নিজস্ব প্রতিবেদক: সীমান্তের ঘুটঘুটে অন্ধকার আর দুর্গম পথ- এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তৎপর হয়ে উঠেছিল চোরাকারবারিরা। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর কড়া নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতার কাছে ভেস্তে গেছে তাদের সব পরিকল্পনা। গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে শুরু করে আজ (শুক্রবার) ভোর পর্যন্ত নেত্রকোনা সীমান্তের বর্ডার অবজারবেশন পোস্টের (বিওপি) বিভিন্ন পয়েন্টে টানা অভিযান চালিয়েছে বিজিবি’র ৩১ ব্যাটালিয়ন। এসব অভিযানে মদ, কয়লা, শীতের কম্বল থেকে শুরু করে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ চোরাই পণ্য।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের (৩১ বিজিবি) অধিনায়ক ও পরিচালক লে. কর্নেল তৌহিদুল বারী (পিএসসি) প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সফল অভিযানের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেন।
প্রেস বিজ্ঞপ্তির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কেবল একটি-দুটি পয়েন্টে নয়, বিজিবির টহল দলগুলো একই রাতে বরুয়াকোনা, বিজয়পুর, ভবানীপুর, মাধুপুর, চারুয়াপাড়া, ভরতপুর এবং কচুগড়া বিওপি (বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট) এলাকায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একযোগে ‘অপারেশন’ পরিচালনা করে। প্রতিটি অভিযানেই পণ্যগুলো মালিকবিহীন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
সামনে শীতকাল, আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় কম্বল পাচারে মেতে উঠেছিল পাচারকারীরা। বিজিবি’র টানা অভিযানে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি খেয়েছে চোরাচালানী চক্রটি। বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটা থেকে শুক্রবার ভোর ৪টার মধ্যে বিজয়পুর, মাধুপাড়া, চারুয়াপাড়া, কচুগড়া ও ভরতপুর বিওপির জওয়ানরা আলাদা আলাদা পাঁচটি পয়েন্ট (কমলাবাড়ী, খোজিগড়া, কয়লারপোর্ট, সিকদারপাড়া, বনবেড়া ও কালিকাপুর) থেকে ১৬৭ পিস ভারতীয় কম্বল জব্দ করে। এর মধ্যে কেবল মাধুপাড়ার খোজিগড়া থেকেই উদ্ধার হয় তিন লাখ টাকা মূল্যের ৬০ পিস কম্বল। সব মিলিয়ে জব্দকৃত কম্বলের বাজারমূল্য আট লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
পাহাড়ি নদী সোমেশ্বরীকে ব্যবহার করে চলছিল কয়লা ও কাঠ-বাঁশ পাচার। শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে বিজয়পুর ও ভবানীপুর বিওপি’র টহল দল নদীর দুটি পৃথক স্থানে অভিযান চালায়। সেখান থেকে আট হাজার ও সাত হাজার ৩৬০ কেজি (১৫ হাজার ৩৬০ কেজি) ভারতীয় কয়লা জব্দ করা হয়। পাচারের কাজে ব্যবহৃত তিনটি নৌকা এবং ৫৪০ পিস বাঁশও আটক করে বিজিবি। জব্দকৃত এসব কয়লা, নৌকা ও বাঁশের আনুমানিক সিজার মূল্য তিন লাখ ৭৮ হাজার টাকা।
সীমান্ত দিয়ে মাদকের অনুপ্রবেশ ঠেকাতেও বিজিবি ছিল আপসহীন। ভোর ৫টায় বরুয়াকোনা বিওপির টহল দল ছোট পাতলাবন এলাকা থেকে ৭২ হাজার টাকা মূল্যের ৪৮ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার করে। এছাড়া আগের দিন সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ভরতপুর বিওপি ভারত থেকে অবৈধভাবে নিয়ে আসা এক লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের দুটি গরু আটক করে।
চোরাচালান যে কেবল একমুখী ছিল তা নয়। বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য পাচারের অপচেষ্টাও রুখে দিয়েছে বিজিবি। শুক্রবার রাত সোয়া ৩টার দিকে বিজয়পুর বিওপি’র জওয়ানরা জংখল নামক স্থানে অভিযান চালিয়ে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে জড়ো করা দুইশো কেজি দেশীয় রসুন জব্দ করে, যার মূল্য প্রায় ২৮ হাজার টাকা।
৩১ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল তৌহিদুল বারী জানান, উদ্ধার হওয়া এসব বিপুল পরিমাণ চোরাই পণ্যের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এর মধ্যে মাদকদ্রব্য (মদ) নেত্রকোনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে জমা দেওয়া হচ্ছে। আটককৃত গরু কাস্টমস প্রতিনিধির উপস্থিতিতে প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে এবং জব্দকৃত বাঁশ হস্তান্তর করা হবে বিজয়পুর বনবিট অফিসে। এছাড়া কয়লা, নৌকা, কম্বল ও রসুনসহ অন্যান্য সমস্ত চোরাই সামগ্রী নেত্রকোনা কাস্টমস অফিসে জমা দেওয়ার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সীমান্ত সুরক্ষা ও চোরাচালান দমনে বিজিবি’র ধারাবাহিক ও সাঁড়াশি অভিযান স্থানীয় সচেতন মহলে ব্যাপক স্বস্তি এনে দিয়েছে। তারা মনে করছেন, বিজিবি’র এমন কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকলে সীমান্ত কেন্দ্রিক অপরাধ প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে।


