নিজস্ব প্রতিবেদক: সাধারণত রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মামলা, পুলিশি অভিযান আর গ্রেফতারের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে দেখা গেল এক ভিন্ন ও ইতিবাচক চিত্র। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ থেকে খুলে নেওয়া দুই হাজার ৬৪৪টি সিসি ব্লক উদ্ধারে প্রশাসন কোনো বলপ্রয়োগ বা ধরপাকড়ের পথে হাঁটেনি। বরং মানুষের দুয়ারে গিয়ে বুঝিয়েছে এর ভয়াবহ পরিণতি। আর তাতেই মিলেছে জাদুকরী ফল। নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে গ্রামবাসীরা স্বেচ্ছায় নৌকায় করে সব কটি ব্লক আবার বাঁধে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
গত ১৮ আগস্ট রাতের আঁধারে মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওরের চরহাইজদা ফসলরক্ষা বাঁধের চিকাডুবি অংশের প্রায় ২৫০ মিটার এলাকা থেকে এসব ব্লক তুলে নেওয়া হয়। স্থানীয়রা বাধা দিতে গেলে তাদের ভয়ভীতিও দেখানো হয়েছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে ২৩ আগস্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. এনায়েত হোসেন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
তদন্তে নেমে মোহনগঞ্জ থানা-পুলিশ দেখতে পায়, চুরি যাওয়া এসব ব্লক বিক্রি করা হয়নি, বরং গ্রামীণ দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী বানিয়াহারী গ্রামের কিছু মানুষ কেউ গোয়ালঘরের মেঝে শক্ত করতে, কেউ মাচার নিচে, আবার কেউ হাওরের ঢেউ থেকে বসতভিটা রক্ষায় বা পুকুরঘাটের সিঁড়ি হিসেবে এগুলো ব্যবহার করছেন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন অভিনব এক উদ্যোগ নেয়। তারা সাঁড়াশি অভিযানের বদলে বেছে নেন ‘উদ্বুদ্ধকরণ’ বা মোটিভেশনের পথ। পুলিশ সদস্যরা সরাসরি চলে যান ওই সব মানুষের উঠোনে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে তারা বোঝাতে শুরু করেন, ব্যক্তিগত সামান্য সুবিধার জন্য ব্লকগুলো সরিয়ে নিলে বাঁধটি দুর্বল হয়ে পড়বে। আর পাহাড়ি ঢল বা অকাল বন্যা এলে এই বাঁধ ভাঙার কারণে তলিয়ে যাবে পুরো ডিঙ্গাপোতা হাওরের হাজারো কৃষকের স্বপ্নের ফসল।
এই সহজ সত্যটি গভীরভাবে নাড়া দেয় গ্রামবাসীকে। সরকারি এই ব্লকগুলোর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরে তারা অনুতপ্ত হন। এরপরই শুরু হয় ব্লক ফিরিয়ে দেওয়ার পালা। নিজেদের উদ্যোগে ট্রলার ও দেশীয় নৌকায় করে একে একে দুই হাজার ৬৪৪টি ব্লকই তারা বাঁধে এনে পাউবোর কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেন।
উদ্ধারকৃত ব্লকগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু করেছে পাউবো। নেত্রকোনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, ‘লুট হওয়া প্রায় শতভাগ ব্লকই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আপাতত এগুলো বাঁধের নির্ধারিত অংশে সাজিয়ে বসানো হচ্ছে। হাওরের পানি পুরোপুরি নেমে গেলে সিমেন্ট ও ঢালাই দিয়ে স্থায়ীভাবে এগুলো পুনর্স্থাপন করা হবে।’
এ ঘটনায় হাওরবাসীর মাঝে ফিরে এসেছে স্বস্তি। স্থানীয় কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, বাঁধের ব্লকগুলো খুলে নেওয়ার পর তারা আসন্ন বোরো মৌসুম নিয়ে গভীর শঙ্কায় পড়েছিলেন। সবার সম্মিলিত হস্তক্ষেপে ব্লকগুলো ফিরে আসায় এখন কৃষকদের মনে শান্তি ফিরেছে। তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে স্থায়ী নজরদারির দাবি জানান তিনি। গাগলাজুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আশরাফ চৌধুরীও মনে করেন, পুলিশের এমন কার্যকর মধ্যস্থতায় বড় ধরনের সামাজিক সংকট ও সরকারি সম্পদের অপচয় রোধ করা সম্ভব হয়েছে।
পাউবো সূত্র জানায়, ডিঙ্গাপোতা হাওরের প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমি ও পার্শ্ববর্তী খালিয়াজুরির বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল রক্ষায় ৬১ কিলোমিটার দীর্ঘ চরহাইজদা উপপ্রকল্প বাঁধটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ চার দশমিক সাত কিলোমিটার অংশে ৩৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থায়ী সিসি ব্লক স্থাপন করা হয়েছিল, যার ওপর নির্ভর করছে লাখো কৃষকের ভাগ্য।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম পুরো বিষয়টিকে নাগরিক সচেতনতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘বলপ্রয়োগ না করে আমরা মানুষকে সচেতন করার নীতি গ্রহণ করেছিলাম। সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরে স্বপ্রণোদিত হয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ফিরিয়ে দিয়েছেন। হাওরের নিরাপত্তা কোনো একক সংস্থার নয়, এটি স্থানীয় সবার যৌথ দায়িত্ব।’
শাস্তির বদলে সচেতনতার এই জয় নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে কেবল ফসলই রক্ষা করেনি, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রতি সাধারণ মানুষের দায়িত্ববোধের নতুন এক ইতিহাসও তৈরি করেছে।


