নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌর শহরের খাদ্যগুদাম এলাকার ব্যস্ততা তখনো কমেনি। প্রতিদিনের মতোই নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘পিংকি সাইকেল স্টোর’-এ বসে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ ব্যবসায়ী সবুজ মিয়া। হঠাৎ করেই সেখানে নেমে আসে একদল দুর্বৃত্তের তাণ্ডব। মুহূর্তের মধ্যেই চাঁদার দাবিতে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তাক্ত হন বয়োজ্যেষ্ঠ এই ব্যবসায়ী। লুট হয় ক্যাশবাক্সের বিপুল অর্থ। ভরদুপুরে এমন দুর্ধর্ষ ঘটনায় মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো ব্যবসায়ী পাড়ায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চিহ্নিত সন্ত্রাসী আব্দুল্লাহ আল সোহান (২৮) তার দলবল নিয়ে সবুজ মিয়ার দোকানে হানা দেয়। এসেই তারা ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। প্রবীণ ব্যবসায়ী সবুজ মিয়া অন্যায্য দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানালে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সোহান। চোখের পলকে দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে সবুজ মিয়ার ওপর হামলা চালায় সে। ধারালো অস্ত্রের কোপ সরাসরি আঘাত হানে তার নাকে। রক্তক্ষরণ আর যন্ত্রণায় একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তবে এখানেই থেমে থাকেনি হামলাকারীরা; পুরো দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে ক্যাশবাক্সে থাকা নগদ এক লাখ ২০ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায় তারা। পরে আশপাশের ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসতে শুরু করলে দুর্বৃত্তরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
অতর্কিত হামলার পেছনের গল্পটি মূলত দীর্ঘদিনের বিরোধ ও মাদকের আগ্রাসনের। স্থানীয়রা জানান, শহরের খাদ্যগুদাম সংলগ্ন সেতু পুনর্নির্মাণের সময় সরকারি জায়গা থেকে বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উচ্ছেদকৃত সরকারি জায়গাতেই একটি ঘর তুলে দখল নেয় সোহান। সেই ঘরটিই মাসে আট হাজার টাকা চুক্তিতে ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করে আসছিলেন সবুজ মিয়া।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সোহান চরমভাবে মাদকাসক্ত। মাদকের টাকার জন্য প্রায়শই সে ভাড়ার বাইরেও বাড়তি টাকা চেয়ে সবুজ মিয়াকে চাপ দিত। ঘটনার দিনও সেই ভাড়ার টাকা ও চাঁদা নিয়ে বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়, যার চরম পরিণতি ছিল এই হামলা।
গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল্লাহ আল সোহান উপজেলার বড়কাশীয়া গ্রামের মৃত নূর আহম্মদের ছেলে। সে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদ ইকবালের আপন চাচাতো ভাই। তবে এলাকায় তার সবচেয়ে বড় পরিচয়, সে একজন চিহ্নিত ও দুর্ধর্ষ অপরাধী। মোহনগঞ্জ থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে, সোহানের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, ছিনতাই, মাদক ও মারামারির মতো গুরুতর অপরাধে আগে থেকেই অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে।
রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায় সবুজ মিয়াকে উদ্ধার করে দ্রুত মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতেই ভুক্তভোগীর ছোট ভাই মোহাম্মদ কমল মিয়া বাদী হয়ে মোহনগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পরপরই দ্রুত তৎপর হয় প্রশাসন। রাতেই অভিযান চালিয়ে মূল অভিযুক্ত সোহানকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। পুরো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুল ইসলাম হারুন জানান, “হামলা ও লুটের ঘটনায় মামলা রুজু হওয়ার পরপরই আমরা আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি । আজ (শুক্রবার) দুপুরে তাকে জেলা আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই ১৫টি মামলা চলমান রয়েছে।”


