নিজস্ব প্রতিবেদক: মাদকের ভয়াল থাবা থেকে যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় নেত্রকোনা কলমাকান্দা উপজেলার সিধলী এলাকার সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমেছেন। চিহ্নিত মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করতে গেলে সিধলী তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এসআই) পরিমল সরকারের গড়িমসি এবং উল্টো মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী। এ ঘটনার প্রতিবাদে এবং অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার দ্রুত প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো বাজার এলাকা উত্তাল হয়ে উঠলেও, পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে থানার ওসি জানিয়েছেন- এ ঘটনায় এরই মধ্যে মাদকের মামলা রুজু করে আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সিধলী বাজারে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতার আয়োজনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। ব্যবসায়ী, ছাত্র, যুবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এদিন সিধলী বাজার এলাকা পুরোপুরি উত্তাল হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিধলী ও আশপাশের এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। যুবসমাজ যখন মাদকের নেশায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন স্থানীয় সচেতন জনতা সম্প্রতি চিহ্নিত মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করেন। পরে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাকে সিধলী তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ কর্মকর্তা এসআই পরিমলের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে অভিযোগ ওঠে, এসআই পরিমল ওই মাদক কারবারিকে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার বা আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে নানা রকম টালবাহানা শুরু করেন। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, এই পুলিশ কর্মকর্তা তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের বদলে এলাকার মাদক কারবারিদের গোপনে মদদ ও অনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন। রক্ষকের এমন ভক্ষক রূপ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভের সঞ্চার হয়, যা পরবর্তীতে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে রূপ নেয়।
বিক্ষুব্ধ জনতা ব্যানার হাতে নিয়ে বাজারের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। মিছিল শেষে প্রধান সড়কে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা ব্যানারে অভিযুক্ত এসআই পরিমলের ছবি যুক্ত করে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল- “এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে জনতা আটক করে পুলিশে দিতে চাইলে পুলিশের টালবাহানা করার প্রতিবাদে এবং মাদক ব্যবসায়ীদের মদদদাতা ও পৃষ্ঠপোষকতাকারী পুলিশের এসআই পরিমলকে প্রত্যাহারের দাবীতে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ ও মানববন্ধন।” এছাড়া বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে ‘মাদকের আস্তানা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ এবং ‘এসআই পরিমলের প্রত্যাহার চাই’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো বাজার এলাকা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এসআই পরিমলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
কলমাকান্দার কৈলাটি ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল আকন্দ বলেন, “গত ৫ আগস্টের পর থেকে এসআই পরিমল নির্দিষ্ট কিছু লোককে দিয়ে মাদক ব্যবসা করানোর মতো বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত আছেন। আমরা চাই কৈলাটি ইউনিয়নসহ সারা বাংলাদেশ থেকে মাদক বিলুপ্ত হোক। আমরা মাদকের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছি, প্রয়োজনে আবারও মিছিল করব। আমরা পরিমলকে এই জায়গা থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহার চাই।”
রাজবল্লভকান্দা গ্রামের বাসিন্দা আরিফ খান প্রশাসনের উদাসীনতার চিত্র তুলে ধরে বলেন, “এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা যখন তার কাছে কোনো বিষয় নিয়ে যান, তখন তিনি জবাব দেন- ‘এটা আমার দেখার বিষয় না, আমি এখন ঘুমে আছি’। নানা টালবাহানা দেখিয়ে তিনি মাদক কারবারিদের প্রশ্রয় দেন। সরকারি চাকরি করে সিধলী প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করার কোনো নৈতিক ক্ষমতা তার নেই। আমাদের একটাই দাবি, পরিমলকে এখান থেকে বিদায় করতে হবে।”
কৈলাটি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জয় বলেন, “মাদকের যে বেহাল দশা, তা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে প্রশাসনকে কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের সিধলী তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ তাদের মদদ দিয়েই মূলত এই ব্যবসা করাচ্ছে। আর এজন্যই আমাদের আজকের এই কর্মসূচি।”
এ বিষয়ে সিধলী তদন্ত কেন্দ্রের অভিযুক্ত এসআই পরিমল সরকার-এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি অপরাধী থাকলে আপনারা লিখবেন, কর্তৃপক্ষ আমারে পানিশমেন্ট দিবে, সাজা ভোগ করব। আপনারা যাচাই-বাছাই করেন, আপনাদের বিবেকের ওপর সব ছেড়ে দিলাম। আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” তিনি আরও বলেন, “সবাই ভাই-ব্রাদার মানুষ, হয়তো ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আশা করি, এই সমস্যাটা আর থাকবে না, সমাধান হয়ে যাবে।”
কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এ ধরনের কোনো অভিযোগের সত্যতা নেই; বরং পুলিশ যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে। যারা অভিযোগ তুলছেন, তারা সরজমিনে ঘুরে একটা রিপোর্ট করুন, তাহলে আসল চিত্রটা বুঝতে পারবেন, সম্পূর্ণ অপজিট। মাদকের মামলা হয়েছে, আসামিকে চালান দেওয়া হয়েছে।”


