নিজস্ব প্রতিবেদক: স্বপ্নের পথে হাঁটা কখনোই সহজ নয়। এই পথ পাড়ি দিতে প্রয়োজন হয় অসীম ধৈর্য, নির্ঘুম রাত আর ক্লান্তিহীন অধ্যবসায়ের। ঠিক এমনই দীর্ঘ আর কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছেন নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার সন্তান অদম্য মেধাবী অমিত খান অমি। এক সময়ের কর্পোরেট চাকরিজীবী অমিত এখন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) প্রশাসন ক্যাডারের একজন গর্বিত কর্মকর্তা।
রবিবার (১ নভেম্বর) খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের নতুন কর্মজীবন শুরু করেছেন তিনি। ৪৫তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে এই ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেন দুর্গাপুরের এই তরুণ।
সাফল্যের গল্পটা অবশ্য একদিনে রচিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পাট চুকিয়েই তিনি যোগ দেন স্বনামধন্য ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি রেনাটা লিমিটেডে। তবে বুকে লালন করা স্বপ্নটা ছিল আরও বড় কিছু করার। তাই সারাদিন অফিসের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যখন সবাই বিশ্রামে যেতেন, অমিতের তখন শুরু হতো বিসিএস জয়ের নতুন যুদ্ধ। প্রতিদিনের লড়াই ছিল নিজের সাথেই নিজের।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কঠিন এই যাত্রায় অমিত কোনো কোচিং সেন্টারের দ্বারস্থ হননি। জীবনের এই সংগ্রাম নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অমিত জানান তার সেই দিনগুলোর কথা। তার ভাষায়, “সবাই যেখানে প্রচুর লিখিত পরীক্ষা দিচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় মক ভাইভা দিচ্ছে, আমি তখন অফিস করে দৌড়াচ্ছি। বাসায় এসে একটু ঘুমিয়ে পড়তে বসছি। পরীক্ষার আগে আগে অফিসের ডর্মে থেকে যেতাম যেন ভালো পড়া হয়। এর সাথে বাসার হাজারো দায়িত্ব তো ছিলোই।” তখনকার মানসিক অবস্থা নিয়ে রীতিমতো একটি সিনেমা বানানো যাবে বলে মনে করেন তিনি।
অমিত জানান, প্রিলিমিনারির জন্য তিনি কোথাও পরীক্ষা দেননি, লিখিত দেওয়ারও সুযোগ বা সময় কোনোটিই ছিল না। এমনকি ৪৫তম বিসিএসের আগে কোনো মক ভাইভাও দেওয়া হয়নি তার। তবুও তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন।
এর আগে ৪৪তম বিসিএসেও তিনি প্রথমবার উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সেবার ‘ইন্সট্রাক্টর’ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও তিনি তাতে যোগ দেননি। কারণ, ৪৫তম বিসিএসই ছিল তার স্বপ্ন জয়ের মূল গন্তব্য। ৪৪-এর লিখিত পরীক্ষা মনমতো না হলেও, ৪৫-এ লিখিত পরীক্ষা দিয়েই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এবার ভালো কিছু হতে যাচ্ছে।
দুর্গাপুরের ঝাঞ্জাইল এলাকায় বেড়ে ওঠা অমিতের শিক্ষাজীবনও অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং ঢাকার স্বনামধন্য নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর তিনি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পারিবারিকভাবেও তিনি সুপরিচিত পরিবারের সন্তান। তার বাবা অধ্যক্ষ শহীদুল্লাহ খান (শহীদ খান) এবং দাদা ছিলেন সাবেক চেয়ারম্যান হাজী আব্দুস সাত্তার খান।
নতুন কর্মজীবনে প্রবেশের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অমিত। পরম করুণাময়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “আল্লাহর রহমতে আজ প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ শুরু করলাম। আলহামদুলিল্লাহ। এই অনুভূতি আসলে ভাষায় বর্ণনা করার মতো না। আমি সাধারণত পরীক্ষা নিয়ে নার্ভাস হই না। সব আল্লাহর রহমত আসলে। আমার মতো অধমকে তিনি এই পর্যন্ত এনেছেন।” আগামী দিনগুলোতে দেশ ও দশের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
পাহাড় আর নদীঘেরা ইতিহাস-ঐতিহ্য সমৃদ্ধ সুসঙ্গ দুর্গাপুরের এক সন্তানের এমন আকাশছোঁয়া সাফল্যে পুরো উপজেলায় এখন বইছে আনন্দের বন্যা। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা বার্তায় সিক্ত করছেন এবং তার ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্য কামনা করছেন। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা- অমিত খান তার মেধা, প্রজ্ঞা ও সততার মূর্ত প্রতীক হয়ে মানুষের কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন এবং দুর্গাপুরের নাম সারা দেশে আরও উজ্জ্বল করবেন।


