Category: মতামত

  • আরব ভূখণ্ড থেকে মগড়া নদীর বাঁকে: কবি ও অনুবাদক এনামূল হক পলাশ

    আরব ভূখণ্ড থেকে মগড়া নদীর বাঁকে: কবি ও অনুবাদক এনামূল হক পলাশ

    মো. তানভীর হায়াত খান

    নেত্রকোণা জেলা শহরের মেছুয়া বাজারের বেণীমাধব প্লাজার ছোট্ট একটি খোপ। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে সেখানে এক আদিম, মরমী নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। খোপটি ভীষণ সাধারণ এবং জীর্ণতার চাদরে মোড়ানো, যার আসবাব বলতে কেবল দুটো ক্ষয়িষ্ণু চেয়ার, দুটো টেবিল আর একপাশে পেতে রাখা একটি কাঠের বেঞ্চ। মাথার ওপরে এক চিলতে টিনের চাল; বর্ষার দিনে যখন মেঘের ডম্বরু বাজে, তখন টিনের চালের টুই চুইয়ে, জংধরা পুরোনো দেয়াল বেয়ে অবাধ্য উস্সিলার পানি পড়ে। ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা ধূলিধূসরিত ছাইদানির পাশে অদ্ভুত এক বৈপরীত্য নিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে শুয়ে আছে বাংলা সিনেমার চৌধুরী সাহেবদের আভিজাত্যের প্রতীক- ধূমপান করার সেই চিরচেনা হুঁকো-পাইপ।

    এই মরমী পরিমণ্ডলে বসে একজন মানুষ আপন মনে চিবিয়ে যাচ্ছেন আতপ চাল, কখনো লবঙ্গ, আবার কখনো কাঁচা চিঁড়া। একটু আগে কেউ একজন এক কাপ ধোঁয়া ওঠা রং চা দিয়ে গেছে; সেই ধোঁয়া অলস ভঙ্গিতে বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে চা-টি কখন যে জুড়িয়ে জল হয়ে গেছে, সেদিকে তাঁর কোনো খেয়াল নেই। পরনে দাপ্তরিক পোশাক, কিন্তু সাধারণ প্যান্টটি হাঁটুর নিচ থেকে নির্মমভাবে ছেঁড়া। একটু আগেই অফিস থেকে মোটরসাইকেলযোগে ফেরার পথে আচমকা সামনে চলে আসা এক অবুঝ প্রাণীর জীবন রক্ষা করতে গিয়ে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন দুর্ঘটনার মুখে। হাঁটুর নিচে দু-এক জায়গায় চামড়া থেঁতলে গিয়ে চুইয়ে পড়ছে রক্ত; অথচ সেই শারীরিক বেদনার বিন্দুমাত্র খেয়াল তাঁর নেই। কাউকেই এই দুর্ঘটনার কথা জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি তিনি; অথচ ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়েই সোজা চলে এসেছেন তাঁর সৃষ্টির এই নিজস্ব ‘দরবারে’।

    ​এনামূল হক পলাশ আসলে এক অদ্ভুত এবং খেয়ালী অবধূত, যাঁর ভেতরের এবং বাইরের রূপ প্রতিনিয়ত কোনো এক মহাজাগতিক রূপান্তরকে স্পর্শ করে। কখনো তিনি বুঁদ হয়ে থাকেন সুফীবাদের অতলান্ত গভীর চিন্তা ও ধ্যানে, আর তখন তাঁর বাহ্যিক অবয়বেও নেমে আসে এক সুফিয়ানা মরমী আবহ। সমকালের এই মরমী সাধকের মাথার টুপিগুলোর মধ্যেও রয়েছে এক বৈচিত্র্যময় আখ্যান। কখনো তাঁর মাথায় শোভা পায় প্রাচীন মিশরীয় পাশাদের রাজকীয় ঝালরযুক্ত কালো ফেজ টুপি, কখনো হিমালয়ের কোল থেকে আসা জ্যামিতিক নকশার ঐতিহ্যবাহী রঙিন নেপালী টুপি, আবার কখনো তিনি মাথা জড়িয়ে নেন এক মরমী দরবেশের আত্মিক আভিজাত্য মাখানো পাগড়িতে। তাঁর শান্ত চোখের চশমা আর সাদা-কালো দাড়ি-গোঁফের নিখাদ অবয়বে সবসময় লেগে থাকে এক মৃদু, নির্মোহ ও ধ্যানী স্মিত হাসি।

    এই রূপান্তরের খেলা শুধু মাথাতেই থেমে থাকে না; তাঁর গলায় ও কাঁধে জড়িয়ে থাকে সাদা-কালো চেক কিংবা খয়েরি ও লালচে ঘরানার নানা রঙ ও বুননের বৈচিত্র্যময় উত্তরীয় কিংবা শাল। এই সবকিছুই যেন তাঁর বহুমাত্রিক মনন, বিশ্বসাহিত্যের প্রতি টান এবং ছন্নছাড়া সাধক সত্তারই এক একটি বিমূর্ত চাক্ষুষ প্রকাশ।

    ​তাঁর এই দরবার অর্থাৎ ছোট্ট খোপটায় রয়েছে আতরের এক স্নিগ্ধ আয়োজন; সাঁঝবেলা নামলেই সেখান থেকে চারদিকে সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় একনিষ্ঠ এক ভক্ত এসে গভীর মায়ায় ধূপের ধোঁয়া দিয়ে যায় পুরো খোপটায়, যা জীর্ণ টিনের চালের নিচের এই অবধূতের ঘরটিকে মুহূর্তেই এক অপার্থিব ও আধ্যাত্মিক আশ্রমে রূপান্তর করে। সন্ধ্যা গড়িয়ে যখন গভীর রাত নামে, তখন এই ধূপ-আতরের সুবাস আর উস্সিলার জলপতনের শব্দকে সঙ্গী করে আগমন ঘটে অসংখ্য চাতক সাধক, অনুরাগী আর ভক্তদের। এখানে রাজকীয় কোনো আয়োজন নেই; আপ্যায়নের ডালা সাজানো থাকে কেবল চা, চিঁড়া, আতপ চাল আর লবঙ্গের সহজ স্বাদে। আর সেই দরবারি আড্ডার আকাশে ডানা মেলে দেশ-বিদেশের অন্তহীন গল্প, গূঢ় দর্শন, সৃষ্টিতত্ত্ব আর মহাজাগতিক গভীর সব চিন্তা। এই খোপের মানুষটিই- মগড়া নদীর তীরের এক নির্মোহ সাধক, কবি এনামূল হক পলাশ।

    ​মহৎ সাহিত্যের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য হলো তা যুগপৎভাবে মাটির কাছাকাছি থাকে এবং নক্ষত্রের দিকে ডানা মেলে। সমকালীন বাংলা কবিতার অবক্ষয়ী ও জটিল তাত্ত্বিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যিনি শব্দকে করে তুলেছেন মাটির সমার্থক, তিনি কবি এনামূল হক পলাশ। একজন ভাবুক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, শিশু সাহিত্যিক এবং গীতিকার হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ কেবল সাহিত্যের পরিধিকেই বিস্তৃত করেনি, বরং তা হয়ে উঠেছে একটি জনপদের মরমী ও দ্রোহী চেতনার প্রামাণ্য দলিল। জীবনের জটিল আবর্তে দাঁড়িয়েও যিনি প্রতিনিয়ত ‘সহজের সাধনা’ করে চলেছেন, তাঁর সৃষ্টিশীলতা পাঠ করা মানেই এক জীবন্ত কালখণ্ড, বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃতি এবং নিজস্ব শিকড়ের গভীর মানবিক বোধের মুখোমুখি হওয়া।

    ১৯৭৭ সালের ২৬ জুন নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বাদে চিরাম গ্রামের মাতুলালয়ে যে জীবনের সূচনা, তা বিকশিত হয়েছে মগড়া ও কংসের পলিবিধৌত মাটির সুবাস বুকে নিয়ে। শৈশব কেটেছে গোপালপুর বাজারে, আর মনন গঠিত হয়েছে বারহাট্টা পাবলিক লাইব্রেরির বইয়ের পাতার হলদেটে ঘ্রাণে।

    ১৯৯৫ সালে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘মাটির সুবাস’ পত্রিকায় কবির প্রথম কবিতার জন্য পাওয়া ‘চল্লিশ টাকা’র মানি অর্ডারটি কেবল একটি আর্থিক প্রাপ্তি ছিল না, তা ছিল এক আজন্ম শব্দশ্রমিকের প্রথম স্বীকৃতি। সেই থেকে শুরু করে ময়মনসিংহ রেলওয়ে কলোনীর দিনগুলোতে সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এর বিশেষ সংখ্যায় নিয়মিত লেখালেখি তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তাকে আরও শাণিত করে তোলে।

    উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে প্রকৃতির গূঢ় রহস্য উন্মোচনের পাশাপাশি তিনি পাঠ করেছেন সমাজের গভীর ক্ষতগুলোকেও। নেত্রকোণা সরকারী কলেজ এবং পরবর্তীতে গুরুদয়াল সরকারী কলেজ থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের এই যাত্রা তাঁর মননে বিজ্ঞান ও দর্শনের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে। ​কবির জীবন কেবল নিভৃত কোণে বসে শব্দ বোনার ইতিহাস নয়, তা রাজপথের উত্তাল স্লোগানের সাথেও সম্পৃক্ত।

    ১৯৯৮ সালে এক প্রথিতযশা প্রগতিশীল বিপ্লবী বাম সংগঠনের হাত ধরে রাজনীতির আঙিনায় তাঁর প্রবেশ। এই রাজনৈতিক দীক্ষা তাঁর কবিতার ভেতর বুনে দেয় শোষিত মানুষের জন্য গভীর পক্ষপাত। পরবর্তীকালে ২০০৩ সালে ভূমি কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি চাকুরিতে যোগদান করলেও, তাঁর ভেতরের বিপ্লবী সত্তা কখনো ম্লান হয়নি। জমি, দলিল আর লাল ফিতার কর্মব্যস্ততার মাঝেই তিনি অভ্যাস বা সাধনা জারি রেখেছেন।

    নেত্রকোণা সদর উপজেলার মালনী এলাকায় কবি নির্মলেন্দু গুণের সাথে বিশ্ব কবিতার আবাস্থল খ্যাত ‘কবিতাকুঞ্জ’ প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকে যুক্ত থেকে এর প্রথম পরিচালকের দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীতে নিজস্ব ভাবনায় ‘অন্তরাশ্রম’ প্রতিষ্ঠা—তাঁর গভীর সংস্কৃতিমনস্কতার অনন্য নিদর্শন। ২০০৯ সালে প্রকাশিত কবির প্রথম গ্রন্থ ‘অস্তিত্বের জন্য যুদ্ধ চাই’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের ‘সুফি কবিতা’, ‘সংবিধানের পোস্টমর্টেম’ কিংবা ‘পলায়নের আগে’- প্রতিটি গ্রন্থই যেন এক একটি স্বতন্ত্র মনস্তাত্ত্বিক স্টেশন।

    প্রগতিবাদী প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকারের ভাষায়, এনামূল হক পলাশ তাঁর ব্যক্তিগত বোধ থেকে শুরু করে সামাজিক সংকট পর্যন্ত সবকিছুর মর্মানুধাবনে অনন্যতার প্রকাশ ঘটাতে পেরেছেন, যেখানে তাঁর প্রতিটি কবিতাই হয়ে উঠেছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জীবন্ত উদাহরণ। কবি নির্মলেন্দু গুণও তাঁর মননকে চিহ্নিত করেছেন সকল প্রাণের অভয়ারণ্য হিসেবে।

    এনামূল হক পলাশের সৃষ্টিশীলতার এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর মাহমুদ দারবিশ, তুরস্কের নাজিম হিকমত কিংবা আধুনিক সাহিত্যের জাদুকর পাওলো কোহেলহো-র অনুবাদ করে তিনি বাংলা ভাষার পাঠকদের বিশ্বসাহিত্যের মূলধারার সাথে যুক্ত করেছেন। একই সাথে বাংলার লোকায়ত ‘মালজোড়া’ গানের স্রষ্টা বাউল কবি রশিদ উদ্দিনের ভাস্কর্য নির্মাণ এবং ‘ভূমি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার ধারণাপত্র তৈরির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন- তিনি শুধু মগড়া নদীর বাঁকের লোকজ ঐতিহ্যকে ধারণ করেন না, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেও জানেন।

    ​কবি যখন সমকালের অন্যায় দেখে চুপ থাকেন, তখন সাহিত্য তার নৈতিক ভিত্তি হারায়। কিন্তু এনামূল হক পলাশ ছিলেন আপসহীন। ২০০৯ সাল থেকে আদেশ বা দলদাসত্বের বাইরে এসেও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর কলম ছিল সোচ্চার। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির এক মানসিক ও আর্থিক সংগঠক। স্বৈরাচারী সরকারের চোখরাঙানি, বিভাগীয় মামলা এবং দুর্গম হাওরে শাস্তিমূলক বদলির শিকার হয়েও তিনি বুক চিতিয়ে লড়েছেন। আবু সাঈদের নির্মম শাহাদাতের পর তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসে এক অনবদ্য অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যা স্বৈরাচারের পকেটস্থ মানচিত্রের বিরুদ্ধে বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়ানো এক যুবকের বীরত্বকে অমর করে রাখে। এই দ্রোহেরই কাব্যিক সংকলন তাঁর ১১তম গ্রন্থ ‘পলায়নের আগে’, যা স্বৈরাচারের পতনের আগের উত্তাল প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

    যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে কবি নিজ বাসভবনের ছাদে গড়ে তুলেছেন এক দৃষ্টিনন্দন ছাদবাগান, যার ছোট ছোট চৌবাচ্চায় ফুটে থাকা শাপলা আর পদ্ম দেখে কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর বাসস্থানের নাম দিয়েছেন ‘স্থলপদ্ম’। পাখির কিচিরমিচির আর সবুজের সমারোহে ঘেরা সেই নিভৃত কোণে বসেই কবি খুঁজে নেন জীবনের মূল সুর।

    অধ্যাপক বিধান মিত্রের ভাষায়, তিনি তাঁর ভাবনাপূঞ্জকে পাঠক-বোধাতীত জগতে নিয়ে যাননি, কবিতার ভাব-লয়-দেহকে তিনি বরাবরই মাটি ও মানুষ সংলগ্ন রেখেছেন। জীবনের বিচিত্রতা কবিকে দিন দিন সহজ হওয়ার সাধনার দিকে নিয়ে গেছে। তিনি সাধু হতে চান না, বরং সহজ হয়ে অন্তরাশ্রমের পথ বেয়ে পৃথিবীর বুকে ভালোবাসার ফুল ছড়িয়ে দিতে চান।

    ​আরব ভূখণ্ডের তপ্ত মরুভূমির প্রতিরোধ-গাথা থেকে শুরু করে মেছুয়া বাজারের বেণীমাধব প্লাজার সেই জীর্ণ খোপ কিংবা মগড়া নদীর ধীরস্থির বাঁক পর্যন্ত এনামূল হক পলাশের যে সাহিত্যিক পরিভ্রমণ, তা আসলে মানবাত্মারই এক নিরন্তর অন্বেষণ। যথার্থ কবিতা কালান্তরের পথে নতুন নতুন অর্থ ধারণ করে মূর্ত হয়। তিনি মাটির কাছাকাছি থেকে, আঞ্চলিক সংস্কৃতির বৈভবকে বিশ্বজনীন রূপ দিয়ে, মানুষের মুক্তির গান গেয়ে চলেছেন। একজন সৃজনশীল কর্মবীর, আপাদমস্তক কবি এবং সহজের সাধক হিসেবে এনামূল হক পলাশ সমকালীন বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য ও অপরিহার্য নাম, যার সৃষ্টি আলোড়িত করবে আগামী বহু প্রজন্মকে।

  • জনগণের সংস্কৃতি ছাড়া অন্য কোন সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য নয়- কবি এনামূল হক পলাশ

    জনগণের সংস্কৃতি ছাড়া অন্য কোন সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য নয়- কবি এনামূল হক পলাশ

    কথা-কবিতা-গানে নেত্রকোণার দুর্গাপুরে অনুষ্ঠিত হলো শরৎ উৎসব ১৪৩২৷ ১৬ অক্টোবর ২০২৫ বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার শহীদ সন্তোষ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সোমেশ্বরী নদীর কাশবাগানে এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

    অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমির পরিচালক কবি পরাগ রিছিল। সংগঠনের সভাপতি পলাশ সাহার সভাপতিত্বে ও কবি মামুন রণবীরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আলোচনা করেন উপজেলা বিএনপির সহ সভাপতি এম এ জিন্নাহ, আব্দুল্লাহ আল মামুন মুকুল, কবি ও চিন্তক এনামূল হক পলাশ, প্রাবন্ধিক পল্লব চক্রবর্তী, এডভোকেট মানেশ সাহা, কবি জীবন চক্রবর্তী, কবি জন ক্রসওয়েল খকসি, কবি দুনিয়া মামুন, সাংবাদিক দিলোয়ার হোসেন তালুকদার, কাজল মিয়া, টুকন সরকার, সায়মন খান, জাহাঙ্গীর আলম রিপন এবং উমর ফারুক।

    বক্তব্যে কবি ও চিন্তক এনামূল হক পলাশ বাংলাদেশের সংস্কৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। তিনি বলেন, জনগণের সংস্কৃতি ছাড়া অন্য কোন সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য নয়। সকল সংস্কৃতি একটি স্বতঃস্ফূর্ত ক্রিয়া। এগুলোর জন্ম বা মৃত্যু কারও হাতে নাই। বিগত সময়ে একটি গোষ্ঠী সংস্কৃতির নামে কর্তৃত্ববাদ কায়েম করেছিল। আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছি। জনগণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করাই হবে আমাদের প্রধান কাজ।

    প্রথমবারের মতো সোমেশ্বরী নদীর চরে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে এসে অতিথিরা আনন্দ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। উৎসবে গান পরিবেশন করেন বাউল শিল্পী আরজ আলী এবং বাউল পথিক লোকমান।

  • যতীন সরকার ছিলেন বাংলার নবজাগরণ মহাগ্রন্থের শেষ অধ্যায়

    যতীন সরকার ছিলেন বাংলার নবজাগরণ মহাগ্রন্থের শেষ অধ্যায়

    এনামূল হক পলাশ: আজ ১৮ আগস্ট। যতীন স্যারের ৯০। ঠিক চার দিন আগে যতীন স্যার আমাদেরকে রেখে অনন্তের পথে যাত্রা করেছেন। 

    আমি অধ্যাপক যতীন সরকারকে যতীন স্যার হিসেবে বলছি এই কারণেই যে, তিনি আমাদের সময়ের একজন শিক্ষক এবং আমাদের সময়ে আমরা শিক্ষকদেরকে স্যার হিসেবেই জানি। তিনি তথাকথিত প্রভু মানসিকতার কর্তৃত্ববাদী স্যার নন, বরং তিনি আমাদের গুরু। তিনি আমাদেরকে পথ দেখান। আমরা যা চিন্তা করতে পারিনা সেই চিন্তা আমাদের ভেতরে ঢুকিয়ে দিতেন। এই বিষয়ে ব্রাজিলীয় ঔপন্যাসিক এবং গীতিকার পাওলো কোয়েলহোর ‘বাবা, ছেলে আর নাতিদের জন্য গল্প’ থেকে একটি গল্প কোট করতে চাই। গল্পটি হচ্ছে, “যোগী রমন ছিলেন ধনুর্বিদ্যা শিল্পের একজন প্রকৃত গুরু। একদিন সকালে তিনি তার প্রিয় শিষ্যকে নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করতে আমন্ত্রণ জানান। 

    শিষ্যটি এর আগে এটি একশো বারেরও বেশি দেখেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও সে তার গুরুকে মান্য করতো।

    তারা আশ্রমের পাশে অরণ্যে ঢুকে গেল। তারপর তারা একটি চমৎকার ওক গাছের কাছে পৌঁছেছিল। রমন তার মাফলারের ভেতরে গুঁজে রাখা একটা গোলাপ ফুল বের করে ওক গাছেটার একটা ডালে স্থাপন করলেন।

    তারপর তিনি ব্যাগ খুলে তিনটি জিনিস বের করলেন: মূল্যবান কাঠ দিয়ে তৈরি নিজের চমৎকার ধনুক, একটি তীর আর সূচ দিয়ে লাইলাকের কাজ করা একটি সাদা রুমাল।

    যোগী ফুলটি যেখানে স্থাপন করেছিলেন সেখান থেকে একশত পা দূরে অবস্থান করলেন। লক্ষ্যের মুখোমুখি হয়ে তিনি শিষ্যকে রুমাল দিয়ে তার চোখ বেঁধে দিতে বললেন।

    শিষ্য তার গুরুর কথা অনুযায়ী কাজটি করল। 

    ‘তুমি আমাকে কতবার ধনুর্বিদ্যার মহৎ ও প্রাচীন খেলার অনুশীলন করতে দেখেছ?’ রমন তাকে জিজ্ঞেস করলেন। 

    ‘প্রতিদিন,’ তার শিষ্য উত্তর দিল। ‘আর আপনি সবসময় তিনশ পা দূরে থেকে গোলাপকে আঘাত করতে পেরেছেন।’

    রুমাল দিয়ে চোখ ঢেকে যোগী রমন তার পা মাটিতে দৃঢ়ভাবে রাখলেন। তার সমস্ত শক্তি দিয়ে ধনুকের জ্যা টানলেন – ওক গাছের একটি ডালে রাখা গোলাপের দিকে লক্ষ্য করলেন – আর তারপর তীরটি ছেড়ে দিলেন।

    তীরটি বাতাসে শিস দিয়ে উঠলো, কিন্তু এটি গাছে আঘাত করেনি। তীরটি লজ্জাজনক ব্যবধানে লক্ষ্য হারিয়েছে। 

    ‘আমি কি লক্ষ্যে আঘাত করেছি?’ চোখ থেকে রুমাল সরিয়ে বললেন রমন। 

    ‘না, আপনি পুরোপুরি মিস করেছেন,’ শিষ্য উত্তর দিল। ‘আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে চিন্তার শক্তি এবং জাদুকরী ক্ষমতা প্রদর্শন করতে যাচ্ছেন।’ 

    ‘আমি তোমাকে চিন্তার শক্তি সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ শিখিয়েছি,’ রমন উত্তর দিলেন। ‘যখন তুমি কিছু চাও শুধুমাত্র তাতেই মনোনিবেশ করো: কখনও এমন লক্ষ্যে আঘাত করো না যা তুমি দেখতে পাও না।’

    আমরা যতীন স্যারের জ্ঞানাশ্রমে যারা নিয়মিত ঢু মারতাম তারা তার অনুশীলন সম্পর্কে জানি। কিন্তু সবসময় একই পাঠ নিয়ে ঘরে ফিরি না। প্রায় নিয়মিত যতীন স্যারকে পাঠ করতাম, তাতে কখনো বিরক্ত হই নি। তার চিন্তা এবং দর্শন  প্রতিদিন আমাদের কাছে নতুন ভাবে ধরা দিত। যোগী রমনের মতো তিনি তার নিত্য শিষ্যদের নিত্যনতুন চিন্তা দান করে গেছেন। 

    যতীন সরকার শুধুমাত্র আমাদের শিক্ষকই নন, তিনি এই সময়ের শিক্ষক ছিলেন। তিনি জানিয়ে গেছেন, মাস্টারি করতে গিয়ে ক্লাসরুমে ৪৫ মিনিট সময়ের মধ্যে প্রতিটি ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদেরকে শুধুমাত্র পাঠদান করে গেলেও ক্লাসরুমে পাঠদানের বাইরে তার নিজস্ব চিন্তা, দর্শন, চেতনাকে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রকাশ করতে পারেননি। সেই চিন্তাগুলি প্রকাশের জন্য তিনি মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বক্তৃতা এবং লেখালেখি। যতীন সরকার এমনই একজন মানুষ যিনি অসাধারণ বাগ্মিতার জন্য সারাদেশেই জনপ্রিয় চিন্তক। তার ভাষা অত্যন্ত সরল যার মধ্যে কোন মারপ্যাঁচ নেই। তিনি সহজ এবং সরল ভাষায় কঠিন কথাটি বলে দিতে পারতেন। 

    তিনি সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করতেন। এই প্রত্যাশার মধ্যে গভীর একটি প্রশ্ন লুকায়িত আছে। তাহলে কি সংস্কৃতি এখন ঘুমিয়ে আছে? এই প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়েছেন অবলীলায় সাংস্কৃতিক দৈন্যতাকে স্বীকার করে নিয়ে। তিনি লিখেছেন, “সমাজের স্বাভাবিক চর্চা, শিক্ষা ও মানবিক উন্নয়নের যতগুলো পথ আছে, সবই বিচ্ছিন্ন থেকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সেগুলোকে একত্রিত করে মানবিক মূল্যবোধ ও জীবনবীক্ষার দিকে নিয়ে যেতে আমরা পারছি না। কারণ স্বাধীনতার মূল্যবোধের কথা আমরা শুধু মুখে বলি; কিন্তু স্বাধীনতার মূল্যবোধ আমরা ভুলে গেছি, এমনকি তা থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। স্বাধীনতার সংগ্রামে যে দল নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দল ক্ষমতায় আসার পরও তা হয়নি। কারণ যেভাবে দলটি চলার কথা ছিল, সেভাবে চলতে পারেনি।” 

    বিশাল এক সময় জুড়ে বাংলাদেশে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা অনুপস্থিত। মানুষের ভেতর রাজনৈতিক চেতনা নেই। এই সময়ের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করলে যতীন সরকারের এই কথাটি প্রাসংগিক হিসেবে ধরা দেয় আমাদের মাঝে। যতীন সরকারের চিন্তা সবসময়ই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে ধারণ করে অগ্রসর হয়। তিনি বিশ্লেষণ করেন দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে। অথচ কী সহজ এবং সরল বয়ানে তিনি অবলীলায় নিজের চিন্তাকে প্রকাশ করতে পারেন। এই বিষয়টি যতীন সরকারকে অন্যান্য চিন্তকদের থেকে আলাদা করেছে।

    তিনি মনে করতেনন মানুষের সার্বিক মুক্তির লড়াই হচ্ছে প্রকৃত লড়াই। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্যে লুকায়িত আছে উন্নত মানুষের সভ্যতার চাবিকাঠি। তিনি ভারতীয় সাধু বা সুফির দর্শনের বিজ্ঞান ভিত্তিক রূপের প্রতিচ্ছবি। জীবনকে ব্যখ্যা করেন বস্তুবাদী দৃষ্টিতে। সাধু সন্তুর সাথে হয়তো বস্তুবাদ যায় না, কিন্তু যতীন স্যার আপাদমস্তক একজন সাম্প্রয়িকতাবিরোধী চেতনার একজন মানুষ। তাকে অসাম্প্রদায়িক বলা যাবেনা, কারণ তিনি তার জীবন দর্শন এবং লেখায় অন্যান্য বস্তুবাদীদের মতো সম্প্রদায়কে অস্বীকার করেন নি। সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব স্বীকার করে ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদকে অস্বীকার করেছেন। এখানেই একজন যতীন সরকারের বিশেষত্ব। 

    বাংলার নবজাগরণ যাকে বাঙালি রেনেসাঁও বলা হয়, ব্রিটিশ রাজের বঙ্গীয় অঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শৈল্পিক আন্দোলন ছিল, যা ১৮ শতকের শেষ থেকে ২০ শতকের প্রথম দিকে বিস্তৃত হয়। এই সময়ে বিভিন্ন সমাজ reformer এবং সাহিত্যিকরা সমাজের অন্ধকার দিকগুলোকে তুলে ধরেন এবং নতুন চিন্তাধারার প্রচার করেন। রাজা রামমোহন রায়কে এর জনক বলা হয়। 

    আমাদের যতীন স্যার ছিলেন সেই ধারায় যে মহাগ্রন্থটি রচিত হয়েছে তার সর্বশেষ অধ্যায়। 

    সংস্কৃতি জাগরণের দুটি মহাগ্রন্থ আমরা পাঠ করি। এর একটি হচ্ছে রামমোহন রায় প্রবর্তিত চিন্তাধারা। এর বিপরীত ধারার যে মহাগ্রন্থটি আছে তা লেখা এখনো চলমান আছে। 

    আমাদের কাজ হচ্ছে দুইটি মহাগ্রন্থ একত্রিত করে একটি ঐক্যের সংস্কৃতি চালু করা। স্যারের ৯০ তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। যতীন সরকারের প্রয়াণের শোক হবে আমাদের সামনে যাওয়ার শক্তি।

  • সীমান্ত হত্যা; প্রেক্ষাপট ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত

    সীমান্ত হত্যা; প্রেক্ষাপট ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত

    পটভূমি: ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ৯০ দশকে আসামের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নবাদী গোষ্ঠি আলফা বা উলফার নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালায়। যার নাম দেওয়া হয় “অপারেশন বজরং”। অপারেশন বজরং অভিযান চলা অবস্থায় উলফার সিংহভাগ নেতাকর্মীরা বাংলাদেশের সীমান্তসহ ঢাকায় আত্মগোপনে অবস্থান নেয়। বাংলাদেশের সীমান্তের অভ্যন্তরে অবস্থান নেওয়া উলফার সদস্যরা বিএসএফের উপর গেরিলা হামলার মাধ্যমে অস্ত্র, গুলাবারুদ লুটপাটসহ তাদেরকে হত্যা করে। ২০২০ সালে বিবিসির একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ঢাকাতে অবস্থান নেওয়া উলফার কেন্দ্রীয় নেতা অনুপচেতিয়া, সিদ্ধার্থ ফুকন, মুনিম নাবিস ভারতীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলনে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থনের প্রত্যাশায় ঢাকায় কর্মরত ব্রিটিশ কুটনীতি কমি. ডেভিড অস্টিনের সাথে গোপন বৈঠক করেন। উলফার নেতাকর্মীদের বাংলাদেশে অবস্থানের ফলে তৎকালীন প্রয়াত সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাকে (DGFI) অবিশ্বাস ও তীব্র সন্দেহ করে।

    দিল্লির বহুদিনের সন্দেহ বাস্তবে রূপ নেয় যখন ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় উলফার মহাসচিব অনুপ চেতিয়া গ্রেফতার হন। কিছুদিন পর নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর ফেরিঘাট হতে কয়েকজন উলফার সদস্যসহ ১০টি একে-৪৭ ও ৮০০ রাউন্ড তাজা গোলাবারুদসহ আইন শৃংখলাবাহিনী আটক করে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী স্থানীয় সাধারণ নাগরিক ও তৎকালীন বিডিআর উলফাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ও মদদ দেওয়ার সন্দেহে ভারতীয় সীমান্ত বাহিনীর (বিএসএফ) প্রতি হিংসায় সীমান্ত হত্যার সূত্রপাত ঘটার যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে।

    ০০১ সালের এপ্রিলে পদুয়া ও রৌমারীর যুদ্ধে নিহত ও ধৃত ভারতীয় বাহিনীর অবস্থা। যুদ্ধে বিজয়ী সাবেক ডিজি বিডিআর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান, ওপরে বামে

    ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের সিলেট সীমান্তের অভ্যন্তরে ভূমি দখল ও জোরপূর্বক রাস্তা নির্মাণে তৎকালীন বিডিআর প্রতিবাদ করায়, বিডিআর এর টহলরত কয়েকজন সদস্যদের ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ। এরই প্রেক্ষিতে তৎকালীন বিডিআর ২০০১ সালের ১৫ এবং ১৬ এপ্রিল বেদখল পাদুয়া গ্রাম পুনরুদ্ধার করে সেখানে ৩টি বিওপি (বর্ডার অবজারবেশন পোষ্ট) ক্যাম্প স্থাপন করে। তৎকালীন বিডিআর ক্যাম্প স্থাপনকে কেন্দ্র করে মেঘালয় রাজ্যে বিএসএফ-বিডিআর সমঝোতা আলোচনার মাধ্যমে সময়ের কাল ক্ষেপন করে। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ভারতীয় বিএসএফ পাদুয়া ঘটনার মাত্র তিনদিন পর ১৮ই এপ্রিল রৌমারী সীমান্তের বড়াই বাড়ীতে বিডিআর এর ক্যাম্প দখলের উদ্দেশ্যে ভারতের সেনাবাহিনী ও বিএসএফের যৌথ সমন্বয়ে সীমান্ত আক্রমন করে। বিএসএফের যৌথ দলের বিরুদ্ধে আক্রমন প্রতিহত করতে ক্যাম্পে উপস্থিত আটজন বিডিআর সদস্যসহ স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতায় বাংলাদেশের গৌরবময় বিজয়ের মধ্য দিয়ে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের সমাপ্তি হয়।

    বিএসএফ ও তৎকালীন বিডিআরের পতাকা বৈঠক

    বড়াই বাড়ি যুদ্ধে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি সম্বন্ধে তৎকালীন বিডিআর এর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল (অবঃ) আ.ল.মফজলুর রহমানের বাংলাভিশন টিভির ‘দেশের কথ’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী ভারতের প্রায় এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য বড়াই বাড়ি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। তারমধ্যে এক কর্ণেলসহ প্রায় চারশো ভারতীয় সেনা ও বিএসএফ সদস্য নিহত হন। দুজন সদস্যকে জীবিত আটক করে। সেই সাথে ১৮টি সৈন্যের মৃতদেহ উদ্ধার করেন। বিজয়গাঁথা এ যুদ্ধে তৎকালীন বিডিআর এর তিনজন জোয়ান শাহাদত বরণ করেন এবং বিএসএফের গুলিবর্ষনে স্থানীয় ছয়জন বাসিন্দা গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মর্টার শেলের আঘাতে বাংলাদেশের ১৭৯টি বাড়ী-ঘর ধ্বংসস্থুপে পরিণত হয়। সীমান্তের দুটি ঘটনার ফলশ্রুতিতে ভারতীয় বিএসএফ প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে সীমান্তে বাংলাদেশী বেসামরিক নাগরিকদের দেখামাত্রই গুলি করে হত্যা করে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লংঘন করছে। ভারতের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাবেক হাসিনা সরকার তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সহযোগিতা না করায় তারা বাংলাদেশের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সময় কালে সীমান্ত হত্যা বৃদ্ধির একাদিক সংশ্লিষ্টতা লক্ষ্য করা যায়।

    বাংলাদেশে বিডিআর হত্যাকান্ডের সময়কালে ২০০৯ সালে ৯৮ জন বাংলাদেশী হত্যা করে। সরকার সমুদ্র নিরাপত্তায় নৌবাহিনীর জন্য চীনের কাজ থেকে সাবমেরিন ক্রয় সংক্রান্ত আলোচনা ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সময়কালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী সীমান্তে তিন বছরে ১৪৩ জন বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা করে। ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে যথাক্রমে ৭৪ জন, ৩১ জন ও ৩৮ জন। পদ্ম সেতু নির্মানে চীনের সরাসরি অংশগ্রহণে সমঝোতার চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সময়ে ভারতীয় সীমান্তে ২০১৫ সালে ৩৫ জন ও ২০১৬ সালে ৪৪ জন। এই দুই বছরে মোট ৭৯ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করে বিএসএফ। ২০১৯ সালে ১২ থেকে ১৫ জুন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের বৈঠক। বৈঠকের সময়কালে বিএসএফের ডিজি সীমান্ত হত্যাকান্ডকে “অনাকাক্ষিত মৃত্যু” আখ্যায়িত করেন। কিন্তু দুঃখজনকহলেও সত্য যে, বৈঠক নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের পূর্বেই সীমান্তে একজন বাংলাদেশীকে বিএসএফ হত্যা করে। পাঁচ মাস পর (৫ অক্টোবর ২০১৯) তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে যান। তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারত সরকারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ অসমচুক্তি হয় এবং কিছু চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী বিতর্কিত হওয়ায় শেখ হাসিনা সরকার বাস্তবায়নে সময় নেয়। অসম চুক্তি বাস্তবায়নের সময়কালে ভারতের বিএসএফ ২০১৯ সালে ৪১ জন ও ২০২০ সালে ৫১ জন বাংলাদেশীকে সীমান্তে হত্যা করে। ২০১৯ সালের ১০ মে সাতক্ষীরার কুশখালী সীমান্তে বিএসএফের হাতে নির্যাতনের শিকার হন কবিরুল ইসলাম। তার মুখ এবং পায়ুপথে পেট্রোল দেওয়া হয়। এর ১৭ দিন পর ২৭ মে নওগাঁর সাপাহার সীমান্তে আজিমুদ্দিন নামের এক রাখালের ১০টি আংগুলের নখ তুলে নেয় বিএসএফ। বর্তমানে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের নতুন মাত্রা পাওয়ায় তাঁরকাটা বেড়াসহ বিভিন্ন কারণে বিএসএফ সীমান্তে তৎপরতা বৃদ্ধিসহ সীমান্তের স্থানীয় মানুষদের উদ্বেগের কারণ সৃষ্টি করেছে। (সীমান্ত হত্যার তথ্যের সূত্র: অধিকার)

    সীমান্তহত্যা: বাংলাদেশ সরকার এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যগত পার্থক্য থাকলেও বেসরকারি সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ-ভারত ৪০৯৭ কিলোমিটার সীমান্তে ২০০৯ হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ১৬ বছরে সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ এর হাতে ৫৮৮ জন হত্যাসহ ৭৭৩ জন বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিককে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে আহত করেছে।

    সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার প্রধান কারণ প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে বিএসএফের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ। দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো ঘন বসতিপূর্ণ। উভয় দেশের বহু মানুষ নদী ভাঙনের কারণে ক্ষেত-খামার ও জীবিকা হারিয়েছে এবং শূণ্য রেখায় অবহেলিত পরিবার গুলোর জীবনমান উন্নয়নে দু্ই দেশের সরকার কার্যকরী ভূমিকা না রাখায় তারা সীমান্তে চোরাচালানে বাধ্য হয়েছে। তারা আন্তঃসীমান্ত গবাদি পশু ও বিভিন্ন পণ্য পাচারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। অনেক ক্ষেত্রে চোরাচালানের সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে অনেককে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয় বা হত্যা করা হয়। পণ্য চোরাচালানের জন্য সীমান্ত অপরাধীরা শিশুদেরকেও ব্যবহার করে থাকে। কারণ, তাদের ধরাপড়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তবে তারাও সীমান্ত হত্যাকান্ডের শিকার হয়ে থাকে।

    ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মতে আত্মরক্ষার জন্য বিএসএফ হত্যাকান্ড সংঘটিত করে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা তা বলে না। বেশ কয়েক বছর আগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) “ট্রিগার হ্যাপি” নামে একটি প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি মামলায় উল্লেখ করেছে। বেঁচে যাওয়া এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন যে, বিএসএফ তাদের গ্রেফতারের চেষ্টানা করে বা সতর্ক না করেই নির্বিচারে গুলি চালায়। বিএসএফ আরো দাবী করেছে যে, দুর্বৃত্তরা গ্রেফতার এড়ানোর চেষ্টা করলে তাদের সদস্যরা গুলি চালায়। তবে কোন অপরাধের সন্দেহে প্রাণঘাতি অস্ত্রের ব্যবহার ন্যায় সঙ্গত হয় না।

    এইচআরডব্লিউ, অধিকার ও এএসকের প্রতিবেদন এবং সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, অপরাধী হিসেবে সীমান্তে হত্যার শিকার ব্যাক্তি হয় নিরস্ত্র থাকে অথবা তাদের কাছে বড়জোড় কাস্তে, লাঠি, ছুড়ি এবং টর্চলাইট থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদের পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে পিঠে গুলি করে হত্যা করে। এমন ব্যক্তিদের মোকাবেলায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি পরিষ্কার।

    এইচআরডব্লিউ আরো উল্লেখ করেছে, তদন্ত করা মামলার কোনটিতেই বিএসএফ প্রমাণ করতে পারেনি যে, হত্যার শিকার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রাণঘাতি অস্ত্র বা বিস্ফোরক পাওয়া গেছে। যার দ্বারা তাদের প্রাণ সংশয় বা গুরুত্বর আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। সুতরাং, বিএসএফ মেরে ফেলার জন্যই গুলি চালানোর দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে মানুষের জীবনের অধিকার লঙ্ঘন করে যা ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

    সীমান্ত হত্যার মনস্তাত্ত্বিক কারণ: ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশি হত্যায় সীমান্তে আঞ্চলিক ও ধর্ম ভিত্তিক কিছু বৈশিষ্ট রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চল, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের সীমান্ত এলাকায় দুদেশের শূণ্য রেখায় বসবাসরত মানুষ খ্রিষ্টান ধর্মের। উল্লেখিত এলাকা দিয়ে প্রায় সিংহভাগ সীমান্ত চোরাচালান হয়ে থাকে। সেই সাথে অস্ত্র, গোলাবারুদ, মাদকসহ অনুপ্রবেশের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে এসব এলাকা ব্যবহৃত হয়। এই সীমান্ত এলাকায় ভারতের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সশস্ত্র বিছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর আধিপত্যে চোরাচালান সম্পন্ন হয়ে থাকে। কিন্তু বিএসএফ তাদেরকে হত্যা, নির্যাতন বা প্রতিহত না করে উল্টো তারা উত্তরবঙ্গ যশোর সীমান্তসহ যেসব সমতল সীমান্তের শূণ্য রেখায় একপাশে মুসলমান অন্যপাশে সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দু সম্প্রদায় বসবাস করে সেসব এলাকাতে মুসলমানকে টার্গেট করে সীমান্ত হত্যার ৯৯ শতাংশ হত্যাকান্ড সংঘটিত করে। এতে উদ্বেগের বিষয় যে, বিএসএফ অপরাধ বা বিনা অপরাধে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লংঘন করে হিন্দুত্ববাদ ধারণ ও পোষণ করে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম হত্যার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে কিনা তা আন্তর্জাতিক ফোরামের খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

    চোরাচালান: বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী ভারতের সাথে ১৪০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানির বিপরীত বাংলাদেশ ২০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। বিপুল পরিমান বাণিজ্য পার্থক্য থাকার পরও সাবেক হাসিনা সরকার ১১ জুলাই ২০২৩ সালে ভারতের সাথে টাকা ও রূপিতে লেনদেনের অসমচুক্তি করে। টাকা এবং রূপিতে লেনদেনের চুক্তির ফলশ্রুতিতে সীমান্তের চোরাচালানিরা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ২০২৩ সালে ভারত থেকে প্রায় সকল সীমান্ত দিয়ে প্রকাশ্যে ব্যাপক হারে চিনি চোরাচালান করে। তারা সকল প্রশাসনের নাকের ডগায় বাংলাদেশের নামিদামি ব্র্যান্ডের মোড়কে ভারতের চিনি বাজারজাত করে। ভারতের অবৈধ পথে আনা চিনিসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্য পরিশোধের নামে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা ভারতে পাচার করে। চোলাচালানের সময়কালে বাংলাদেশের নগদ টাকাসহ ডলারের একাধিকবার তারুল্য সংকট দেখা দেয়।এমন চোরাচালানি কাজে সাবেক হাসিনা সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ না থাকলে সম্ভব ছিল না।এখনও সিলেট, ময়মনসিংহ বিভাগের সীমান্ত অংশে চোরাচালান এবং টাকা পাচারসহ আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ভারতে প্রবেশের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। উল্লেখ্য, ময়মনসিংহ ও সিলেট সীমান্তে একজন সাবেক বিচারপতি, সংসদ সদস্য ও গণমাধ্যমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ স্থানীয় আইন শৃংখলাবাহিনীর কাছে আটক হয়।

    বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তথ্য অনুযায়ী এক বছরের সীমান্ত চোরাচালানের বিস্তারিত: বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি হতে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে সর্বমোট ২,১৮৪ কোটি ২৮ লক্ষ ৫২ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রকারের চোরাচালান পণ্য সামগ্রী জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। জব্দকৃত চোরাচালান পণ্যের মধ্যে রয়েছে- ১৩১ কেজি ৪২৪ গ্রাম স্বর্ণ, ১৩৭ কেজি ২৮৯ গ্রাম রৌপ্য, ২,১৪,৮০৫টি শাড়ি, ২,১০,০৬৩টি থ্রিপিস/লেহেঙ্গা/তৈরী পোশাক, ৩৩,২২,৩৬১টি কসমেটিক্স সামগ্রী, ৭০,১৫,৮২৪ কেজিচিনি, ৫৮,২৭৪ কেজিচাপাতা, ২,৩৫,৪৪৬ কেজি পেঁয়াজ, ৩,৩৮,৪৯৭ কেজি রসুন, ৬৫,২৯৮ কেজি জিরা, ৮৯,৩৬৫ কেজি মাছ, ৪,৩১,৪০৭ কেজি সুপারি, ৪৮,৫৯৮ ঘনফুট কাঠ, ৬,০৫৩ ঘনফুট পাথর, ৭,৩৭,১৮০ কেজি কয়লা, ৬১,১৪৪টি ইমিটেশন গহনা, ১৭টি কষ্টি পাথরের মূর্তি, ১৪ কেজি ৮১ গ্রাম সাপের বিষ, ৮ কেজি ৩৯৮ গ্রাম তিমির বমি (অ্যাম্বারগ্রিস), ৩৩,১৩২ কেজি কারেন্ট জাল, ১২,৬৭,১৪৮ প্যাকেট বিড়ি ও সিগারেট, ২৫,৬২৪ কেজি সার, ১২,২৬২ লিটার ডিজেল/পেট্রোল/অকটেন, ৯,৯০৭টি মোবাইল, ১,০০,০০৫টি মোবাইল ডিসপ্লে, ৩,৬০,২৮৮ পিস চশমা, ১০,৩২,০৯৪ পিস চকলেট, ২,৭৮,২৫৩ প্যাকেট বিস্কুট, ২,১৮০ প্যাকেট কীটনাশক, ৩৮ কেজি ৪০০ গ্রাম কচ্ছপের হাড়, ২,৫১,৬৪,৫০৭ পিস আতশ বাজী, ২০৭টি ট্রাক/কাভার্ড ভ্যান, ৮টি বাস, ৪৭টি প্রাইভেটকার/মাইক্রোবাস, ৯১টি পিকআপ, ৩৮৩টি সিএনজি/ইজিবাইক, ৮৭৩টি মোটরসাইকেল এবং ২৩৫টি বাই-সাইকেল।

    একই সময়কালে উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ৩৮টি পিস্তল, ৫টি এসএমজি, ১৮টি গ্রেনেড, ৮টি রাইফেল, ৬টি রিভলভার, ৫২টি সকল প্রকার গান, ৮,৮৫৯ গোলা বারুদ, ৪৫টি ম্যাগাজিন, ৪টি মর্টার শেল, ৪১টি ককটেল, ১০.৪৪ কেজি গান পাউডার, এবং ২৩৩টি ব্ল্যাংক কার্টিজ।

    গত বছর বিজিবি কর্তৃক বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। এ সময়ে ৯২,১৬,৮৭৮ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৮৪ কেজি ৭৯১ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ আইস, ৩১ কেজি আফিম, ২,১৪,০২৮ বোতল ফেনসিডিল, ২,৩৯,৩৭২ বোতল বিদেশী মদ, ৭,৭৭৯ লিটার বাংলা মদ, ১,৮৪,২৮০টি মদ তৈরির ট্যাবলেট, ১৩,২৬৬ ক্যান বিয়ার, ১৫,৭৮২ কেজি গাঁজা, ২৬৪ কেজি ৮৪ গ্রাম হেরোইন, ৬,০২৪ কেজি ৩৫৩ গ্রাম কোকেন, ১৪৭ বোতল এলএসডি, ৮৯,০৭,৩৪৩টি এ্যানেগ্রা/সেনেগ্রাট্যাবলেট, ৩৬,১৭৩টি ইস্কাফ সিরাপ, ১১১,১০,৫৪৮টি বিভিন্ন প্রকার ঔষধ, ১২,৫১০ বোতল এমকেডিল/কফিডিল, ১২,৭৩,৪১২টি নেশা জাতীয় ও উত্তেজক ইনজেকশন এবং ৫৭,৭০,৭৫৭টি অন্যান্য ট্যাবলেটজব্দ করা হয়েছে।

    ২০২৪ সালে সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ আইসসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক পাচার ও অন্যান্য চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ২,০৮৮ জনকে এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের সময় ২,৬৭৮ জন বাংলাদেশী নাগরিক, ১৫৫জন ভারতীয় নাগরিক অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হয়েছে।

    তাঁরকাটার বেড়া: অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে ১৯৮৫ সালে ভারতের প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীবগান্ধী সরকার বাংলাদেশ সীমান্তে তাঁরকাটার বেড়া নির্মান শুরু করে যা এখনও চলমান। বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্তের ৪০৯৭ কিলোমিটারের মধ্যে ৩১০০ কিলোমিটারের বেশি বেড়া নির্মান করেছে। তাঁরকাটার বেড়া নির্মাণে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান বন্ধ না হয়ে উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে।

    পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মেঘালয়রাজ্য ও বাংলাদেশের ভাষা সংস্কৃতির গভীর মিলবন্ধন রয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় দুদেশের পরিবার স্থানান্তর এবং ১৯৭১ সালে ভারতের অভ্যন্তরে সীমান্তবর্তী এলাকাতে থেকে যাওয়া শরণার্থীর বাস্তবতা দুদেশের অনুধাবন করা উচিত ছিল। সেই সাথে আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূণ্য রেখায় কৃষি জমি চাষাবাদ ও নদী ব্যবহারে হত্যা-নির্যাতন বড় একটি কারণ। বেড়া নির্মানের পূর্বে তিন প্রজন্মের রক্তের আত্মীয়তা সম্পর্কের পরিবারগুলোর যোগাযোগের ব্যবস্থা করে তাঁরকাটার বেড়া নির্মাণ করা উচিত ছিল। বর্তমানে কাটা তাঁরের বেড়া একটি মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

    বিবিসির তথ্য মতে ২০২২ হতে ২০২৩ সালে ভারতে ১০৬৪ জন বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ করেছে, তার মধ্যে হিন্দু ৩১৭ জন এবং মুসলমান ৭৪৭ জন। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী তারা ২০২৪ সালে ভারতের ১৫৫ জন নাগরিক আটক করে। ভারতের বুঝা উচিত একই সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে তাঁরকাটার বেড়া অনুপ্রবেশ বা চোরাচালান ঠেকাতে পৃথিবীতে একটি জটিল চ্যালেঞ্জ।

    সীমান্ত জটিলার চিত্র

    সীমান্ত জটিলতার চিত্র: ভারত বাংলাদেশের সীমান্ত হত্যা, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধের সমাধানে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা-

    (১) সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি, বিএসএফ ও দুদেশের স্থানীয় নির্বাহী কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি জুডিশিয়াল সীমান্ত আদালত গঠন।
    (২) সীমান্ত হত্যা বন্ধে দুই দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্ব স্ব সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে প্রকাশ্যে সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকরী নির্দেশনা থাকতে হবে।
    (৩) বর্ডার হাট সমূহের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দুদেশের স্থানীয় চাহিদা মাফিক পণ্যের সঠিক সমতা ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা তৈরী করতে হবে।
    (৪) দুই দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূণ্য রেখার মধ্যে কৃষি জমি চাষাবাদ আন্ত:সীমান্ত নদী ব্যবহারে সীমান্তরক্ষী বাহিনীদের স্থানীয় কৃষক ও জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের জীবনমান উন্নয়নে সক্রিয়ভূমিকা রাখতে হবে।
    (৫)  ভারতের অভ্যন্তরে মাদক চাষাবাদ ও উৎপাদন রোধে আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করতে হবে।
    (৬) দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী শূণ্য রেখায় বসবাস করা বেসামরিক স্থানীয় নাগরিকদের শিক্ষা, ধর্মীয় মূূল্যবোধ, সচেতনতার কর্মশালা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি ও শূণ্য রেখার ভূমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর চাষাবাদ, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানে সর্বাত্তক সহযোগিতাসহ স্থানীয়দের সাথে বিশ্বাস ও আস্থার সু-সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।

    সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান: সীমান্ত আদালতের মাধ্যমে উভয় দেশের জুডিশিয়াল বডি থাকলে অনুপ্রবেশসহ সীমান্তের বিভিন্ন অপরাধের তাৎক্ষনিক বিচার কার্যের মাধ্যমে দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে আটক ব্যক্তিবর্গের দ্রুত সময়ের মধ্যে ন্যায় বিচার পাওয়া সম্ভব। অন্যথায় দুইদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে আটক ব্যক্তিকে ধরে পুলিশে হস্তান্তর করায় প্রচলিত আইনে বিচারক র তেবা মুক্তি পেতে কাগজের জটিলতায় ভারতে কারাগারে ১০৬৪ জন বাংলাদেশের কারাগারে ১৫৭ জন বিনা অপরাধে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। যেমন নেত্রকোনা কারাগারে মইনুল ইসলাম নামের এক ভারতীয় নাগরিকের সাজা শেষ হওয়ার পরেও ২০২২ সাল থেকে শুধু কাগজের জটিলকায় জেল হাজতে আটক আছে। তারা নাগরিক অধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

    বিএসএফের গুলিতে নিহত ফেলানি খাতন (১৫)

    বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামের উচিত একটি নিরপেক্ষ সীমান্ত আদালত গঠনের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। উভয় দেশের নাগরিক অন্যায়ের শিকার হলে ন্যায় বিচারের প্রয়োজনে অভিযোগ জমা দিবে। উক্ত সীমান্ত জুডিশিয়াল আদালতটি হবে স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সীমান্তের নাগরিক অধিকারের আইন কাঠামোর মধ্যে।

    জুডিশিয়াল সীমান্ত আদালতের প্রয়োজনীয়তা: কুড়িগ্রাম সীমান্তে ১০ বছর বয়সী ফেলানী খাতুনকে মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যা করে প্রাণহীন দেহটি তাঁরকাটার বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখার দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও ন্যায়বিচারের দাবী থাকলেও প্রধান আসামী বিএসএফের সদস্য অমির ঘোষসহ তার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিএসএফের নিজস্ব আদালতে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে নির্দোষ প্রমাণিত হন। রায়পূর্ণ বিবেচনা করেও এ কি আদালত পূর্বের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। ফেলানীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নির্দেশনা থাকলেও আমলে নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ভারত দুই দেশের সরকার পর্যায়ে একাধিকবার সীমান্ত হত্যা বন্ধে উভয়পক্ষ আশ্বস্থ করে। সেইসাথে বিজিবি এবং বিএসএফের ডিজি পর্যায়েও ৫৪ বার সংলাপের মাধ্যমে সীমান্ত হত্যা বন্ধে সমঝোতা চুক্তি হলেও দিল্লির কম গুরুত্বের কারণে সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

    বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নেত্রকোনা সীমান্তের বিজয়পুর (বিওপি) বিজিপির সদস্য সাদ্দাম হোসেন চোরাচালান পণ্য পাচারের প্রলোভন দেখিয়ে ২০২৩ সালে উপজাতি এক নারীকে ধর্ষণ করে। এরপর উক্ত অপরাধে তাকে বাহিনীর আইনে চাকুরীচ্যুত করা হয়। একই জেলার বারমারী (বিওপি) ক্যাম্পের কতিপয় বিজিবি সদস্য আমিনুল নামের স্থানীয় এক চোরাকারবারীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ২০২৩ সালে গুলি করে হত্যা করে। দুটি ঘটনাই বাহিনীর নিজস্ব আইনে বিচার করায় ভুক্তভোগীরা ন্যায় বিচার হতে বঞ্চিত হয়েছে।

    দুই দেশের সরকারের সীমান্তে হত্যা কান্ডের দায় মুক্তির কোন সুনির্দিষ্ট অনুমোদন না থাকলেও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি বিএসএফ ও বিজিবিকে ফৌজদারি কার্যবিধির বাইরে রাখা হয়। এমন জবাবদিহিতার বাইরে থাকায় সীমান্ত হত্যার ঘটনাগুলো উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

    সীমান্তে বিএসএফ গুলি কিংবা নির্যাতনে ক্রমাগত বাংলাদেশি হত্যাকরছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন হলেও চীন বা নেপাল সীমান্তে তা অসম্ভব। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর ও বর্তমানে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নয়াদিল্লির নীতি নির্ধারকদের উচিৎ আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুসরণ করে সীমান্ত সমস্যার সমাধান করে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

     

    লেখক: লুৎফর জামান ফকির
    গণমাধ্যম কর্মী ও সাবেক সেনা সদস্য
    মোবাইল নং- ০১৭৩৯৯৩৩৩৮২
    ই-মেইল: lutforarticale@gmail.com
    ফেসবুক আইডি: ডিটেকটিভ আর্টিকেল

  • মহান বিজয় দিবস ২০২৪ উপলক্ষে নেত্রকোণা জেলা প্রশাসকের বাণী

    মহান বিজয় দিবস ২০২৪ উপলক্ষে নেত্রকোণা জেলা প্রশাসকের বাণী

    ১৬ ডিসেম্বর, বাঙ্গালি জাতির এক গৌরবময় দিন, জাতীয় ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণ। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পৃথিবীর মানচিত্রে “বাংলাদেশ” নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিন আজ। আজ মহান বিজয় দিবস। মহান স্বাধীনতা ও বিজয়ের ৫৩ বছরপূর্তিতে আপনাদের সকলকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

    বাঙ্গালীর ইতিহাস সকল শোষন, বঞ্চনার নাগপাশ ছিড়ে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধমে বিজয় ছিনিয়ে আনার ইতিহাস। সকল অন্যায়, অবিচার, বঞ্চনা, অধিকারহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার সুমহান মহিমায় ভাস্বর আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস। বাঙ্গালির মুক্তি সংগ্রামের লক্ষ্য ছিলো রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন। ‘৫২ এর ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতার যে বীজ উপ্ত হয়েছিল দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম ও নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ তা পূর্ণতা পায় এবং পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ ন’মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়।

    মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে নেত্রকোণা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সারা দেশের ন্যায় নেত্রকোণার মানুষও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, জীবন বাজি রেখে আত্মহতি দিয়েছিল তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বরে নেত্রকোণা জেলা মুক্ত হয়। আমি গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি নেত্রকোণা জেলায় মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যাদের অপরিসীম আত্মত্যাগ ও মরণপন সংগ্রামের ফলে নেত্রকোণা জেলা পাকহানাদার বাহিনী মুক্ত হয়েছে।

    আজকের ৫৪তম মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে নেত্রকোণাবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আসুন, আমরা দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগের শপথ গ্রহণ করি। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেত্রকোণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সবাই একযোগে কাজ করি। আপনাদের সবার জীবন কল্যাণ হোক।

  • শব্দদূষণ: আধুনিক শহরের এক নীরব ব্যাধি 

    শব্দদূষণ: আধুনিক শহরের এক নীরব ব্যাধি 

    শব্দদূষণ আধুনিক শহর জীবনের এক বড় সমস্যা। নগরায়ন ও শিল্পায়নের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে শব্দদূষণ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। যানবাহনের অপ্রয়োজনীয় হর্ন, নির্মাণকাজ, লাউডস্পিকার এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান শব্দদূষণের প্রধান উৎস। এই সমস্যা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
    শহর কিংবা গ্রাম সবখানেই এখন শব্দদূষণ। অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে মাইকে বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণা। রাজধানী ঢাকাসহ সকল শহর-গ্রামগঞ্জে বাসাবাড়িতে থাকা অবস্থায়, রাস্তাঘাটে চলাচল করার সময় শব্দদূষণের অত্যাচারে টেকা দায়। 

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, স্বাভাবিক শব্দের সহনীয় মাত্রা ৫৫-৬০ ডেসিবেল। কিন্তু ঢাকার মতো শহরে এটি ৮৫ থেকে ১২০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশেই এই শব্দদূষণে আক্রান্ত । এই মাত্রার শব্দ দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এটি শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, এবং মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। শিশু ও বয়স্করা শব্দদূষণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল।

    শব্দদূষণ শুধু মানুষের ওপরই নয়, প্রাণীজগতেও বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। শহরের উচ্চ শব্দ বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। এটি প্রাকৃতিক পরিবেশে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে।  

    সমস্যাটি সমাধানের জন্য ব্যক্তি এবং সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত, অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে স্কুল, হাসপাতাল এবং আবাসিক এলাকায় লাউডস্পিকার ও উচ্চশব্দের যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। যানবাহনচালকদের উচিত রাস্তায় ধৈর্য বজায় রেখে প্রয়োজন ছাড়া হর্ন বাজানো থেকে বিরত থাকা। বিশেষ করে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকার সময়, তেমন বাধা ছাড়াই গাড়ি চলছে এমন অবস্থায় বা পথচারীদের অযথা হর্ন দিয়ে বিরক্ত করা উচিত নয়।যানবাহনচালকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ট্রাফিক পুলিশ এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। 

    সরকারি উদ্যোগেও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা এবং অন্যান্য শাস্তি আরোপ করতে হবে।

    শব্দদূষণ একটি নীরব ঘাতক। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা একটি চ্যালেঞ্জ হলেও এটি অসম্ভব নয়। ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি।  তাই সবাই মিলে সচেতন হয়ে শব্দদূষণ মোকাবিলায় এগিয়ে আসা উচিত।

    লেখক: আবদুল হান্নান, ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট। 
  • চারণ কবি গীতিস্বামী গোকুলানন্দ সিংহ এর ১২৮তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

    চারণ কবি গীতিস্বামী গোকুলানন্দ সিংহ এর ১২৮তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

    কমলগঞ্জ(মৌলভীবাজার)প্রতিনিধিঃ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সমাজ জাগরণের অগ্রদূত চারণকবি গোকুলানন্দ গীতিস্বামী’র ১২৮ তম জন্ম বার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে।      সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় মঙ্গলবার(২৬ নভেম্বর) সকাল ১১ টায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর মণিপুরী ললিতকলা একাডেমির আয়োজনে ও মণিপুরী নাট্যশিল্পী গোষ্ঠির সহযোগিতায় একাডেমির অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।      আলোচনা সভায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদিক আল শাফিনের সভাপতিত্বে ও নাট্য প্রশিক্ষক শুভাশিস সিনহার সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন কমলগঞ্জ প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক এম. এ. ওয়াহিদ রুলু,মণিপুরী সমাজ কল্যাণ সমিতির সভাপতি প্রতাপ চন্দ্র সিংহ,বিশিষ্ট লেখক শ্রী সুরেন্দ্র কুমার সিংহ,মণিপুরী সমাজের পন্ডিত শ্রী ধনকৃষ্ণ অধিকারী,বাংলাদেশ মণিপুরী যুব কল্যাণ সমিতির সভাপতি শিবানন্দ সিংহ।      এছাড়া বক্তব্য রাখেন, সাংবাদিক নির্মল এস পলাশ,উপেন্দ্র সিংহ প্রমূখ।      এ আগে এক বর্ণাঢ্য র্যালি ও প্রয়াত গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর স্মৃতি সৌধে পুষ্পস্তবক অর্পন করা হয়। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন মণিপুরী ললিতকলা একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা প্রভাস চন্দ্র সিংহ।      আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে গুণীজনেরা বিভিন্ন সময় সমালোচিত হলেও পরবর্তীতে সত্যিই তাঁদের মূল্যায়ন হয়ে থাকে। গোকুলানন্দ গীতিস্বামী এমনই একজন গুণী ব্যক্তি। যিনি সকল সমালোচনার উর্ধ্বে থেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে আলোর পথ দেখিয়েছেন।       আলোচনাসভা শেষে মণিপুরী শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ।

  • “কাঙ্ক্ষিত শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক ও আমার ভাবনা”

    “কাঙ্ক্ষিত শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক ও আমার ভাবনা”

    উজ্জ্বল রায়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, নালিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়,লোহাগড়া,নড়াইল

    ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব ব্যাপী পালিত হয়ে থাকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই দিবসটি শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করার জন্য পালন করা হয়। ইউনেস্কোর মতে, বিশ্ব শিক্ষক দিবস শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পালন করা হয়। বিশ্বের ১০০টি দেশে এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ বিগত বছর থেকে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশ সরকার’কে বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে দেরিতে হলেও শিক্ষকদের জন্য আলাদা একটি দিবস ঘোষণা করে উদযাপন করার জন্য। কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার জন্য চাই কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক! শিক্ষা ও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা দু’টি ভিন্ন শব্দ এবং আলাদা অর্থ বহন করে। পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও হাতে কলমে শেখা এবং সমাজ সভ্যতার বাস্তবতা থেকে কোনোকিছু শেখা-ই হলো শিক্ষা! আর কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা হলো সেই শিক্ষা যা রাষ্ট্র তাঁর ভৌগলিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটা নির্দিষ্ট মানদণ্ডের আলোকে অর্জিত হবে বলে নির্ধারন করে এবং তা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখে পরিশেষে তা অর্জিত হলে তবে সেটা-ই হয় কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা!! কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা বাস্তবায়নে প্রধান সহায়ক বা গুরুত্বপূর্ন উপকরণ হলো কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক। শিক্ষক আর কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক শব্দ দু’টিও ভিন্ন অর্থ বহন করে। শিক্ষক যে কেউ যেকোনো স্থান থেকে হতে পারে আর কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক হলো রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট মানদন্ড ও যোগ্যতার আলোকে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা বাস্তবায়নে সহায়ক ব্যক্তি। কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার জন্য যেমন দরকার কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক, তেমনি কাঙ্ক্ষিত শিক্ষকের প্রয়োজন কাঙ্ক্ষিত সম্মান ও সম্মানি! আজকের আধুনিক সমাজ বাস্তবতায় কাঙ্ক্ষিত শিক্ষকের বড়ই অভাব! কেননা, শিক্ষক আর আগের মতো করে সম্মানও পাই না সম্মানিও পাই না! অবশ্য আজকের এই অবস্থার জন্য শিক্ষকদের এককভাবে দায়ী করার সুযোগ নাই, কেননা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের মতো মহান দায়িত্ব যারা পালন করেন তাদের কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা, স্বচ্ছতা, নিরেপেক্ষতা সহ যদি শতভাগ জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকে তবেই জাতি হিসেবে আমরা পেতে পারি কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক! আজকাল কাঙ্ক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা একেবারের সীমিত হয়ে গেছে; এ দায় কার…!! বাস্তবতার নিরিখে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত সম্মানী নির্ধারণ একটা গুরুত্বপুর্ণ যোগ্যতা। আমি নিশ্চিত করে জানাতে চাই আমাদের দেশে শিক্ষকতা পেশায় যদি কাঙ্ক্ষিত সম্মানী নিশ্চিত থাকতো তাহলে আমদের দেশের মেধাবী যোগ্যতা সম্পন্ন প্রজন্মই তাদের কাঙ্ক্ষিত পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকেই বেছে নিতো এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা ভিন্ন, আমরা তথা আমাদের প্রজন্ম কাঙ্ক্ষিত পেশা না পেয়ে জীবন চালাতে বাস্তবতার নিরিখে কোনোকিছু করতে না পেরে শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নেই জীবিকা হিসেবে। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র তাঁর কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক নির্বাচনে ব্যর্থ হয়!! আমাদের রাষ্ট্র যে পুরোপুরি ব্যর্থ তা কিন্তু বলছি না, কারন বর্তমান শিক্ষকদের মধ্যেও স্বল্পসংখ্যক কাঙ্ক্ষিত শিক্ষক আছে বলেই এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। তবে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা বাস্তবায়নে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে শিক্ষকদের কাঙ্ক্ষিত সম্মানী নিশ্চিতের মাধ্যমে।

    শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর, জ্ঞানের ফেরিওয়ালা আর শিক্ষাকে যদি জাতির মেরুদণ্ড ধরা হয়, তবে সেক্ষেত্রে শিক্ষকরা হলেন শিক্ষার মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ডহীন প্রাণী যেমন চলতে পারে না, তেমনি মেরুনন্ডহীন শিক্ষাও অকার্যকর। এই শব্দগুলো ধ্রুব সত্য কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো আজকাল এই শব্দগুলো কেন যেন বক্তৃতা বিবৃতির ভাষাতে যুক্ত হয়ে শ্রোতেদের রসদ জোগাতে সহায়তা করে। পেশা হিসেবে শিক্ষকতা একটি মহান সেবামূলক পেশা এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আজকের সমাজ সভ্যতায় যখন মানুষের সম্মান ও মূল্য নির্ধারিত হয় অর্থে তখন শিক্ষকরা থাকেন সেখানে সমাজের পেছনের সারিতে! যা আমাকে শুধু হতাশ-ই করে না ভাবতেও শেখায় আগামী প্রজন্মের শিক্ষকদের সম্মানের দুর্ভিক্ষ নিয়ে! পরিশেষে বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৪ এ আমার স্বাধীন মতামত “কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক; আর কাঙ্ক্ষিত শিক্ষকের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন কাঙ্ক্ষিত সম্মানী”।

  • বাংলাদেশে হিন্দু নারীর উত্তরাধিকার ধর্ম এবং সংবিধানের আলোকে

    বাংলাদেশে হিন্দু নারীর উত্তরাধিকার ধর্ম এবং সংবিধানের আলোকে

    ব্যারিস্টার কেয়া সেন
    আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

    অনুপম পাল বাঁশখালী প্রতিনিধি

    আমরা সকলেই হয়ত এই ব্যাপারে অবগত আছি যে বাংলাদেশে কোন হিন্দু কন্যা সন্তান তার পিতার সম্পত্তিতে একচ্ছত্র উত্তরাধিকারী হন না দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী। বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু আইনে কন্যা সন্তানকে বিবাহ দেওয়ার মাধ্যমেই একজন পিতা দায়মুক্ত হন এবং পরবর্তীতে সে আর পিতার সম্পত্তিতে কোন অংশীদার হিসেবে পরিগণিত হন না। হিন্দুদের মহাপবিত্র এবং প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদে এই ব্যাপারে বেশ কিছু রেফারেন্স দেওয়া আছে যেখানে দেখা যায় নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক সন্তান পিতা-মাতার নিকট সমান অধিকার এর দাবিদার। এ ব্যাপারে ঋকবেদের ৩.৩১.২ অনুযায়ী ‘’পিতা মাতার স্নেহের অধিকার পুত্র এবং কন্যা উভয় সন্তানেরই সমান এবং তারা উভয়ই সমান দামী। বিয়ে হলেই মেয়ে তার পিতা- মাতার বাড়ি হতে আলাদা হয়ে যায় না তাকে আলাদা করে ধন নয় বরং শিক্ষা ও সম্পদে পরিপূর্ণভাবে তৈরি করে তাকে প্রেরণ করা হয়’’।
    ঋকবেদের ৩১ নং সুক্তের ২নং মন্ত্রে বলা হয়েছে আলাদা করে কন্যার বরকে সুক্ষ ধন দেওয়া নয় বরং সেই কন্যা যেন সন্তান জন্ম দিয়ে তাকে যাতে পূর্ণরূপে মানুষ করে গড়ে তুলতে পারে সেই শিক্ষায় আলোকিত করে দিতে হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায় মহা পবিত্র বেদে নারীদেরকে কতটা সম্মানিত করা হয়েছে এবং কখনোই তাকে পুত্র সন্তান হতে পৃথক করা হয়নি তাকে শিক্ষা দানের মাধ্যমে প্রকৃত সম্পদ রূপে পরিণত করার কথা বলা হয়েছে।উল্লেখ্য যে, এখানে যৌতুক প্রথাকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
    আবার, হিন্দু ধর্ম মতে স্ত্রী ধন এমন একটি সম্পদ যা একান্তই একজন নারীর ব্যক্তিগত এবং তার অনুমতি ব্যতীত কেউ তা ব্যবহার বা হস্তক্ষেপও করতে পারেন না। কিন্তু, প্রকৃত অর্থে হিন্দু নারী তার প্রাপ্য স্বাধীন স্ত্রীধন কি সত্যিই স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারেন বা করলেই কতটুকু পারেন । কেননা আমাদের সমাজ অনেক ক্ষেত্রেই তা করতে দেয় না কিন্তু এটি সম্পূর্ণরূপে ধর্মবিরোধী। মনু সংহিতার ৩.৫২ নং শ্লোকে বলা হয়েছে ‘’কন্যার পতি বা শ্বশুরবাড়ির লোক কন্যার সম্পত্তি, বিবাহের সময় প্রাপ্ত স্ত্রীধন পেতে চাইলে সেই পাপাচারিগণ অধোগতি লাভ করেন’’। এখানে এটা স্পষ্ট যে বরপক্ষ কর্তৃক কোন প্রকার যৌতুক চাওয়া বা গ্রহণ করা হিন্দু ধর্মীয় নীতিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং কন্যার প্রাপ্ত স্ত্রীধনের উপর একমাত্র অধিকার কন্যার নিজের। পবিত্র বেদে বেদের নির্দেশনা অনুসরণ করে ১৯৫৬ সালে হিন্দু সাকসেশন ল’ এর মাধ্যমে ভারতে হিন্দু পুত্র-কন্যা নির্বিশেষে পিতার সম্পত্তিতে উভয়ের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছেন ভারতীয় সরকার। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরেও বাংলাদেশের হিন্দু নারীদের সম্পত্তিতে একচ্ছত্র অধিকার দেওয়া হয়নি আজ অবধি। এখনো বাংলাদেশের দায়ভাগা আইন অনুসারে একজন বিধবা নারী তার স্বামীর সম্পত্তিতে কেবলমাত্র জীবন সত্ত্বের মালিক এবং একজন অবিবাহিত কন্যা ও পুত্রবতী কন্যা তার পিতার সম্পত্তিতে জীবন সত্ত্বের মালিক। সম্পত্তি হস্তান্তর বা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এই সকল নারীদেরকে যতটুকু সুযোগ দেওয়া হয়েছে তা অনেক সময়ই প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

    আমরা যদি আবার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এর কথা বিবেচনা করি তাহলে দেখতে পাই যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে আইনের দৃষ্টিতে সমতার বিধান অর্থাৎ সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ধর্মীয় বৈষম্যহীনতার কথা। কেবল ধর্ম গোষ্ঠী বর্ণ নারী পুরুষ ভেদে বা জন্ম স্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন। নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত করিবেনা। অর্থাৎ এখানে স্পষ্টত বলে দেওয়া হয়েছে যে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে এবং এক্ষেত্রে যদিওবা হিন্দু নারীরা তাদের সম্পত্তির একচ্ছত্র উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত সেক্ষেত্রে কিন্তু রাষ্ট্র নিজ উদ্যোগে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করে এই অনগ্রসর অংশকে অগ্রগতির দিকে ধাবিত করতে পারেন। যেটি অবশ্যই সংবিধান পরিপন্থী নয়। এছাড়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদে সম্পত্তির অধিকারের কথা বলা হয়েছে এবং সেখানেও নারী পুরুষকে বৈষম্য করা হয়নি।
    দেশের প্রচলিত এই হিন্দু পারিবারিক আইনের সংস্কার আনার লক্ষ্যে ২০১২ সালে হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারের সুপারিশ বিষয়ক চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে এই আইন সংস্কার না হওয়ার পেছনে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে ও রাষ্ট্রীয় সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে ‌। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের প্রচলিত হিন্দু আইনের অনেক কিছুই প্রথাভিত্তিক। ব্রিটিশ আমলে প্রচলিত সতীদাহ প্রথার কথা যেটি প্রকৃতপক্ষে হিন্দুদের কোন ধর্মগ্রন্থ সাপোর্ট করত না কিন্তু তা প্রথা হিসেবে প্রচলিত ছিল পরবর্তীতে মহর্ষি রাজা রামমোহন রায় এই সতীদাহ প্রথা বন্ধ করে মানবিকতার জয় গান গেয়ে গেয়েছেন । আবার আমরা বিধবা বিবাহের কথা বলতে পারি যেখানে বিধবা বিবাহ ধর্মীয় বিধানে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধ।ঋকবেদের ১. ১৮.৭-৮ এ বলা হয়েছে স্বামীর মৃত্যুতে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল বা সামাজিকভাবে সমস্যার সম্মুখীন বিধবা মহিলাকে পুনর্বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
    পরাশর সংহিতার ৪.৩০ অনুযায়ী নারীর যদি স্বামী মারা যায়, স্বামী যদি গোপনে সন্ন্যাস গ্রহণ করে, নিখোঁজ হয়ে যায়, সন্তান উৎপাদনে ব্যর্থ হয়, অধার্মিক ও অত্যাচারী হয় তবে নারী পুনরায় বিবাহ করতে পারে।বিধবা বিবাহের পক্ষে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক গৃহীত উদ্যোগে পক্ষে স্বাক্ষর ছিল ৯৮৭ টি আর বিপক্ষে স্বাক্ষর ছিল ৩৬,৭৬৩ টি। অর্থাৎ অনেক সময় দেখা যায় যে ‘’Majority wins’’ কথাটি সব ক্ষেত্রে সঠিক নাও হতে পারে।
    অনেকে মনে করেন হিন্দু নারীদেরকে সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার চূড়ান্তভাবে দিলে তাদের ভেতরে ধর্মান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ধর্মান্তরিত ব্যক্তি কোন ভাবেই সম্পত্তি পাবে না ধর্মান্তরিত ব্যক্তি সম্পত্তি পাওয়ার আগে ধর্মান্তরিত হলে তার প্রাপ্য সম্পত্তি তার ধর্মান্তর না হওয়া ভাই বোন হিন্দু স্ত্রী বা স্বামী সন্তান পাবে। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে ধর্মান্তরিত ব্যক্তি সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত হবেন। এখানে উল্লেখ্য যে ১৮৫০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে Cast Disabilities Removal Act নামে একটি আইন প্রণীত হয়েছিল যেখানে ধর্ম পরিবর্তিত হলেও কোন ব্যক্তি সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত হতেন না। কিন্তু বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার বাংলাদেশ স্বাধীনের পূর্বের কিছু আইন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন যার মধ্যে The Caste Disabilities Removal Act, 1850 আইনটি উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৩ সালে এই উদ্দেশ্যে Bangladesh Laws Revision and Declaration act 1973 প্রণীত হয়। এর অর্থ এই যে, এই আইন প্রণীত হবার পর থেকে বাংলাদেশে পূর্বের প্রচলিত The Caste Disabilities Removal Act, 1850 বহাল নেই অর্থাৎ হিন্দু পার্সোনাল ল’ বহাল থাকছে, মানে ধর্মান্তরিত হলে কোন ব্যক্তি হিন্দু বা মুসলিম নির্বিশেষে সে তার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।
    অর্থাৎ এখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে ধর্মান্তরিত হবার ভয়ে মেয়েদেরকে সম্পত্তির উত্তর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণরূপে অযৌক্তিক যেখানে ধর্মান্তরিত হবার পর অটোমেটিক্যালি কোন স্ত্রী বা পুরুষ তার সম্পত্তির অধিকার হতে বঞ্চিত হবেন। পরিশেষে এটুকু বলা যায় রাষ্ট্র এবং প্রগতিশীল সমাজে এটুকু আমরা আশা করতে পারি যে ধর্মের সাথে মিল রেখে যেখানে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং নেপালে নারীদেরকে সমানভাবে সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার দিয়েছে সেখানে ধর্মীয় বিধান খর্ব করা হয়নি তাই বাস্তবতা নিরিখে এবং বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাংলাদেশের হিন্দু নারীদেরকে ধর্মীয় বিধান এবং সংবিধান অনুযায়ী সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করলে দেশ জাতি এবং রাষ্ট্রের মঙ্গল বয়ে আনবে। সবশেষে আমরা এটুকুই বলতে চাই যে আমরা ধর্মীয় বিধানের পরিপন্থী কোন আইন চাই না আমরা চাই ধর্মীয় বিধানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে হিন্দু আইনে একটি সংশোধন এবং সংযোজন, যা অবশ্যই হিন্দু ধর্ম এবং দেশের প্রচলিত সংবিধান

  • অন্তরাশ্রমের উদ্যোগে কবি দোলন প্রভার পঁয়ত্রিশ বর্ষপূর্তির আড্ডা অনুষ্ঠান

    অন্তরাশ্রমের উদ্যোগে কবি দোলন প্রভার পঁয়ত্রিশ বর্ষপূর্তির আড্ডা অনুষ্ঠান

    নেত্রকোনায় অন্তরাশ্রমের উদ্যোগে ৮ জানুয়ারি সোমবার বিকাল ৪ টায় কবি দোলন প্রভার পঁয়ত্রিশ বর্ষপূর্তির আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শহরের নাগড়া এলাকায় স্থলপদ্মে সাহিত্যের ছোট কাগজ অন্তরাশ্রম আয়োজিত এই আড্ডায় নেত্রকোনার কবি, আবৃত্তিকার, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক ও রাজনীতিবিদসহ অনেক ব্যক্তি অংশ নেন। একই সাথে কবির জীবন ও কর্মের ওপর আলোকপাত করে প্রকাশিত হয় অন্তরাশ্রমের ৫ম সংখ্যা।

    আড্ডায় উপস্থিত সকলে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। অন্তরাশ্রম ছোট কাগজের প্রকাশক ও সম্পাদকের শুভেচ্ছা বক্তব্যের মাধ্যমে আড্ডা শুরু হয়।

    পত্রিকার সম্পাদক এনামূল হক পলাশ জানান, ‘চিন্তা এবং চেতনার বিকাশের এই যুগে প্রাগ্রসর ও অগ্রবর্তী চিন্তাকে আমরা সব সময় স্বাগত জানাই। পৃথিবীতে যেদিন আমি বা আমার শব্দটি উচ্চারিত হয়েছিল সেদিনই সময় বন্দী হয়ে গেলো একটি খাঁচায়। অবরুদ্ধ হয়ে গেল সময়। এই অবরুদ্ধ সময়ের বিপরীতে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে যায়। তারা লড়াই করে সেই সময়ের বিরুদ্ধে। অন্তরাশ্রম সবসময় সুন্দর মানসিকতাগুলোকে ধারণ করে। আমরা দোলন প্রভার জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাকে নিয়ে একটি সংখ্যা প্রকাশ করতে পেরে আনন্দিত।’

    এরপরে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন প্রকাশক মাহবুবা এনাম সোমা এবং নারী নেত্রী লিপি রাণী সরকার। দোলন প্রভার জীবনের ছোট ছোট ঘটনা ও প্রসঙ্গের অবতারণা করে শুভেচ্ছা জানান বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি সজীব সরকার রতন, লেখক অনাবিলা অনা, কবি নাদিম সিদ্দিকী, অধ্যাপক শাখাওয়াত হোসেন আকাশ এবং ছাত্রনেতা তানভীর মোক্কাম্মেল। এছাড়াও কবি, গল্পকার ও শিক্ষক পূরবী সম্মানিত দোলন প্রভার কবিতা বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। অন্তরাশ্রমের এমন ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজনের তিনি প্রশংসা করেন এবং সাধুবাদ জানান। লেখক ও প্রাবন্ধিক অনুপ সাদি অন্তরাশ্রম থেকে প্রকাশিত দোলন প্রভা সংখ্যা প্রকাশ এবং কবির বৈচিত্র্যপূর্ণ কর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রাখেন।

    এছাড়াও অধ্যক্ষ ও লেখক আনোয়ার হাসান সামাজিক জীবনে লেখালেখি করবার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে আলোকপাত করেন। আবৃত্তিকার শিল্পী ভট্টাচার্য্য’র গানের মাধ্যমে আড্ডার সমাপ্তি হয়। এছাড়াও আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন ছাত্র গালিব হাসান, তিথি সরকার, আহনাফ হক প্রমুখ। আড্ডার শেষে সকলেই কবি দোলন প্রভার কাছ থেকে উন্মুক্ত কথাবার্তাসহ তাঁর জীবনের ছোট ছোট ঘটনা ও অভিজ্ঞতা শোনেন।

  • এ নেশার শেষ কোথায়

    এ নেশার শেষ কোথায়

    ইমন মিয়া, সাঘাটা (গাইবান্ধা)
    শহর থেকে গ্রামাঞ্চল-সর্বত্রই নেশা এখন হাতের নাগালে।শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। তার বিষাক্ত ছোবল শেষ করে দিচ্ছে তারুণ্যের শক্তি ও অমিত সম্ভাবনা। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের অবক্ষয়, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির অসামঞ্জস্যতা, হতাশা এবং মূল্যবোধের অভাবের সুযোগ নিয়ে মাদক তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তরুণ সমাজের প্রতি। বেকারত্বও মাদকের বিস্তারে সহায়ক- এমন কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা। এই মরণ নেশার বিস্তারে সমাজে একদিকে যেমন অপরাধ বাড়ছে, তেমনি ভাবে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক শৃঙ্খলা। এই অবস্থা চলতে থাকলে একটি সমাজের অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

    মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে মাদকদ্রব্যের প্রাপ্তি সহজলভ্য যাতে না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো মূল্যে ঠেকাতে হবে মাদকের অনুপ্রবেশ। দেশেও যাতে মাদকদ্রব্য উৎপাদন হতে না পারে সে ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে হবে। দুঃখজনক হচ্ছে, মাঝে-মধ্যে ছোটখাট মাদককারবারি ও মাদকের চালান ধরা পড়লেও তাদের মূল কুশীলবরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

    অভিযোগ রয়েছে, সমাজের প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তিবর্গ এসব সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত থাকায় তাদের টিকিটি স্পর্শ করতে পারে না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। মাদকের সর্বনাশা দিক নিয়ে অনেক সম্পাদকীয় স্তম্ভে অনেকবারই লিখতে দেখেছি। কিন্তু অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি।

    মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে মাদক সিন্ডিকেট যতই শক্তিশালী হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতারও কোনো বিকল্প নেই। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতার উন্মেষ ঘটাতে হবে।

  • অর্পিত সম্পত্তি আইন নিয়ে বিভ্রান্তি এবং ব্যাখ্যা

    অর্পিত সম্পত্তি আইন নিয়ে বিভ্রান্তি এবং ব্যাখ্যা

    অনুপম পাল, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

    ব্যারিস্টার পল্লব আচার্য
    সুপ্রিম কোর্ট অফ বাংলাদেশ

    বর্তমানে সময় অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে অর্পিত সম্পত্তি আইন নিয়ে, আসলে অর্পিত সম্পত্তি বলতে আমরা কি বুঝি? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে ভারত ও পাকিস্তান মধ্যকার ১৭ দিনব্যাপী যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৬৫ সালে ৬ সেপ্টেম্বর, এদিন তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পাকিস্তান প্রতিরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করেন ও পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধি জারি করেন, যে সকল নাগরিক তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চলে গেছেন তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি পূর্ব পাকিস্তান শত্রু-সম্পত্তি ( Enemy Property) হিসেবে গণ্য করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭৪ সালে এই শত্রু সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি বা Vested Property হিসেবে নামকরণ করা হলো।

    ২০০১ সালে সংসদে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন করে প্রকৃত মালিক বা তার ওয়ারিশদেরকে সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয় কিন্তু যথাযথ বিধিমালা না থাকায় তা আলোর মুখ দেখেনি, ২০১১ এবং ২০১২ সালে সরকার তা সংশোধন করে বিধিমালা প্রণয়ন করে এবং ২০১২ সালে সম্পত্তির অবমুক্ত করার বিধিমালা চূড়ান্ত করে, গেজেট প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে “ক” এবং “খ” তফসিলের মধ্যে “খ” তফসিল বাতিল করে সম্পত্তি অবমুক্ত করা হয়।
    “ক” তালিকাভুক্ত সম্পত্তি বলতে বুঝায় যে সম্পত্তি গুলো সরকারের দখলে রয়েছে। যদি কারো নাম ভুলক্রমে “ক ” তালিকাভুক্ত হয়ে থাকে অবশ্যই মামলা করার মাধ্যমে তা অবমুক্ত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে অর্পিত সম্পত্তি আইন ২০০১ ধারা ১৩ অনুযায়ী “ক” তফসিলভুক্ত সকল সম্পত্তি অবমুক্ত করার জন্য অবশ্যই অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ ট্রাইবুনালে মামলা করতে হবে। এক্ষেত্রে উক্ত সম্পত্তি নিয়ে যদি দেওয়ানি আদালতে কোন মামলা অনিষ্পন্ন থাকে তাহলে সেই মামলা আপনা আপনি Abate হয়েছে বলে গণ্য হবে।
    একজন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আমি মনে করি ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের এর ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হল মামলার দীর্ঘজট বা সময় ক্ষেপণ থাকবে না অন্যদিকে বিচার প্রার্থীরা দ্রুত রায় পাবেন। এমনকি কারো যদি তামাদি মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে থাকে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে তামাদি মওকুফ এবং রায়ের জন্য আবেদন করতে পারে।
    উক্ত আইনের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে জেলা প্রশাসক মহোদয় উক্ত সম্পত্তি চাইলে‌‌ ইজারা দিতে পারবেন। এতে করে কোন সরকারি সম্পত্তি চাইলে পেশী শক্তি দিয়ে দখল বা ভোগ করতে পারবে না এবং অন্যদিকে সম্পত্তি ইজারা দেওয়ায় সরকারের রাজস্ব আদায় হবে। এই আইনের ১১ ধারায় বলা হয়েছে , ট্রাইব্যুনাল উহার ডিক্রী বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে, ডিক্রী প্রস্তুত হওয়ার ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) দিন পর, রায় ও ডিক্রীর অনুলিপি জেলা প্রশাসকের নিকট প্রেরণ করিবে এবং জেলা প্রশাসক এই ধারা অনুযায়ী উক্ত ডিক্রী বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জেলা প্রশাসক অনধিক ৩০ দিনের নোটিশ প্রদান করবেন যদি উক্ত সম্পত্তি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকলে তা দখল পরিত্যাগ করার জন্য, উপরোক্ত সময়ের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর করা সম্ভব না হলে পরবর্তী ৩০ দিনে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট দখলদার থেকে আইনগতভাবে উচ্ছেদ করতে পারবেন।
    যদি জেলা প্রশাসক কোন সম্পত্তিকে ইজারা দিয়ে থাকেন এবং সেই সম্পত্তি নিয়ে কারো যদি দাবি থাকে তাহলে ২৫ ধারা অনুযায়ী ট্রাইবুনাল চাইলে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিতে পারবেন।
    সম্প্রতি মহামান্য হাইকোর্ট অর্পিত সম্পত্তি আইন এর ৯, ১৩, ১৪ ধারা এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে যে দুটি রীট পিটিশন করা হয়েছিল তা খারিজ করে দিয়েছেন। তার অর্থ এই দাড়ায় এই আইনটি সংবিধান পরিপন্থী নয় এবং পূর্বের ন্যায় এই আইনটি কার্যকর। যদি কোন আদালতে দেওয়ানি মামলা অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে চলমান থাকে তাহলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে Abate হয়ে যাবে।
    অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে মাননীয় হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ এই রায় দেওয়াতে সকল দেওয়ানি প্রকৃতির মামলা Abate করা এবং জেলা প্রশাসক ইজারা বা লিজ দিতে পারার ক্ষমতা কতটা আইনসম্মত? প্রকৃত অর্থে এই আইনের প্রথম থেকে এই ক্ষমতা ছিল, আমি মনে করি অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে মামলা করার জন্য আলাদা ট্রাইবুনাল হওয়াতে মামলা সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা দ্রুত সমাধান করা যাবে এবং রায় বাস্তবায়ন হবে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসকের উক্ত সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক করায় অবৈধ দখলদার মুক্ত থাকবে, জবাবদিহিতার আওতায় থাকবে এবং ইজারা দিয়ে সরকার রাজস্ব আদায় করতে পারবে।

  • কিশোর গ্যাং কালচারের অবসান কোথায়?

    কিশোর গ্যাং কালচারের অবসান কোথায়?

    দলগতভাবে কতিপয় কিশোর যখন বিভিন্ন অপরাধ মূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরে,তখন তাকে কিশোর গ্যাং বলে।পত্রিকা,অনলাইন নিউজ,মিডিয়ায় বিভিন্ন খবরে কিশোর গ্যাং কালচারের বিভিন্ন ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠছে।এসব খবর পড়লেই হৃদয়টা কেমন যেন ধুমড়ে-মুচড়ে উঠে।বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে অধিকাংশ কিশোর গ্যাং এর সদস্যদের বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে,আর এদের সদস্য থাকে প্রতি গ্রুপে ১০-১৫ জন।যে বয়সটায় নিজেকে একজন আদর্শ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে টেবিলে বই,খাতা কলম নিয়ে অধ্যাবসায় নিয়ে পড়াশুনার কথা সেই বয়সটায়,অধিকাংশ কিশোর ঝড়ে পড়ছে।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশে ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি,এদের মধ্যে ১ কোটি ৩০ লক্ষ শিশু,শিশু শ্রমের সাথে যুক্ত।জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল(UNFPA) এর তথ্য মতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯৫% বিদ্যালয়ে যায়।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য,মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া উপযুক্ত বয়সীদের মধ্যে ৬২% বিদ্যালয়ে যায়।এসব শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়ার কারণ কি?কিশোরীদের মধ্যে ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই ৫৯% কিশোরীর বিয়ে হয়ে যায়,আর কিশোররা বেপরোয়া হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পরে,ঝড়ে পড়ছে।কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পিছনের নৈপথ্যে কারা দায়ী?এর দায় পরিবার,সমাজ,শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান,রাষ্ট্র কেউ এড়াতে পারে না।নিম্ম বিত্ত পরিবারের মা-বাবারা তাদের সন্তানদের সময় দিতে পারে না,উভয়েই কাজ করে।আর মধ্যবিত্ত-উচ্চ বিত্তরা অধিক সম্পদ অর্জনের পিছনে ছুটে নিজেদের সন্তানদের সময় দেওয়ার ব্যর্থতা ডাকতে যখন যা চায় তাই দেয়।ফলশ্রুতিতে নিম্ন বিত্ত পরিবারের কিছু সন্তানেরা,উচ্চ বিক্ত পরিবারের কিছু সন্তানদের বেপরোয়া চলাফেরা,হাতে দামি ব্রান্ডের স্মার্টফোন, বাইক ইত্যাদি দেখে তারা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে।আর উচ্চ বিত্ত পরিবারের কিছু সন্তানেরা,অপসংস্কৃতিতে নিমজ্জিত হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পরে।গ্রুপিং রাজনীতি,ক্ষমতার দাপট ইত্যাদি দেখাতে পড়াশোনা না করে বেপরোয়া হয়ে ওঠে।তাদের ধারণা হয়ে উঠে,পড়াশোনা করে কি হবে,অঢেল সম্পদতো রয়েছেই।আর এদের পিছনে থাকে তথাকথিত বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘঠনের কিছু বড় ভাই।অলিখিতভাবে গ্রুপিং রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করতে,বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডকে প্রশ্রয় দেয়।আগে একটা সময় ছিল যখন এলাকায় কোনো যুবক,অন্যায় কিছু করলে যে কোনো সিনিয়র কেউ শাসন করতে পারতো,ফলে সংশোধনের একটা সুযোগ ছিলো।এখণ সেই কালচার প্রায় বিলুপ্তির পথে।অন্য কারো সন্তানকে কেউ,ভালোর জন্য কিছু বলতে গেলেও,আরো কথা শুনতে হয়,ঐ সন্তানদের পিতা-মাতায় বলে বসে,আমার সন্তানকে তুমি শাসন করার কে?আর বেপরোয়া হয়ে উঠার পিছনের আরেকটা কারণ হলো-মাদকাসক্তি।কিশোরং গ্যাং এর সদস্যরা তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে ১০-১৫ জন মিলে বিভিন্ন ন্যাককারজনক মারামারি,ছিন্তায় সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড ঘটিয়ে থাকে।এলাকার একজন মাস্টার চাচাকে বলা হয়েছিলো,আপনারা এলাকার বেপরোয়া কিশোরদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার করেন না কেন?উনি দুঃখ নিয়ে বলেছিলেন- এরা এতোটাই বেপরোয়া যে,রাস্তা-ঘাটে একা পেয়ে যে ছুরি মারবে না বুকে এটার কি গ্যারান্টি আছে?এ কথা শুনার পর নিঃস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।এদের সঠিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন সুস্থ বিনোদন,সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থা।স্কুলে যখন পড়তাম তখন দেখতাম বিকালে এলাকার প্রায় প্রত্যকটা মাঠ,ফুটবল,ক্রিকেট ইত্যাদি বিভিন্ন খেলায় প্রাণবন্ত থাকতো।আর সন্ধ্যার আগেই প্রায় সবাই খেলা শেষ করে বাড়ি গিয়ে পড়াশোনা করে,ঘুমাতো।সকাল হতে বিকাল পর্যন্ত পড়াশোনা,স্কুল।হঠাৎ করেই এ দৃশ্যপট বদলে গেছে,এখনকার কিশোররা স্মার্টফোনের ভিতর বিভিন্ন অনলাইন গেইম,টিকটক ইত্যাদিতে ছোট্র একটা ডিভাইসে নিজেদের জগৎকে আবদ্ধ করে ফেলেছে,নিজেদের জগতে নিজেদেরকে রাজা ভাবতে শুরু করেছে।দিন রাত পড়াশুনা বাদ দিয়ে,একটি অসুস্থ ধারায় জীবনের মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট করছে।আর মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে কিশোর গ্যাং তৈরি করে,কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে সংঘবদ্ধভাবে শহর থেকে গ্রামে প্রত্যেকটা এলাকায় এরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।আর সামান্য কিছু নিয়েও মারামারি করে হত্যার মত ন্যাককারজনক,জঘন্যতম ঘটনাও ঘটাচ্ছে।এসব কিছুর লাগাম টেনে না ধরতে পারলে,আল্লাহ না করুক এই জাতিকে চরম মূল্য দিতে হবে।এজন্য পরিবার,সমাজ,রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সকলকে এক যুগে কাজ করে একটি সুস্থ জাতি বিনির্মানে এগিয়ে আসতে হবে।মৌলিক চাহিদা, সুস্থ বিনোদন,সঠিক শিক্ষা ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে।নিজেদের স্বার্থে যারা কিশোর গ্যাং এর সদস্যদের প্রশ্রয় দেয় ওদেরকেও তদন্ত সাপেক্ষে আইনের আওতায় এনে, কিশোর গ্যাং এর শিকড়কে উপড়ে ফেলতে হবে।আর দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক কিশোর সংশোধন কেন্দ্র নেই।দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক কিশোর সংশোধন কেন্দ্র নির্মাণ করে মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসক এর মাধ্যমে কিশোরদের সঠিক কাউন্সিলিং নিশ্চিত করতে হবে।আর পরিবার,সমাজ,রাষ্ট্র
    শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান,সুশীল সমাজ,শিক্ষাবিদ,আইনজীবী,বুদ্ধিজীবী,সাংবাদিক, রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণী ফোরাম,সরকার সহ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট সকলকেই যে যার অবস্থান থেকে সচ্চার হতে হবে।বেপরোয়া হয়ে ওঠার আগেই কিশোরদের সঠিক শিক্ষা,সুস্থ বিনোদন ইত্যাদি সব কিছু নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসতে হবে।সকলের সম্মিলিত প্রয়াসই পারে কেবল কিশোর গ্যাং এর কালচারের অবসান ঘঠিয়ে একটি সুস্থ পরিবার,সমাজ,জাতি,রাষ্ট্র গঠন করতে।আমিও স্বপ্ন দেখি একদিন এই কিশোর গ্যাং কালচারের অবসান ঘটবে।তাইতো শেক্সপিয়ারের উক্তিটি বলতে চাই-” The miserable have no other medicine but only hope”(শুধুমাত্র আশা ছাড়া হতভাগ্যদের আর কোনো ঔষুধ/তাবিজ নেই।আমিও আশাবাদী ইনশাআল্লাহ,
    একটি সুস্থ জাতি বির্নিমানে সকলেই এগিয়ে আসবে এই কামনাই করি।
    লেখক:
    মোঃমাসুম বিল্লাহ বিবিএ, এমবিএ,মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ,জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

  • অনলাইন গেইম আগ্রাসনের শেষ কোথায়?

    অনলাইন গেইম আগ্রাসনের শেষ কোথায়?

    আমরা প্রায় সবাই আসক্ত,কেউ অনলাইনে,কেউ অফলাইনে,কেউ খেলাধুলায়,কেউ ভালোবাসায়।প্রায় সকলেরই কোনো না কোনো বিষয়ে আসক্তি রয়েছে,এই আসক্তিকে জয় করতে পারলেই কেবল মুক্তি।

    যে কোনো বিষয়ের প্রতি আসক্তির মাত্রা ঠিক ততটুকুই হওয়া উচিত,যতটুকু আসক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে।স্কুল,কলেজ এমনকি প্রাইমারি স্কুল পড়ুয়া ছোট ছেলেরাও ফ্রি ফ্রায়ার,পাবজির মতো অনলাইন গেইমে চরমভাবে আসক্ত। এই আসক্তির মাত্রা এতটাই তীব্র যা মাদকাসক্তির চেয়েও কোনো অংশ কম বলে মনে হয় না।

    ফ্রি ফ্রায়ার অনলাইন গেইমে চরমভাবে আসক্ত এক যুবককে জিক্ষেস করেছিলাম, একটানা কতক্ষণ খেলাও?ছেলেটা গর্বের সহিত উত্তর দিয়েছিলো,ভাই রাত ১২টা থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত,একটানা খেলার রেকর্ড আছে।কৌতূহল নিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম এমনটা কতবার খেলেছো,সে বললো বেশ কয়েকবার। যে বয়সটায় মেধা-মনন,সৃষ্টিশীলতা বিকাশের সময়, সেই সময়টাই প্রায় অধিকাংশ সময় স্বাভাবিক কার্যক্রম পড়াশুনা প্রায় সবকিছু বাদ দিয়ে ছোট্ট একটা মোবাইল ফোনের ডিভাইসে নিজেকে আবদ্ধ করে রেখেছে।

    ফলশ্রুতিতে,মেধার স্বাভাবিক বিকাশ না ঘটে মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে।নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে যাচ্ছে।আমাদের সময় যখন স্কুল,কলেজ এ পড়তাম তখন মনে আছে সকাল থেকে শুরু করে বিকাল পর্যন্ত আমাদের কার্যক্রম ছিলো পড়াশোনা। আর বিকাল বেলা মাঠে অল্প সময় ফুটবল,ক্রিকেট খেলে,সন্ধ্যার আগেই খেলা শেষ করে,যে যার মত বাড়িতে গিয়ে সন্ধ্যা হতে মধ্য রাত অবধি পড়াশুনা করে স্কুল-কলেজের পড়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়তাম।রাতে রাস্তা-ঘাটে,দোকানে,মাঠে আড্ডা দেওয়া ভাবাই যেতো না।আর বর্তমানের তরুনরা অনলাইনে ফ্রি ফ্রায়ার,পাবজি, টিক টক ইত্যাদিতে আসক্ত হয়ে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

    ওদের নিয়ন্ত্রণ ওদের কাছে নাই,ওদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে ফ্রি ফ্রায়ার,পাবজি ইত্যাদি অনলাইন গেইম।
    এ বিষয়ে যথাযথ কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি অনতিবিলম্বে এসব অনলাইন গেইম বন্ধ করে, তরুনদের সুস্থ স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা হোক।অন্যথায় আল্লাহ না করুক,অদূর ভবিষ্যতে এ জাতির চরম মূল্য দিতে হবে।
    লেখকঃ-
    মোঃমাসুম বিল্লাহ,বিবিএ,এমবিএ
    মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ
    জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
    সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

  • ঈদ নিয়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের ভাবনা

    ঈদ নিয়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের ভাবনা

    ঈদ হলো সকল মুসলিমের প্রাণের উৎসব। এই ঈদ কে ঘিরে তরুণদের থাকে নানা পরিকল্পনা, নানা আয়োজন। তরুণরা ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে যায় নিজ পরিবারের কাছে। এবারের ঈদুল আজহা তে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা তুলে ধরেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জবি ফিচার রাইটার্স সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক সিদরাতুল মুনতাহা।

    ঈদ আনন্দ হোক সীমাহীন
    ঈদ মানে খুশি,ঈদ মানে বহু আত্মার মিলন মেলা। প্রতিবছরই বাড়িতে পরিবারের সাথেই ঈদ উদ্যাপন করা হয়। কিন্তু এবার একটু ভিন্ন পরিকল্পনা। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এবার চলে যাবো নানা বাড়ি। নানা, মামা-মামি, মামাতো ভাই-বোনেরা, চাঁদরাতে হাতে মেহেদী পরা, ইউটিউব দেখে নতুন কিছু রান্না করা,আশা করি সব মিলিয়ে অনেক সুন্দর সময় কাটবে সবার সাথে। ঈদ পরবর্তী দিনগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা আছে। অনেকদিন পরে শহুরে হাওয়া বদল করে গ্রামীণ পরিবেশ, নদী, সবুজ প্রকৃতিতে মিশে যাওয়া,একটা অন্যরকম আত্মতৃপ্তি কাজ করবে। ঈদের আনন্দটা প্রকৃত অর্থে পূর্ণতা পাবে।

    সুমাইয়া সিকদার অনামিকা
    লোক প্রশাসন বিভাগ
    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

    পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ
    জবিতে আসার পর এইটা আমার প্রথম ঈদুল আজহা।গত কয়েক বছর ইদ সাধারণত আমার ছোট্ট পরিবারের সাথেই কাটানো হয় কিন্তু এইবার ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে।এইবার ইদের আনন্দ চাচা চাচি, কাজিনদের সাথে ভাগ করে নিতে গ্রামে যাবো। গ্রামে যাওয়ার কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে পাশের চিত্রা নদীর সাথে থাকা সুন্দর স্মৃতি গুলো।সব কিছু মিলায়ে এইবার ইদের আনন্দ কয়েক গুন বেশি হবে, কারণ সাথে কয়েক গুন বেশি নিজের লোকেরা থাকবে আর নিজের চিরচেনা সেই গ্রাম সব কিছুতেই একটা পূর্ণতা নিয়ে আসে।

    জান্নাতুল ফেরদৌস ইথু
    ইতিহাস বিভাগ
    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

    ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হোক ঈদের আনন্দে
    ঈদ আমাদের জীবনে নিয়ে আসে খুশি,সৌহার্দ্য ও শান্তির বার্তা। সকল ভেদাভেদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করার সুযোগ নিয়ে আসে ঈদ। পবিত্র ঈদুল আজহায় মহান আল্লাহ তাআলার নৈকট্যলাভের লাভের উদ্দেশ্য হলো কুরবানি করা। সকল মুসলমানের পরিকল্পনা হওয়া উচিত নিজ পরিবারের সাথে ঈদ পালন করা ও সবার মাঝে হাসিখুশি ছড়িয়ে দেওয়া। ধর্মীয় বিধান মেনে কুরবানির ত্যাগের মহিমা নিজের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে হবে। পরিবার আত্মীয় স্বজনদের সাথে ঈদ কাটানোর ও সকলের সাথে ঈদ আনন্দে মেতে উঠার মধ্যে রয়েছে প্রকৃত সুখ। সুতরাং ছোট- বড় সবার সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিলেই ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট থাকবে।

    আশিক মিয়া
    ভূমি ব্যাবস্থাপনা ও আইন বিভাগ
    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

    ত্যাগের উৎসব ঈদুল আজহা
    বছরের দুইটি ঈদের মধ্যে একটি হলো ঈদুল আজহা, যা মুসলমানদের ত্যাগের উৎসব। বছর ঘুরে আবার মুসলমানদের এই ত্যাগের উৎসব আসতে চলেছে। প্রতিবারের মত এইবার ও সকল মুসলমান তাদের সামর্থ্যের মধ্যে পশু কুরবানি করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়। এই ত্যাগের মহিমা ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে। ঈদের আনন্দ, উচ্ছ্বাস ভাগাভাগি করে নিতে যান্ত্রিকতার শহর ছেড়ে সকলেই হচ্ছে ঘরমুখো। সকলে নিরাপদে নিজ নিজ পরিবারের কাছে পৌঁছে ঈদ উদযাপন করুক এমনটাই প্রত্যাশা।

    হাবিবুল বাসার
    লোকপ্রশাসন বিভাগ
    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

    ঈদ বয়ে আনুক শান্তি ও সমৃদ্ধি
    সারাদিন ক্লাস, প্রেজেন্টেশন, ভাইবা এবং পরীক্ষা, এরপর আবার টিউশন কিংবা কোচিং: সবমিলিয়ে ব্যস্ত সময় পার করার মধ্যেই চলে এলো পবিত্র ইদুল আযহা। দীর্ঘ দুইমাস পর পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আবারও ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবো, এই ভেবেই ব্যাচেলর লাইফের সকল কষ্ট দূর হয়ে গেলো। চাঁদরাতে সবার সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়, পরিবারের সদস্যদের সাথে একসাথে ইদের নামাজ থেকে শুরু করে কোরবানি, ঈদের প্রতিটি বিকেলে বন্ধুদের সাথে মেঘনার তীরে আড্ডা, ছোট ভাই-বোনদেরকে নিয়ে নানাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া, কাজিনদের সাথে আড্ডা ও মজা: সবমিলিয়ে প্রতিবছর ঈদুল আজহা এক অন্যরকম ভালোলাগা নিয়ে আবির্ভূত হয়। পরিশেষে, ইদ জীবনে বয়ে আনুক সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি।

    আমিরুল ইসলাম রোকন
    লোক প্রশাসন বিভাগ
    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

    ত্যাগের হোক প্রতিবারের ঈদ

    বছরে দুইবার ঈদ আসে। তার মধ্যে ঈদুল আজহা অন্যতম। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার দিন ঈদুল আজহা। স্রস্টার কাছে নিজের সমস্ত ত্যাগ সমর্পণের দিন এটি। ত্যাগের শিক্ষা আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিফলিত হলেই প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি ও সৌহার্দ্য। একটি পশুকে বছরের পর বছর লালন-পালন করতে যেয়ে অনেক আবেগ ভালোবাসার অংশীদার হয়ে যায়। পরিবারের সাথে তার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে পড়ে। আর অনেক সময়তো সন্তানতুল্য। তাই পশু কেনার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। তেমনিভাবে কোরবানি দেওয়ার পরে বর্জ্য নির্দিষ্ট কোনো একটা জায়গায় ফেলতে হবে। তা না হলে এসব বর্জ্যের ফলে রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে। নিজ নিজ দায়িত্বে সবাইকে বর্জ্য পরিষ্কারে সচেষ্ট হতে হবে।

    মিজানুর রহমান মিজান
    শিক্ষার্থী, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন
    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

  • আজ (১২ জুন) বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস

    আজ (১২ জুন) বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস

    স্বীকৃতি বিশ্বাস, যশোরঃ

    আজ ১২ জুন ‘বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস’। দিবসটি উপলক্ষে আজ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষাকল্পে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে সভা,সমাবেশ করে টেবিলে ঝড় তুলে ফেলেছেন।

    ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ’ অনুমোদিত হলে ১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শিশুশ্রম বন্ধ করতে এক কর্মসূচি হাতে নেয় এবং ২০০২ সালের ১২ জুন থেকে আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম সংস্থা (আইএলও) বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহনের মাধ্যমে প্রতিবছর দিবসটি ‘বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করে।
    আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র সর্বশেষ এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি ছয় জন শিশুর মধ্যে একজন শ্রমিক এবং প্রতি তিন শিশু শ্রমিকের মধ্যে দুইজনই অর্থবান পরিবারে গৃহকর্মের সাথে যুক্ত এবং এসকল শিশুর সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয় না।

    বিভিন্ন এনজিও শিশুদের কথা বলে বিদেশ থেকে যে ফান্ড কালেকশান করে সে গুলোর কতটুকু শিশুদের জন্য ব্যয় হয় ? তার সঠিক হিসাব যেমন সরকারি কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে নেই তেমনি দাতা সংস্থার কাছেও নেই।
    আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বিশ্ব শিশুশ্রম বিরোধী দিবস উদযাপন উপলক্ষে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, বেশীরভাগ শিশুই এমন অবস্থায় কাজ করছে যা ‘ক্রীতদাসের কাছাকাছি’। এতে বলা হয়েছে, কর্মরত বেশিরভাগ শিশু শ্রমিকের বয়সই ৫ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে এবং এদের ৭১% শতাংশ মেয়ে শিশু। এদের অধিকাংশই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এ সকল শিশু শারিরীক এবং যৌন হিংসতার ঝুঁকির মুখে রয়েছে। শিশুশ্রম বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই অপ্রকাশিত থাকে উল্লেখ করে আইএলও এ ব্যাপারে নতুন আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান আহ্বান করেছে। শিশু শ্রমিকরা বেশির ভাগই ঘরে কাজ করায় তাদের কাজের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। “শিশুরা কাজ করে কিন্তু শ্রমিক হিসেবে তাদের কে গণ্য করা হয় না এবং পারিবারিক পরিবেশে থাকা সত্বেও তাদের প্রতি পরিবারের সদস্যের মতো আচরণ করা হয় না।
    ‘শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস’এ আমাদের দেশের সরকারের কাছে দাবী রাখি – ‘রাষ্ট্র’ দায়িত্ব নিক সমস্ত অপ্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসাস্থান শিক্ষা ও চিকিৎসার । পুঁজিপতির ঋণ মকুব না করে, অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন খাতে খরচ বন্ধ করে, জনপ্রতিনিধির ব্যয়বরাদ্দ কমিয়ে এবং সমরাস্ত্র কেনার প্রতিযোগিতা বন্ধ করে সরকারী কোষাগার থেকে অনায়াসে এ অর্থের যোগান দেওয়া যেতে পারে।
    ভবিষ্যতের সুনাগরিক দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আর এই সুনাগরিক গড়ে তুলতে হলে আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন করার সাথে সাথে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সমাজের মৌলিক সমস্যার সমাধান একান্ত প্রয়োজন।

  • স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে যশোরের দুঃখ হিসাবে খ্যাত ভবদহ জলাবদ্ধতার সমাধান করব- এসএম ইয়াকুব আলী

    স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে যশোরের দুঃখ হিসাবে খ্যাত ভবদহ জলাবদ্ধতার সমাধান করব- এসএম ইয়াকুব আলী

     

    আগামী দ্বাদশ জাতীয় সাংসদ নির্বাচনকে উপলক্ষ্য করে সারাদেশের ন্যায় যশোর-০৫ মনিরামপুর আসনের নৌকা মার্কার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে সাধারণ মানুষের সাথে গণসংযোগসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশে গ্রহন করে ব্যস্ত সময় পার করছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্ম বিষয়ক উপ-কমিটির নির্বাহী সদস্য,বিশিষ্ট সমাজসেবক ও সিটি প্লাজার চেয়ারম্যান জনাব আলহাজ্ব এস এম ইয়াকুব আলী।
    তারই ধারাবাহিকতায় আজ শুক্রবার (৯ জুন) বৃহত্তর মনিরামপুর উপজেলার পূর্ব এলাকার হরিদাস কাটি ইউনিয়নের দিগংগা শ্রী শ্রী হরি মন্দিরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক মতুয়া মহা সম্মেলনে অংশ গ্রহন করেন।
    দিগংগা গ্রামবাসীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত বার্ষিক মতুয়া মহা সম্মেলনে সম্মানিত অতিথি হিসাবে বক্তৃতাকালে এস এম ইয়াকুব আলী বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেন ধর্ম যার যার,উৎসব সবার- এই মহা বাণী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে তিনি সকল ধর্মের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চান এবং মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থেকে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনিরামপুর থেকে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট নমিনেশন চাইবেন।এক্ষেত্রে তিনি জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকলের দোয়া ও আর্শিবাদ কামনা করেন।
    বক্তৃতাকালে তিনি বলেন, মতুয়াদের বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যক্রমে পাশে থাকতে চাই। আমি সুন্দর মনিরামপুর
    এবং সুন্দর পূর্ব এলাকা উপহার দিতে চাই। আমি বক্তৃতায় নয় কাজে বিশ্বাসী।যদি আপনারা আর্শিবাদ করেন এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি মন থেকে আমাকে এই আসনটি উপহার দেন তাহলে আপনাদের নিয়েই এই মনিরামপুরকে গড়তে চাই।
    এ সময় স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের ভবদহের স্থায়ী জলাবদ্ধতার সমস্যার বিষয়ে বলেন, পরিকল্পিতভাবে ভবদহের সমস্যার সমাধান না করে দিনের পরে দিন,বছরের পর বছর,যুগের পর যুগ জিইয়ে রাখা হয়েছে। আমাকে যদি মনিরামপুরের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে আপনাদের সাথে করে নিয়েই ভবদহের সমস্যার সমাধান করবো বলে কথা দিচ্ছি। তিনি আরও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশটা স্বাধীন করে দিয়েছেন বলে আজ আমরা স্বাধীনভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলছি। আর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অক্লান্ত পরিশ্রম করে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীলে দেশের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।তাঁর জন্য সকলে মন থেকে আর্শিবাদ করবেন।
    হরিচাঁদ বাছাড়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন হীরামন বিশ্বাস, বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মতুয়া রত্ন শ্রী হরি পদ ধর এবং প্রধান বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মতুয়া রত্ন শ্রী দশরথ মন্ডল।

    এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন গৌর কুমার ঘোষ সহ-সভাপতি মনিরামপুর উপজেলা আওয়ামীলীগ জনাব সন্দীপ ঘোষ সাংগঠনিক সম্পাদক আওয়ামীলীগ, সেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মোঃ মাহবুবুর রহমান মোঃ রফিকুল ইসলাম বুলু মেম্বার মোঃ আহাদুল করিম মোঃ ফজলুর রহমান মোৃঃ ফরিদ হোসেন, তাজামুল, রিপনসহ অনন্য নেতৃবৃন্দ ।

     

    উল্লেখ্য মনিরামপুর উপজেলায় আলহাজ্ব এস এম ইয়াকুব আলী দীর্ঘদিন যাবত মনিরামপুরের জনগণের সুখদুঃখে পাশে থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ,ইদ ও পূজার সময় গরীব মানুষদের বস্ত্রসহ উন্নতমানেরখাদ্যসামগ্রী বিতরণ,প্রতিবন্ধীদের মাঝে হুইলচেয়ার, গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসহায়ক উপকরণ ও অর্থ বিতরণ এবং অসুস্থদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করছেন।এছাড়া মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ব্যক্তি উদ্যোগে সহযোগিতা করে আসছেন।
    আর এসব কারণে তিনি যখনই কোন এলাকায় গণসংযোগ বা কোন অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন তখন সাধারণ জনগণের জোয়ার পরিলক্ষিত হচ্ছে।

  • দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এসএম ইয়াকুব আলীর গণসংযোগ

    দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এসএম ইয়াকুব আলীর গণসংযোগ

     

    আগামী দ্বাদশ জাতীয় সাংসদ নির্বাচনকে উপলক্ষ্য করে সারাদেশের ন্যায় যশোর-০৫ মনিরামপুর আসনের নৌকা মার্কার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে সাধারণ মানুষের সাথে গণসংযোগ করছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্ম বিষয়ক উপ-কমিটির নির্বাহী সদস্য,বিশিষ্ট সমাজসেবক ও সিটি প্লাজার চেয়ারম্যান জনাব আলহাজ্ব এস এম ইয়াকুব আলী।

    আজ বৃহস্পতিবার ( ৮ জুন ) মনিরামপুর উপজেলার ১৬ নং নেহালপুর ইউনিয়নের নেহালপুর বাজার ও কালীবাড়ি বাজারে স্থানীয় জনগণের সাথে গনসংযোগ করেন।
    গণসংযোগের সময় সফরসঙ্গী হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক পৌর কাউন্সিলর গৌর কুমার ঘোষ,সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সন্দ্বীপ ঘোষ, ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ,১৬নং নেহালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সাধারন সম্পাদক জিএম ফারুক হোসেন সহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, তাঁতীলীগ,ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

    উল্লেখ্য মনিরামপুর উপজেলায় আলহাজ্ব এস এম ইয়াকুব আলী দীর্ঘদিন যাবত মনিরামপুরের জনগণের সুখদুঃখে পাশে থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ,ইদ ও পূজার সময় গরীব মানুষদের বস্ত্রসহ উন্নতমানেরখাদ্যসামগ্রী বিতরণ,প্রতিবন্ধীদের মাঝে হুইলচেয়ার, গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসহায়ক উপকরণ ও অর্থ বিতরণ এবং অসুস্থদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করছেন।এছাড়া মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ব্যক্তি উদ্যোগে সহযোগিতা করে আসছেন।
    আর এসব কারণে তিনি যখনই কোন এলাকায় গণসংযোগ করতে যাচ্ছেন তখন সাধারণ জনগণের জোয়ার পরিলক্ষিত হচ্ছে।

  • বিদ্যুত অফিসের সমানে জেলা বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি ও স্মারক লিপি প্রদান

    বিদ্যুত অফিসের সমানে জেলা বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি ও স্মারক লিপি প্রদান

     

    অসহনীয় লোডশেডিং, একাধিক বার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ খাতে নজিরবিহীন দূর্নীতির প্রতিবাদে যশোর বিদ্যুৎ অফিসের সামনে বিএনপি যশোর জেলা কমিটি অবস্থান কর্মসূচি শেষে স্মারকলিপি প্রদান করে।

    আজ বৃহস্পতিবার (৮ জুন) যশোর শহরতলীর চাঁচড়া বিদ্যুৎ ভবনের সামনে এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।

    জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক নার্গিস বেগমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে বক্তৃতা করেন বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
    অবস্থান কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য রাখেন, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ
    সাবেরুল হক সাবু, যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন খোকন, সদস্য মিজানুর রহমান খান, নগর বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম চৌধূরী মুল্লুক চাঁদ, মণিরামপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাড.শহীদ ইকবাল হোসেন, চৌগাছা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম, শার্শা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক খায়রুজ্জামান মধূ, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আনসারুল হক রানা, জেলা মহিলা দলের সভানেত্রী রাশিদা রহমান, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রবিউল ইসলাম, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি রাজিদুর রহমান সাগর, চাঁচড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম প্রমুখ।

    প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সরকার উন্নয়নের নামে অপচয় করেছে, দুর্নীতি করেছে তার খেসারত দিচ্ছে জনগণ। ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছে। আর দিশেহারা এ সরকার ও তার মন্ত্রীরা আবোল তাবোল বকছেন। কি উন্নয়ন হয়েছে তা জনগণ এখন দেখছে। বিদ্যুত দিতে না পারায় স্কুল বন্ধ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

    অসহনীয় লোডশেডিং, বিদ্যুৎতের বারংবার মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচি ও স্মারকলিপি প্রদান করেছে যশোর জেলা বিএনপি। আজ বৃহস্পতিবার যশোর শহরতলী চাঁচড়া ওজোপাডিকো (বিদ্যুৎ ভবন) সামনে এই কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচিতে যশোরের আট উপজেলার বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ অংশ নেয়। অবস্থান কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্ততায় বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সরকার উৎসবের নামে অপচয় করেছে, দুর্নীতি করেছে তার খেসারত দিচ্ছে জনগণ। ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছে। আর দিশেহারা এ সরকার ও তার মন্ত্রীরা আবোল তাবোল বকছেন। কি উন্নয়ন হয়েছে তা জনগণ এখন দেখছে। বিদ্যুত দিতে না পারায় স্কুল বন্ধ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

    পরে অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নেতৃত্বে বিএনপির নেতৃবৃন্দ বিদ্যুৎ সমস্যা নিরসনে ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন।

  • হিন্দু আইন পরিবর্তন কতটা যৌক্তিক?

    অনুপম পাল
    চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

    ব্যারিস্টার পল্লব আচার্য
    এডভোকেট সুপ্রিম কোর্ট অফ বাংলাদেশ

    হিন্দু আইনের মূল বিষয়টি আসে আমাদের পবিত্র হিন্দু ধর্ম গ্রন্থগুলো থেকে ও বিভিন্ন মুনি ঋষি থেকে। সেই প্রাচীনকাল থেকে হিন্দু তথা সনাতনীদের সম্পত্তি বন্টন, জীবনযাত্রার নিয়ম এবং বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ভাবে বলা হয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে চলতে থাকা এই রীতি অনুযায়ী কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে পারিবারিক কোন্দল ও সামাজিক বিরোধ কম দেখা দেয়।
    বর্তমান সময়ে আধুনিক যুগে দেখা যায় বিবাহ বিচ্ছেদের মত ঘটনা অহরহ ঘটে যাচ্ছে। সনাতনীরা বিশ্বাস করে জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে ভগবানের হাতে তাই এখানে বিচ্ছেদের বিষয়টা দেখার কোন সুযোগ নেই। অপরদিকে একজন সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবী হিসেবে অনেক সনাতনী নারীরা এসে তার স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ দেন এবং বিচ্ছেদের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ এবং বাংলাদেশের কোন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুন্ন হলে তা আদালতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।
    যদি কোন স্বামী বা স্ত্রী নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন তাহলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিচার হবে। আর বিচ্ছেদের বিষয়ে বলতে গেলে একজন আইনজীবী হিসেবে আমি মনে করি সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া তা কার্যকর করা সঠিক হবে না। হিন্দু ধর্মে বলা হয়েছে স্বামী যদি নিরুদ্দেশ হয়, মারা যায়, প্রব্রজ্যা অবলম্বন করে (অর্থাৎ সন্ন্যাসী হয়ে যায়), ক্লীব (পুরুষত্বহীন) হয় অথবা পতিত (ধর্ম বা সমাজ থেকে বিচ্যুত) হয় – এই পাঁচ প্রকার বিপদের ক্ষেত্রে নারীকে অন্য পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া বিধেয়। কিন্তু পরিবর্তনশীল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আইনকেও পরিবর্তন হতে হয় তাই হিন্দুদের মূল ধারা ঠিক রেখে আইন কে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যেমন Literal Rule এ যদি Justice দেওয়া না যায় তাহলে Golden Rule বা Mischief Rule ব্যবহার করা যেতে পারে।
    বাংলাদেশে হিন্দুদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের হার অনেকাংশই কম তার অন্যতম কারণ হচ্ছে ধর্মীয় রীতি নীতির উপর বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধাবোধ। হিন্দু প্রতিটি সংসার এর মূল হচ্ছে ধর্মীয় অনুশাসন ও পরম্পরা।
    সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় নারীদেরকে যখন বিবাহ দেওয়া হয় তখন তার বংশ, গোত্র, কুল, বর্ণ সব পরিবর্তন হয়ে যায় তাই হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রে কনের পিতা-মাতা বিবাহের সময় কনেকে উপযুক্ত সম্মান ও সামর্থ্য দিয়ে বিবাহ দিয়ে থাকেন। হিন্দু উত্তরাধিকার আইনটি আসলে সরাসরি কোনো আইন থেকে নয় বরং ধর্ম অর্থাৎ হিন্দু ধর্ম থেকে নেওয়া করা হয়েছে। হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের সবচেয়ে সহজ বিষয়টি হচ্ছে ৫৩ জনের একটি লিস্ট দেওয়া আছে এবং সেটি একটি ক্রম অনুসারে।
    আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বিবাহ কালীন সময়ে যদি সচেতন পিতা-মাতা তার কন্যাকে তার প্রাপ্য তাকে বুঝিয়ে দেয় তাহলে পিতা মাতার অবর্তমানে ভাই বোনের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকবে এবং আদালতে মামলা মোকদ্দমায় জড়াতে হবে না। এতে করে যেমন আদালতের মূল্যবান সময় বাঁচবে এবং অটুট থাকবে ভাই বোনের সম্পর্ক। প্রচলিত হিন্দু আইনে এটি স্পষ্ট বলা আছে যে সম্পত্তিতে নারীর পূর্ণ অধিকার থাকবে তা স্ত্রীধনের উপর এবং পিতা-মাতা কর্তৃক প্রদত্ত সম্পত্তি কন্যা নিজে ইচ্ছে মত স্থানান্তর ও ভোগ করতে পারবে।
    অন্যদিকে The Hindu Women’s Right to Property Act, 1973 হিন্দু বিধবা নারীদের অংশ সুনির্দিষ্ট করা হয় যা এক পুত্রের সমান অংশ। তবে বলা হয়ে থাকে এটা জীবনস্বত্ব কিন্তু আদালতের শরণাপন্ন হয়ে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে বিক্রয় করতে পারে। এ বিষয়টাকে সহজলভ্য করে একটা নীতিমালা করে দিলে তাহলে বিধবা নারীদের স্বামীর সম্পত্তি হস্তান্তর এর অধিকার প্রয়োগ করতে সহজ হবে।
    আর কোন অবস্থাতে যদি হিন্দু নারী বা পুরুষ ধর্মান্তরিত হয় তাহলে হিন্দু ধর্মের প্রচলিত নীতি অনুযায়ী সে সকল সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। The Freedom of Religion Act আইনটি The Bangladesh Laws ( revision and declaration) Act 1973 ধারা বাতিল হয়েছে। তাই ধর্মান্তরের ক্ষেত্রে সম্পত্তি দাবি করার কোন অধিকার থাকেনা।
    বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আমি মনে করি এখন সময় এসেছে হিন্দু আইনের মূল ধারা ঠিক রেখে আইনের অস্পষ্ট এবং অকার্যকর বিষয়গুলো স্পষ্ট আকারে প্রণয়ন করা যাতে আইনটি শক্তিশালী এবং যুগোপযোগী হয়ে উঠে। এতে করে একদিকে যেমন সুবিধা বঞ্চিত, নির্যাতিত নারীরা তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে অন্যদিকে হিন্দু সমাজে পূর্বের ন্যায় প্রশান্তি বজায় থাকবে।