নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের প্রথম আলো যখন সবে চারপাশ আলোকিত করতে শুরু করে, চারপাশের প্রকৃতি যখন আড়মোড়া ভাঙে, ঠিক তখনই জরাজীর্ণ এক সাইকেলে পত্রিকা বোঝাই করে পথে নেমে পড়েন আব্দুল ছাত্তার। রোদ, বৃষ্টি, কুয়াশা কিংবা হাড়কাঁপানো শীত- প্রকৃতির কোনো বৈরিতাই গত ১৯ বছরে তার চাকার ঘূর্ণন থামাতে পারেনি। প্রতিদিন সকালে পাঠকের দুয়ারে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার যে দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছেন, তা আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন।
তবে দীর্ঘ দুই দশকের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে আজ তার শরীর ক্লান্ত। হৃদরোগ আর হাঁপানির মতো জটিল ব্যাধি বাসা বেঁধেছে শরীরে। চিকিৎসকদের কড়া নিষেধ রয়েছে ভারী কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে। কিন্তু জীবন-জীবিকার নির্মম তাগিদ আর সংসারের ঘানি টানতে অসুস্থ শরীর নিয়েই প্রতিদিন তাকে ঘুরাতে হয় পুরোনো সাইকেলের প্যাডেল। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে ছাত্তারের এখন একটাই ছোট্ট স্বপ্ন- কষ্ট লাঘবে একটি ইলেকট্রিক সাইকেল।
আব্দুল ছাত্তারের বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের নলছাপড়া গ্রামে। স্ত্রী, তিন সন্তান এবং বয়োবৃদ্ধ মাকে নিয়ে তার ছয় সদস্যের অভাবের সংসার। প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে শুরু হওয়া পত্রিকা বিক্রির সামান্য আয় দিয়েই চলে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, সন্তানদের লেখাপড়া এবং অসুস্থ মায়ের ওষুধের জোগান। তাই চাইলেও একদিনের জন্য কাজ বন্ধ রাখার উপায় নেই তাঁর।
হঠাৎ গতকাল (শনিবার) নাজিরপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর পাম্পের মোড় এলাকায় কথা হয় জীবনসংগ্রামী এই মানুষটির সঙ্গে। তখন তিনি কলমাকান্দা সদরে পত্রিকা বিলির কাজ শেষ করে নাজিরপুর বাজারের পাঠকদের কাছে খবর পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন। ছাত্তারের প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততা শুরু হয় সেই ভোরে, আর শেষ হয় গোধূলি লগ্নে। দীর্ঘ সময়ে জরাজীর্ণ সাইকেলটি চালিয়ে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছুটতে হয় তাকে।
দীর্ঘদিনের সঙ্গী পুরোনো সাইকেলটি নিয়ে আক্ষেপের অন্ত নেই ছাত্তারের। নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, সাইকেলটি এখন আর আগের মতো সচল নেই। মাঝপথেই প্রায়শই বিকল হয়ে পড়ে। তখন পত্রিকা বিলির তাগিদে কখনো সাইকেল ঠেলে, কখনো আবার জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করে গন্তব্যে ছুটতে হয় তাকে। সময়মতো পাঠকের হাতে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার প্রবল ইচ্ছার কাছে নিজের শারীরিক কষ্টগুলো যেন তিনি ভুলেই থাকেন।
অসুস্থতার কথা জানাতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছাত্তার বলেন, হৃদরোগের কারণে তার বুকে প্রায়ই তীব্র ব্যথা হয়। এর সঙ্গে রয়েছে হাঁপানির শ্বাসকষ্ট। কিন্তু পত্রিকা বিলি বন্ধ হলে পরিবারের পেটে ভাত জুটবে না। তাই অসুস্থ শরীর নিয়েই প্রতিদিন তাকে প্যাডেল ঘুরাতে হয়।
জীবনের গল্প শোনাতে গিয়ে পত্রিকা বিক্রেতা বলেন, “১৯ বছর ধরে পত্রিকা বিলি করছি। এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘদিনের পুরোনো সাইকেল দিয়ে চলতে অনেক কষ্ট হয়। এখন সাইকেল চালাইতে গেলে বুকের ব্যথা বাইড়া যায়, হাঁপাইয়া যাই। তাও কাজ বন্ধ করতে পারি না। কাজ বন্ধ করলে সংসার চলবে কেমনে? এই কাজ কইরাই তো পরিবার চালাই।”
নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়ে ছলছল চোখে ছাত্তার বলেন, “একটা ইলেকট্রিক সাইকেল পাইলে আমার অনেক উপকার হইত। শরীরে কষ্ট কম হইত। বুকের ব্যথা নিয়া আর আগের মতো প্যাডেল চাপতে হইত না। আমি আর কিছু চাই না, একটা ইলেকট্রিক সাইকেল হইলেই আমার কাজটা সহজ হইয়া যাইত।”
ছাত্তারের জীবনসংগ্রামের খুব কাছের সাক্ষী স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা। কলমাকান্দা উপজেলায় কর্মরত গণমাধ্যমকর্মী লিয়াকত আলী বলেন, “একটি পুরোনো সাইকেলে করে কলমাকান্দা সদরসহ আরও দুটি ইউনিয়নে পত্রিকা বিলি করেন ছাত্তার। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন এভাবে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়া তার জন্য এখন বেশ কষ্টকর। একটি ইলেকট্রিক সাইকেল পেলে তার যাতায়াত অনেক সহজ হবে এবং শারীরিক পরিশ্রমও অনেকটাই কমে যাবে।”
দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে মানুষকে খবর পৌঁছে দেওয়া পরিশ্রমী মানুষটির স্বপ্ন পূরণে এখন সমাজের বিত্তবান ও জনপ্রতিনিধিদের মানবিক সহায়তার দিকে চেয়ে আছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন মহল। তাদের প্রত্যাশা, নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে আব্দুল ছাত্তারের জীবনযুদ্ধকে কিছুটা সহজ করতে তার পাশে দাঁড়াবেন। একটি ইলেকট্রিক সাইকেল হয়তো বদলে দিতে পারে নিরলস এই মানুষটির জীবনের বাকি দিনগুলো।


