কেন্দুয়া প্রতিনিধি: বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই। নামিদামি ও নির্ভরযোগ্য কোম্পানির ঝকঝকে বস্তা, লোগো এবং সিল সবই ঠিকঠাক। ভেতরের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন; সেখানে আসল খাদ্যের বদলে ভরা হয়েছে নিম্নমানের ভেজাল ফিড। এভাবেই অভিনব কায়দায় সাধারণ খামারিদের সঙ্গে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিল একটি অসাধু চক্র। তবে প্রশাসনের আকস্মিক অভিযানে সেই চক্রের অপতৎপরতা কিছুটা হলেও হোঁচট খেয়েছে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড’-এর নাম ও লোগো ব্যবহার করা ২০ বস্তা ভেজাল পশুখাদ্য জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। শনিবার (৭ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে কেন্দুয়া পৌরসভার চিরাং মোড় সংলগ্ন এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় ভেজাল ফিড পরিবহনের দায়ে একজনকে আটক করে ‘মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০’-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাঈম-উল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালিত এই ঝটিকা অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সার্বিক সহযোগিতা করেন কেন্দুয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) খোরশেদ ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) তোফাজ্জল হোসেন। এছাড়া কারিগরি সহায়তা ও গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা ভেটেরিনারি কর্মকর্তা মতিউর রহমান।
পরবর্তীতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাঈম-উল ইসলাম চৌধুরী তার নিজস্ব ফেসবুক পেজে দেওয়া স্ট্যাটাসের মাধ্যমে অভিযানের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আটক ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জব্দকৃত ভেজাল পশুখাদ্যগুলো পরবর্তী আইনানুগ ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার জিম্মায় হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, জব্দ করা বস্তাগুলোর গায়ে ‘নারিশ প্রাইম ডেইরি ফিড’ এবং ‘গরু মোটাতাজাকরণ ফিড’-এর নাম ও লোগো হুবহু নকল করে ব্যবহার করা হয়েছিল।
বিষয়টি নিয়ে নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেডের জোনাল সেলস ম্যানেজার (জেডএসএম) ড. মোহাম্মদ জুয়েল কাদির গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ১৯৯৯ সাল থেকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে পোল্ট্রি, মৎস্য ও গবাদিপশুর মানসম্মত খাদ্য উৎপাদন করে আসছে নারিশ। বাজারে তাদের সুনামের সুযোগ নিচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। তারা আসল নারিশের পুরোনো বা নকল বস্তা সংগ্রহ করে তাতে নিম্নমানের ভেজাল ফিড ভরে বাজারে ছাড়ছে।
প্রতারণার মাত্রা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, কোম্পানির নির্ধারিত প্রকৃত ফিডের প্রতি বস্তার বাজারমূল্য যেখানে তিন হাজার ৩২০ টাকা, সেখানে অসাধু চক্রটি ভেজাল ফিড বিক্রি করছে মাত্র দুই হাজার ২০০ টাকায়। কম দামের ফাঁদে পড়ে সাধারণ খামারিরা এগুলো কিনে মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন; অন্যদিকে গবাদিপশুর স্বাস্থ্যও চরম ঝুঁকিতে পড়ছে। এমন প্রতারণা থেকে বাঁচতে তিনি খামারিদের শুধুমাত্র কোম্পানির অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে ফিড সংগ্রহের পরামর্শ দেন।
এদিকে, অভিযানে আটক হওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করেছে স্থানীয় সূত্র। আটককৃত ব্যক্তির নাম রিটন মিয়া। তার বাড়ি নেত্রকোনার মদন উপজেলার বাসইর গ্রামে।
অর্থদণ্ড প্রদানের সময় রিটন মিয়া প্রশাসনের কাছে দাবি করেন, ভেজাল এই কারবারের সঙ্গে তিনি সরাসরি জড়িত নন। তার ভাতিজা সুমন ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জের একটি দোকান থেকে ফিডগুলো কিনে তার মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। বস্তার ভেতরের ফিডগুলো যে ভেজাল, তা তিনি একেবারেই জানতেন না।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রিটন মিয়ার দাবির সত্যতা যাচাই এবং জব্দ করা ভেজাল ফিডের প্রকৃত উৎস ও মূল সরবরাহকারীদের পরিচয় উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। গবাদিপশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় আগামীতেও এ ধরনের ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।


