নিজস্ব প্রতিবেদক | The Mail BD
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি খাবার ও বিশ্রামের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। ডেঙ্গুতে জ্বর, বমি, দুর্বলতা ও পানিশূন্যতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সময় শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে পর্যাপ্ত তরল খাবার, সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রাম ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। তবে শুধু নির্দিষ্ট কোনো খাবার খেয়ে ডেঙ্গু নিরাময় করা বা প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়ানোর নিশ্চয়তা নেই।
ডেঙ্গু হলে কী খাবেন?
১. পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার
ডেঙ্গুতে জ্বর ও বমির কারণে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই রোগীকে অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করতে উৎসাহিত করা উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, স্যুপ ও অন্যান্য উপযুক্ত তরলও দেওয়া যেতে পারে। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী তরলের পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কিডনি বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তরল গ্রহণ ক্ষতিকর হতে পারে।
২. প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, ডাল ও দুধের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার দেওয়া যেতে পারে। রোগীর রুচি ও সহ্যক্ষমতা অনুযায়ী খাবার নির্বাচন করা উচিত।
৩. সহজপাচ্য খাবার
জ্বরের সময় অনেকের ক্ষুধা কমে যায়। এ অবস্থায় একবারে বেশি খাবার খাওয়ানোর পরিবর্তে অল্প অল্প করে কয়েকবার খাবার দেওয়া যেতে পারে। নরম ভাত, খিচুড়ি, স্যুপ, জাউ ও সেদ্ধ সবজি ভালো বিকল্প হতে পারে।
৪. ফলমূল ও শাকসবজি
পুষ্টির চাহিদা পূরণে কলা, পেঁপে, কমলা, পেয়ারা এবং অন্যান্য ফলের পাশাপাশি বিভিন্ন শাকসবজি খাওয়া যেতে পারে। রোগীর রুচি ও হজমের সুবিধা বিবেচনায় ফলমূল নির্বাচন করা উচিত।
ডেঙ্গু হলে যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এমন কঠোর নিষিদ্ধ খাবারের তালিকা নেই। তবে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।
অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার: বমি বমি ভাব, পেটের অস্বস্তি বা হজমের সমস্যা থাকলে ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।
অস্বাস্থ্যকর ও অপরিষ্কার খাবার: বাইরের খোলা খাবার বা দূষিত পানি থেকে ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করা জরুরি।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ: ডেঙ্গুতে জ্বর বা শরীরব্যথা হলে নিজে থেকে ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন ও ন্যাপ্রোক্সেনের মতো ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জ্বর কমাতে প্যারাসিটামলও চিকিৎসকের নির্দেশিত মাত্রায় গ্রহণ করতে হবে।
পেঁপে পাতার রস খেলেই কি প্লাটিলেট বাড়ে?
ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যেতে পারে। এ কারণে অনেকে পেঁপে পাতার রস বা বিভিন্ন ঘরোয়া উপাদানের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু এসব উপাদান ডেঙ্গু সারায় বা নিশ্চিতভাবে প্লাটিলেট বাড়ায়—এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখে রোগীর অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা, রক্তচাপ, রক্ত পরীক্ষার ফলাফল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য বিবেচনা করে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন। তাই ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি।
যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে
ডেঙ্গুতে জ্বর কমে যাওয়ার পরও কখনো কখনো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই জ্বর কমলেই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন, এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে:
- তীব্র বা একটানা পেটব্যথা।
- বারবার বমি হওয়া।
- নাক, মাড়ি বা অন্য কোনো স্থান থেকে রক্তপাত।
- শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা।
- অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, অস্থিরতা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
- প্রস্রাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া।
- পানি পান করতে না পারা বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দেওয়া।
এসব ক্ষেত্রে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে। রোগীর অবস্থা খারাপ হলে শুধু বাড়িতে খাবার ও বিশ্রামের মাধ্যমে সুস্থ করার চেষ্টা করা বিপজ্জনক হতে পারে।
চিকিৎসা, পুষ্টি ও বিশ্রাম—তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ
ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তরল, সুষম খাবার, বিশ্রাম এবং চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা পানীয় ডেঙ্গুর নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। আক্রান্ত ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও রোগের তীব্রতা অনুযায়ী খাবার ও তরলের চাহিদা ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।





