নিজস্ব প্রতিবেদক: যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অন্ধকারে রেখে এবং তথ্য গোপন করে চিকিৎসার নামে ছুটি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর অভিযোগ উঠেছে নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার এক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত মো. নুর কামাল তালুকদার উপজেলার সাতগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। প্রায় দুই মাস ধরে তিনি বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। এতে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিস ও স্থানীয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রধান শিক্ষক মো. নুর কামাল তালুকদারের ছেলে দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকেন। ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার জন্য চলতি বছরের ১ জুলাই প্রাথমিক শিক্ষার ময়মনসিংহ বিভাগীয় উপ-পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার শর্তসাপেক্ষে তাকে ১৫ দিনের ছুটি মঞ্জুর করেন। ওই আদেশে শর্ত ছিল, বিদেশ যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে (ক্লাস্টার কর্মকর্তা বা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা) বিষয়টি অবহিত করতে হবে।
প্রধান শিক্ষক নুর কামাল তালুকদার ওই ছুটির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে একেবারেই জানাননি। উল্টো পূর্বের বিদেশ ভ্রমণের অনুমতির বিষয়টি গোপন রেখে তিনি পরবর্তীতে তিন মাসের মেডিকেল ছুটির আবেদন করেন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা শিক্ষা অফিস গত ৭ জুলাই তাকে এক মাসের মেডিকেল ছুটি মঞ্জুর করে। অভিযোগ রয়েছে, ছুটির সুযোগ নিয়েই তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমান এবং এরপর থেকেই সেখানে অবস্থান করছেন।
প্রধান শিক্ষকের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে সাতগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক ধরণের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সহকারী শিক্ষকদের ওপর প্রশাসনিক কাজের অতিরিক্ত চাপ পড়ায় তারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কাকলি ও ময়না আক্তার তাদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, “প্রধান শিক্ষক প্রায় দুই মাস ধরে বিদ্যালয়ে আসেন না। আমরা প্রথমে শুনেছি তিনি মেডিকেল ছুটিতে আছেন। এখন জানতে পারছি তিনি ছেলের কাছে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন। স্যার না থাকায় বিদ্যালয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আটকে আছে। আমরা নিজেদের চেষ্টায় শ্রেণি কার্যক্রম কোনোমতে স্বাভাবিক রাখলেও প্রশাসনিক অনেক কাজই আমাদের পক্ষে করা সম্ভব হচ্ছে না।” তারা আরও জানান, প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে মুঠোফোনে বা অন্য কোনো মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মো. নুর কামাল তালুকদারের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে শিক্ষা প্রশাসন। খালিয়াজুড়ি উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু রায়হান বলেন, “ওই প্রধান শিক্ষক বিদেশ গমনের জন্য ১৫ দিনের ছুটির কথা আমাদের না জানিয়েই তিন মাসের মেডিকেল ছুটির আবেদন করেন। তার প্রেক্ষিতে এক মাসের ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, তিনি অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিলেও বাস্তবে ছেলের কাছে দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে গেছেন। নির্ধারিত ছুটি শেষ হওয়ার পরও তিনি বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রতিবেদন পাঠানো হবে।”
অন্যদিকে, নেত্রকোনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) মোহাম্মদ শহিদুল আজম বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তিনি জানান, “ওই প্রধান শিক্ষকের পূর্বে নেওয়া এনওসি (অনাপত্তিপত্র) থাকলেও তিনি কর্তৃপক্ষকে অবগত না করে এবং সত্য গোপন করে চিকিৎসার অজুহাতে মেডিকেল ছুটি নিয়ে বিদেশে চলে গেছেন, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। এটি পরিষ্কার প্রতারণা। তার এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশসহ প্রয়োজনীয় যাবতীয় কাগজপত্র আজকেই (মঙ্গলবার) উপ-পরিচালকের (ডিডি) কার্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে।”
কর্তৃপক্ষের এমন কড়া বার্তার পর এখন দেখার বিষয়, তথ্য গোপনকারী এই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এদিকে, বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রশাসনিক কাজ দ্রুত ফিরিয়ে আনতে বিকল্প ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।



