নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রকৃতির এক নিবিড় বন্ধন আর আগামীর বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বপ্ন নিয়ে নেত্রকোনায় হয়ে গেল এক অনন্য সুন্দর আয়োজন। চারপাশের দূষণ আর বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চোখরাঙানির মাঝে সবুজ-শ্যামল পরিবেশ গড়ার প্রত্যয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কচি হাতে তুলে দেওয়া হলো সতেজ গাছের চারা। শিশুদের চোখে-মুখে তখন নতুন এক দায়িত্ববোধের আনন্দ। নেত্রকোনা পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির (পুনাক) উদ্যোগে আয়োজিত পরিবেশবান্ধব ও বর্ণাঢ্য কর্মসূচিটি যেন হয়ে উঠেছিল এক টুকরো অরণ্য গড়ার শপথ।
নেত্রকোনা পুলিশ লাইন্স স্কুল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান (বিপিএম-সেবা)। পরম মমতায় তিনি স্কুলপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে চারা তুলে দিয়ে এমন মহতী উদ্যোগের শুভ সূচনা করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলামসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং পুনাক, নেত্রকোনার নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংবাদকর্মীদের উদ্দেশ্যে প্রধান অতিথি প্রাণবন্ত ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। তার কথার ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা আর জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ সংকটের সতর্কতা।
সরকারের দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ডিআইজি জাহিদুল হাসান বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে কর্মসূচি শুরু হয়েছে, সেটারই ধারাবাহিকতা হিসেবে আমরা আজকে এখানে পুলিশ লাইন্স স্কুলের বাচ্চাদের মধ্যে বৃক্ষ বিতরণ করেছি।”
শিশুদের মাঝে গাছ বিতরণের অন্তর্নিহিত কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমরা পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে এই বোধ ছড়িয়ে দিতে চাই যে, পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে আমাদের প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগাতে হবে।” অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় তিনি শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে বলেন, গাছ কীভাবে বাতাস থেকে বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে বিশুদ্ধ অক্সিজেন বিলিয়ে দেয়। গাছ না থাকলে মানুষসহ কোনো প্রাণীর পক্ষেই যে পৃথিবীতে টিকে থাকা সম্ভব হতো না, সে কথাও তিনি পরম স্নেহে শিশুদের সামনে তুলে ধরেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা আজ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে; এমনকি শীতপ্রধান ইউরোপেও তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গাছের অপরিহার্যতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “হাতি বা অন্যান্য পশুপাখির জন্য খাদ্য ও ফলের জোগান দেয় বৃক্ষ। আমাদের দেয় ফুল আর অমূল্য অক্সিজেন।”
শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ- এমন ধারণার বাইরে গিয়ে গাছের নিবিড় পরিচর্যার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন ময়মনসিংহ রেঞ্জের এই শীর্ষ কর্মকর্তা। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি সবসময় বলি, শুধু বৃক্ষ রোপণ করলেই হবে না, তাকে পরিচর্যা করে বড় করে তুলতে হবে।” তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, চারাগাছ অনেক সময় গবাদিপশু খেয়ে ফেলতে পারে বা অযত্নে মরে যেতে পারে। তাই একটি গাছকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে সন্তানের মতো লালন-পালন করতে হবে, তবেই সেই গাছ একসময় বড় হয়ে পৃথিবীকে রক্ষা করবে।
সবুজের সমারোহে ঘেরা আয়োজনটি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও দূষণমুক্ত পৃথিবী রেখে যাওয়ার এক নীরব অঙ্গীকার। শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া একেকটি চারা যেন আগামী দিনের একেকটি স্বপ্নের বীজ, যা সযত্নে লালিত হলে একদিন ছায়া দেবে পুরো সমাজকে।




