খুলনা অঞ্চলের চার জেলায় চলতি অর্থবছরে ২০২৫-২০২৬ বোরো (হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয়) জাতের ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১৮ লাখ ১৫ হাজার ৪২৪ মেট্রিক টন।
এর বিপরীতে এবার ৬ হাজার ৫৩৫ কোটি ৫২ লাখ ৮২ হাজার টাকা (সরকার ঘোষিত প্রতি কেজি ধানের মূল্য ৩৬ টাকা হিসাবে) বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। এ অঞ্চলে বর্তমানে বোরো ধানের কর্তনের গড় পরিমাণ ৮১ শতাংশ।
এদিকে, মৌসুমী দুর্যোগ বেড়ে যাওয়াও শেষ সময়ে পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন কৃষক।
ফলে এখন চলছে বোরো ধান কর্তনের মহাকর্মযজ্ঞ।
কৃষকের যেন দম ফেলার সময় নেই। কৃষকের ঘরে, উঠানে এবং ফসলের মাঠে চরম ব্যস্ততা। এ অবস্থায় সবকিছু ঠিক থাকলে দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনাঞ্চল- এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনাঞ্চলের সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে ৪ জেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৯ হেক্টর জমি। আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ১৫ হাজার ৪২৪ মেট্রিক টন।
এর মধ্যে খুলনা জেলায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৭২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন, বাগেরহাট জেলায় ৪ লাখ ২৮৫ হাজার ৩৫৮ টাকা, সাতক্ষীরা জেলায় ৫ লাখ ১২ হাজার ১৬৫ মেট্রিক টন এবং নড়াইল জেলায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩১২ মেট্রিক টন।
সম্ভাব্য উৎপাদনের বিপরীতে বিক্রির সম্ভাবনা ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৫৩৫ কোটি ৫২ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
এর মধ্যে খুলনা জেলায় ১৭০১ কোটি ৩২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, বাগেরহাটে ১৭৪৭ কোটি ২৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, সাতক্ষীরায় ১৮৪৩ কোটি ৭৯ লাখ ২২ হাজার টাকা ও নড়াইলে ১২৪৩ কোটি ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, খুলনাঞ্চলে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৯ হেক্টর। এর বিপরীতে শতভাগের বেশি অর্জিত হয়েছে। যার পরিমাণ ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৯৩ হেক্টর। এর মধ্যে খুলনা জেলায় ৬৫ হাজার ৭৭৮ হেক্টর, বাগেরহাটে ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর, সাতক্ষীরায় ৮২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর ও নড়াইলে ৫০ হাজার ৩০৯ হেক্টর।
আবাদের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অতিরিক্ত ২ হাজার ২৭৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে।
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ কিশোর আহমেদ বাসসকে জানান, উপজেলায় চলতি অর্থ বছরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ৮৮৫ হেক্টর। অগ্রগতি হয়েছে ৪ হাজার ৮৭৬ হেক্টর।
ইতোমধ্যে উপজেলায় ৯২ শতাংশ ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে।
এছাড়া কৃষকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাকি ফসল ঘরে তুলতে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. মনির হোসেন জানান, উপজেলায় চলতি অর্থ বছরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ হাজার ২৮৫ হেক্টর।
অগ্রগতি হয়েছে ২৩ হাজার ৩১০ হেক্টর। ইতোমধ্যে উপজেলায় ৮২ শতাংশ ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে। যেহেতু বর্ষাকাল চলছে, কৃষকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘরে ফসল তুলতে পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. মনির হোসেন জানান, উপজেলার চলতি বছরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ হাজার ২৮৫ হেক্টর। অগ্রগতি হয়েছে ২৩ হাজার ৩১০ হেক্টর। ইতোমধ্যে উপজেলায় ৮২ শতাংশ ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে।
এ বিষয়ে বাগেরহাটের জেলার কচুয়া উপজেলা কৃষি অফিসার আকাশ বৈরাগী , আমার উপজেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ৭৪৫ হেক্টর, অর্জন হয়েছে ৭ হাজার ৭৫৭ হক্টর।
ইতোমধ্যে উপজেলায় ৮৫ শতাংশ ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে।
অতিবৃষ্টির কারণে ১০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা এবং ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের সংখ্যা আনুমানিক ৭২ জনের মতো। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষদের তালিকা প্রস্তুত করছি, সরকার বাজেট দিলে তাদের তা প্রদান করা হবে। বর্তমানে আবহাওয়া ভালো দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন কৃষকরা ধান কর্তন করে ঘরে তুলতে পারে, সেই ব্যাপারে যাবতীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, উপজেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার হেক্টর, অগ্রগতি হয়েছে ৮ হাজার ৯৮৫ হেক্টর। ইতোমধ্যে উপজেলায় ৭০ শতাংশ ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া দ্রুত সময়ের মধ্যে বাকি ফসল ঘরে তুলতে আমরা কৃষকদের সহযোগিতা করছি।
শরণখোলা উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ দেবব্রত সরকার জানান, উপজেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ৩শ’ হেক্টর, অর্জন হয়েছে ৬ হাজার ৫৩৫ হেক্টর। ইতোমধ্যে উপজেলায় ৫০ শতাংশ ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাগেরহাটের উপ-পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বাসসকে বলেন, জেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৭ হাজার ৬২২ হেক্টর, অগ্রগতি হয়েছে ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর। কর্তনের হার ৮০ শতাংশ। তবে অতিবৃষ্টির কারণে জেলায় প্রায় ৬৮ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিরুপন করা হয়েছে ৯৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষককের সংখ্যা ১২৩০ জন।
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকার তাদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনুদান দিলে আমরা স্ব-স্ব উপজেলায় তাদের মাঝে প্রদান করা হবে। এছাড়াও আউশ ও পাট চাষের মৌসুমে আমরা তাদের কোনো সুবিধা প্রদানের বিষয়েও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, খুলনাঞ্চলে চলতি অর্থবছরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অতিরিক্ত ২ হাজার ২৭৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কিছু দিন আগে অতিবৃষ্টির কারণে বাগেরহাট জেলায় বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইতোমধ্যে খুলনাঞ্চলে ৮১ শতাংশ ধান কর্তন শেষ হয়েছে। বড় ধরনের কেনোন দুর্যোগ দেখা না দিলে দ্রুত সময়ের মধ্যে বাকি ধান কৃষকের ঘরে উঠে যাবে। একই সঙ্গে এই অঞ্চলের কৃষকের উৎপাদিত ধান দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশা করছেন তিনি।



