নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনা পৌর শহরকে বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টায় নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে পৌরসভার চলমান ও প্রস্তাবিত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং পৌরসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এই তাগিদ দেওয়া হয়।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান এবং সঞ্চালনায় ছিলেন নেত্রকোনা পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক বলেন, “দলমত নির্বিশেষে আমরা নেত্রকোনাকে সুন্দর করতে চাই। আমরা পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, হেলদি এবং স্মার্ট সিটি দেখতে চাই।” মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আরবান ও গ্রামীণ উন্নয়নের জাতীয় মাস্টারপ্ল্যানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি নেত্রকোনার জন্য সার্বিক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের প্রস্তাব দেন।
তিনি কনসালট্যান্ট গ্রুপের মাধ্যমে স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন। শহরের যানজট নিরসনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিষয়ে আগামী সাত দিনের জন্য সচেতনতামূলক সার্কুলার জারির পর আইন প্রয়োগে কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুপারিশ যেন না করা হয়। ভালো কিছু পেতে হলে নাগরিকদের ত্যাগের মানসিকতা ধারণ করার আহ্বান জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান নগর উন্নয়নে পেশাদার কনসালটেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরির ওপর জোর দেন। পূর্ণাঙ্গ নগর পরিকল্পনায় সবার মতামত থাকা জরুরি উল্লেখ করে সভায় নারী, শিশু, প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। পৌরসভার উন্নয়নে জনপ্রতিনিধিদের ‘পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট’ এবং আমলাদের সমন্বয়ে ‘ইন্টারনাল গভর্ন্যান্স’ নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।
তরুণ প্রজন্মের মাঝে ‘সিভিক সেন্স’ তৈরির আহ্বান জানিয়ে যানজট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো সমস্যাগুলো সমাধানে এসপি এবং সংসদ সদস্যের সাথে সমন্বয় করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।
নেত্রকোনা শহরের যানজট নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নদী রক্ষায় কঠোর অবস্থানের কথা জানান জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. তরিকুল ইসলাম। তিনি জানান, যত্রতত্র মোটরসাইকেল পার্কিং করলে তা ডাম্পিং করা হবে এবং পৌরসভাকে অটোরিকশার নির্দিষ্ট সংখ্যা ও সিরিয়াল নির্ধারণ করে দিতে হবে। সাত দিন মাইকিং করে সতর্ক করার পর অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উন্নত শহরের মতো রাতের বেলায় শহরের বর্জ্য পরিষ্কারের কাজ সম্পন্ন করার এবং নদীর দুই পাড় দখলমুক্ত করে ওয়াকওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব দেন তিনি।
পৌরসভার প্রশাসক মুন মুন জাহান লিজা জানান, লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে প্রাথমিকভাবে কিউআর কোড স্ক্যান করার কাজ শুরু হতে যাচ্ছে, যা একজন ব্যক্তির একটি মাত্র লাইসেন্সের বিপরীতে প্রযোজ্য হবে। তিনি জানান, পৌরসভায় বর্তমানে পাঁচ হাজার ৬৬৪টি যানবাহন রয়েছে; যার মধ্যে দুই হাজার ৪৫০টি অটো, এক হাজার ৩০৮টি মিশুক এবং এক হাজার ৯০৩টি রিকশা।
আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী ও বিএনপি নেতা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান রনি অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবি জানান। পৌরসভায় সম্ভাব্য একশো কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প আসলে তা যেন নির্দিষ্ট কোনো ওয়ার্ডে সীমাবদ্ধ না থেকে সবচেয়ে অবহেলিত এলাকাগুলোতে সুষমভাবে বণ্টিত হয়, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জেলা পরিষদ প্রশাসক এডভোকেট নুরুজ্জামান নূরু, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারজান আনোয়ার, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কুতুব উদ্দিন শাহ্, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম, ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. আফরিন সুলতানা নুপুর, জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম শফিকুল কাদের সুজা, জেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরীসহ বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগণ।
দীর্ঘ তিন ঘণ্টার মতবিনিময় এই সভায় বক্তারা একমত পোষণ করেন, নেত্রকোনা শহরকে মডেল নগরে পরিণত করতে হলে সকল বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সুনাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা অপরিহার্য। সভার সকল আলোচনা ও সিদ্ধান্ত লিখিত আকারে সংরক্ষণ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়।


