নিজস্ব প্রতিবেদক: স্নাতক পাস করে চাকরির জন্য যখন সমবয়সীরা হন্যে হয়ে ছুটছেন, তখন প্রচলিত ছক ভেঙে পৈতৃক জমিতে আধুনিক কৃষির বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন নেত্রকোনার তরুণ মো. মহিদুল হাসান মুন্না। প্রথাগত কৃষিকে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আধুনিক ও লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর করে তিনি সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সমন্বিত খামার ও কৃষিভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘অ্যাগ্রোসোমা’ (agrosoma.com)-এর মাধ্যমে তিনি যেমন নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন, তেমনি এলাকার অন্যান্য কৃষকদেরও পথ দেখাচ্ছেন।
নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে ইতিহাস বিভাগে অনার্স সম্পন্ন করা মুন্নার ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল চাকরিজীবী নয়, হবেন একজন সফল ব্যবসায়ী। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি কৃষি খাত নিয়ে বিস্তর গবেষণা শুরু করেন। এরপর গত পাঁচ বছর আগে পৈতৃক ২০ একর জমি কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলেন নিজের স্বপ্নের সমন্বিত কৃষি খামার। তার খামারে বর্তমানে শাকসবজি, ফলের বাগান, ডেইরি ফার্মসহ সবকিছুরই সফল সমন্বয় ঘটেছে। কৃষিতে এমন অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) থেকে ‘তরুণ উদ্যোক্তা’ সম্মাননাও অর্জন করেছেন।
সরেজমিনে খামারটিতে গেলে চোখে পড়ে আধুনিক কৃষির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মালচিং পেপার ব্যবহার করে উন্নত জাতের সবজি চাষ করা হচ্ছে, যা ফসলের খেতে আগাছা রোধ করার পাশাপাশি মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে। বাঁশ ও জালের সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে চমৎকার মাচা, যেখানে ঝুলছে সারি সারি শসা। এছাড়া পাতাযুক্ত সবজির খেতের সুরক্ষায় পলি-টানেল বা শেড ব্যবহার করা হচ্ছে।
মুন্না জানান, তার ফল বাগানের ৫০ শতাংশ জায়গাজুড়ে রয়েছে ব্যানানা ম্যাংগো এবং ৩০ শতাংশ জায়গায় রয়েছে বল সুন্দরী জাতের আপেল কুল। এছাড়া মুন্নার সমন্বিত খামারের সীমানার চারদিকে বেষ্টিত রয়েছে দুই হাজারের বেশি দেশি জাতের কলাগাছ। প্রায় ৩০ কাঠা জায়গায় তিনি সবজির প্রজেক্ট করেছেন। এর আগে এখানে ক্যাপসিকাম ও দেশি লাউ চাষ করে সব খরচ বাদে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার টাকা লাভ করেছিলেন তিনি। বর্তমানে তার খেতে শসা, করলা, শিম ও টমেটোর আবাদ চলছে। পাইকারি বাজারে শসা প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি করে তিনি বেশ লাভবান হচ্ছেন।
শুধু ফসল নয়, মুন্নার খামারে গড়ে তোলা হয়েছে পরিপাটি ডেইরি ফার্ম, যেখানে বর্তমানে সাতটি দেশি ও ফ্রিজিয়ান জাতের গরু রয়েছে। খামারের একটি গরু থেকে প্রতিদিন ১০-১২ লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি খামারে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও মৎস্য চাষের প্রকল্পও চলমান রয়েছে। মৌসুম অনুযায়ী অবশিষ্ট জমিতে ধান ও সরিষা চাষ করা হয়।
মুন্নার উদ্যোগের সবচেয়ে অভিনব দিকটি হলো তার তৈরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘অ্যাগ্রোসোমা ডট কম’। আধুনিক কৃষির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ সাধারণ কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তিনি এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মটি চালু করেন। এখান থেকে কৃষকরা খুব সহজেই সিডলিং ট্রে, কোকোপিট, শেড নেট, স্প্রে মেশিন, অর্গানিক বালাইনাশক, নিম তেল, ফেরোমেন ট্র্যাপ, ইয়েলো স্টিকি ট্র্যাপসহ কৃষির আধুনিক সব সরঞ্জাম পাইকারি ও খুচরা মূল্যে কিনতে পারছেন। শুধু পণ্য বিক্রি নয়, কৃষকরা কীভাবে অ্যানালগ পদ্ধতি থেকে ডিজিটাল পদ্ধতির চাষাবাদে এসে লাভবান হতে পারেন, মুন্না সেই পরামর্শও দিয়ে থাকেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে তার গড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।
মুন্নার সাফল্য নজর কেড়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগেরও। নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, নেত্রকোনা সদরের সিংহের বাংলা ইউনিয়নের ধীতপুর গ্রামের শিক্ষিত যুবক মুন্নাকে নিয়ে তারা নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, “মুন্না মাঠে যেমন ফল ও সবজির বহুমুখী উৎপাদন করছেন, ঠিক তেমনি মানসম্পন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের মাধ্যমে অন্যান্য কৃষকদেরও সহায়তা করছেন।”
মুন্নার এমন উদ্যোগ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে উপপরিচালক আরও বলেন, “তাকে যদি আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনা দেওয়া যায়, তবে সে কৃষিতে আরও বড় বিপ্লব ঘটাতে পারবে।”
ভবিষ্যতে নিজের প্রকল্পগুলোকে আরও বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন মুন্না। বিশেষ করে ডেইরি ফার্মটি সম্প্রসারণ করে সেখানে মোটা-তাজাকরণ প্রকল্প ও দুধ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। তবে এর জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তরুণ এই উদ্যোক্তা। মাত্র তিন থেকে চার শতাংশ সুদে সহজ শর্তে সরকারি বা ব্যাংক ঋণ পেলে তিনি তার খামারকে আরও বড় করতে পারবেন, যা স্থানীয় অনেক বেকারের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে তিনি আশাবাদী।
চাকরির মরীচিকার পেছনে না ছুটে মেধা, প্রযুক্তি ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে মুন্না প্রমাণ করেছেন কৃষি কেবল একটি পেশা নয়, এটি স্মার্ট ও লাভজনক শিল্প। তার ‘অ্যাগ্রোসোমা’ মডেল আজ দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে আত্মনির্ভরশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


