ছেলে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, পাচগাঁও বাজারের মানেন্দ্রের হার্ডওয়্যারের দোকানে একটি চুরির ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠে, কিশোর রাব্বিল এক দোকানদারের কাছ থেকে সাত হাজার টাকা চুরি করেছে। পরে তাকে সন্দেহজনকভাবে আটক করে তল্লাশি চালালে তার কাছ থেকে চুরি যাওয়া সাত হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। আটকের পর উপস্থিত জনতার সামনে কিশোরটি চুরির বিষয়টি স্বীকারও করে।
তবে আইন অনুযায়ী তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করার বদলে স্থানীয় কয়েকজনের উপস্থিতিতে গ্রাম পুলিশ রতন রবি দাশ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। শাস্তিস্বরূপ জনসম্মুখে ওই কিশোরের মাথা সম্পূর্ণ ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, চুল কাটার সময় কিশোরটি বারবার কেঁদে ক্ষমা চাইছে এবং ‘কাকু’ বা ‘মামু’ বলে ডেকে তাকে ছেড়ে দেওয়ার আকুতি জানাচ্ছে। ভবিষ্যতে আর কখনো এমন কাজ করবে না বলে বারবার প্রতিজ্ঞা করলেও উপস্থিত কেউই তার এই আর্তনাদে সাড়া দেয়নি।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর অভিযুক্ত গ্রাম পুলিশ ও পেশায় নরসুন্দর রতন রবি দাস তার কৃতকর্মের বিষয়ে মুখ খুলেছেন। আত্মপক্ষ সমর্থন করে তিনি বলেন, “পাচগাঁও বাজারে আমার একটি সেলুন রয়েছে। গ্রাম পুলিশের দায়িত্ব পালন শেষে আমি সেখানে কাজ করি। বাজারে লোকজন তাকে (কিশোরকে) হাতেনাতে আটক করে রাখে এবং আমাকে খবর দেয়। আমি সেখানে যাই। সেখানে উপস্থিত লোকজন একশো টাকার বিনিময়ে আমাকে ওই কিশোরের মাথা ন্যাড়া করতে বাধ্য করে। আমি এর জন্য অনুতপ্ত।”
অমানবিক এই নির্যাতনের ভিডিওটি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে এলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। রংছাতি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিওটি ভাইরাল হলে তা তার নজরে আসে। ভিডিও দেখে তিনি অভিযুক্তকে পরিষদের গ্রাম পুলিশ রতন হিসেবে শনাক্ত করেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ওসিকে অবহিত করলে পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। অভিযুক্ত গ্রাম পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউএনও মহোদয়কে অবহিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত ওসির দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) সজল সরকার জানান, চুরির অভিযোগে কিশোরকে নির্যাতনের ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কলমাকান্দার ইউএনও এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখছি। তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া থানা পুলিশকে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
আইন রক্ষায় নিয়োজিত একজন সদস্য নিজেই আইন হাতে তুলে নিয়ে একজন কিশোরকে এমন প্রকাশ্য ও মধ্যযুগীয় শাস্তি দেওয়ার ঘটনায় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।


