ঢাকা, ৯ অক্টোবর ২০২৬ | নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় দূরদেশে থাকা প্রিয়জনের খবর জানার অন্যতম মাধ্যম ছিল চিঠি। ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকা, হাতে লেখা চিঠি খুলে পড়া কিংবা প্রিয় মানুষের পাঠানো বার্তা যত্ন করে রেখে দেওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের আবেগ ও স্মৃতি। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমেছে। ফলে নতুন বাস্তবতায় চিঠির পরিবর্তে পণ্য ও পার্সেল পরিবহনকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।
আজ ৯ অক্টোবর, শুক্রবার বিশ্ব ডাক দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’। আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ডাকসেবা গড়ে তোলার পাশাপাশি ই-কমার্স ও লজিস্টিকস খাতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
চিঠির বদলে পণ্য পরিবহনে গুরুত্ব
ডাক বিভাগের প্রচলিত কার্যক্রমে পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দ্রুত পার্সেল পরিবহন সেবা ‘স্পিড পোস্ট’-এ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ সেবার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্য, গুরুত্বপূর্ণ নথি ও পার্সেল বুকিং দিয়ে গন্তব্যে পাঠানো যায়। পার্সেল কোথায় রয়েছে, তা জানার জন্য রয়েছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং সুবিধাও। ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত মাসে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে প্রায় ৮১১ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশগামী পার্সেল পরিবহনেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশগামী পার্সেল পরিবহনের পরিমাণ ছিল ২৪৩ টন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৩১৬ টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী পার্সেল পরিবহন বেড়েছে ৭৩ টন।
কত সময়ে পৌঁছাবে পার্সেল
ডাক বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্পিড পোস্টের মাধ্যমে জেলা শহর থেকে ঢাকায় সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা, এক জেলা শহর থেকে অন্য জেলা শহরে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা এবং প্রত্যন্ত বা দুর্গম অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে প্রধান ডাকঘর ও উপজেলা ডাকঘরের মাধ্যমে পার্সেল ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন সাব-পোস্ট অফিস, বুকিং কাউন্টার ও ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস থেকেও স্পিড পোস্টের বুকিং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজধানীতে পার্সেল সেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ঢাকা জিপিওসহ বিভিন্ন এলাকায় সরাসরি পার্সেল ডেলিভারি নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ডাক বিভাগের লক্ষ্য, বিদ্যমান নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে দেশের শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়ানো। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে একটি পার্সেলের সর্বোচ্চ ওজন ৩০ কেজি। ১ অক্টোবর থেকে প্রতি কেজিতে ৮ টাকা চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। এসএমএস ও ফোন নোটিফিকেশনের জন্য অতিরিক্ত এক টাকা নেওয়া হয়।
ই-কমার্স ও ডিজিটাল সেবায় নতুন সম্ভাবনা
অনলাইন কেনাকাটার প্রসারের সঙ্গে পণ্য সরবরাহের চাহিদাও বাড়ছে। এই খাতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে ই-কমার্স ও লজিস্টিকস সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে ডাক বিভাগ। ডিজিটাল ট্র্যাকিং, পণ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ এবং ফুলফিলমেন্ট সেন্টার চালুর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সেবাকে আরও আধুনিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য ও মৌসুমি ফল পরিবহন এবং উদ্যোক্তাভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালুর মাধ্যমেও কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। দেশজুড়ে বিস্তৃত ডাকঘরের নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানটির বড় শক্তি। এই নেটওয়ার্ক কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে বড় শহরের বাইরেও পণ্য সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, অনলাইন ব্যবসায়ী ও গ্রামীণ উৎপাদকদের জন্য সাশ্রয়ী পরিবহনসেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সেবার মান বাড়ানোও বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন সেবা চালুর পাশাপাশি গ্রাহকসন্তুষ্টি নিশ্চিত করাও ডাক বিভাগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পিড পোস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে সাড়া না পাওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। ফলে শুধু পরিবহনের পরিমাণ বাড়ানো নয়, সময়মতো পণ্য পৌঁছানো, গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। ডিজিটাল যোগাযোগের যুগে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমে গেলেও ডাকব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়নি। সরকারি নথি, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, পার্সেল এবং ই-কমার্স পণ্য পরিবহনে এই ব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ব ডাক দিবসে তাই ডাক বিভাগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঐতিহ্যবাহী নেটওয়ার্ককে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে নির্ভরযোগ্য, দ্রুত ও জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা। সেবার মান ও গ্রাহকের আস্থা বাড়াতে পারলে চিঠির যুগ পেরিয়েও দেশের যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।





