নিজস্ব প্রতিবেদক: দায়িত্ববোধ, সততা ও কর্মনিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নেত্রকোনার এক নারী কর্মকর্তা। গভীর রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, তখন নিজের দায়িত্বের প্রতি অবিচল থেকে উন্নয়ন কাজের গুণগত মান তদারকি করতে সরাসরি মাঠে নেমেছেন তিনি। সঙ্গে তার ছোট্ট কন্যা সন্তান। এমন দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠায় নেত্রকোনার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনদের মাঝে গভীর মুগ্ধতা ও প্রশংসার সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দিনগত রাত ১১টায় ব্যতিক্রমী ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্তটি স্থাপন করেছেন নেত্রকোনা পৌরসভার বর্তমান প্রশাসক এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা।
জানা গেছে, নেত্রকোনা শহরের ইসলামপুর মোড় থেকে চন্দ্রনাথ স্কুলের গেট পর্যন্ত ২৯০ মিটার দীর্ঘ সড়কের উন্নয়ন ও ঢালাই কাজের উদ্বোধন এবং তদারকিতে গভীর রাতে উপস্থিত হন তিনি। কাজের গুণগত মান বজায় রাখা এবং সঠিক নিয়মে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হচ্ছে কি না, তা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন এই কর্মকর্তা। শুধু রাতেই নয়, এর আগে দুপুরেও কাজের রড বাইন্ডিংসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করতে দেখা যায় তাকে।
কাজের গুণগত মান এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই তার এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নারী হিসেবে নয়, একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবেই তিনি তদারকির কাজ করছেন। কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি জানান, ঢালাইয়ের আগেই রড বিছানোর ছবি তিনি সবার দেখার জন্য সামাজিক মাধ্যমে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে মুন মুন জাহান লিজা বলেন, “আমি ঢালাইয়ের আগেই ছবি দিয়েছি। যদি কেউ কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করে বা ত্রুটি ধরিয়ে দেয়, তাহলে আমি সেটা আবার ঠিক করাব। আমার সৎ সাহস আছে বলেই আমি এই চ্যালেঞ্জটা নিয়েছি।”
গভীর রাতে নারী হিসেবে কাজের তদারকি করাটা ব্যক্তিগত নাকি দাপ্তরিক দায়বদ্ধতা- এমন প্রশ্নের জবাবে দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বলেন, “এটাকে আপনি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বা কর্মের দায়বদ্ধতা বলতে পারেন। এখানে নারী হিসেবে নয়, আমি নিজেকে একজন কর্মকর্তা হিসেবে দেখছি। এখানে জেন্ডার বড় বিষয় নয়। আমার যে পরিচয় ও পদবি, সেই অনুযায়ী জনগণের সেবাটা যেন সুনিশ্চিত হয় এবং কাজের গুণগত মান যেন বজায় থাকে, সেজন্যই আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ দেখছি।”
দিনভর অফিস শেষ করে, সামান্য বিশ্রামের পর ছোট্ট শিশু কন্যা মুনমকে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে তার ছুটে চলা নজর কেড়েছে সবার। সংসার ও পেশাগত দায়িত্বকে একই সুতোয় বেঁধে তিনি যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন, তা সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক কবি তানভীর জাহান চৌধুরী এই নারী কর্মকর্তার মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেন, “আমি তাকে কেবল একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে দেখি না, তিনি একজন অত্যন্ত ডায়নামিক ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা। গভীর রাতে এমন উন্নয়ন কাজের তদারকিতে নেমে তিনি প্রমাণ করেছেন নিজের পেশা ও দায়িত্বের প্রতি তিনি কতটা যত্নশীল। আমাদের দেশে এমন দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল।”
তিনি আরও বলেন, কাজের মান নিশ্চিত করতে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম যেন না হয়, সেজন্য একজন কর্মকর্তার এমন রাত জেগে উপস্থিতি সমাজে সচেতনতা ও ইতিবাচক বার্তা দেয়। তার একাগ্রতা ও ব্যক্তিত্ব সাধারণ মানুষের মাঝে দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছে।
নেত্রকোনাবাসী মনে করছেন, এমন সৎ, সাহসী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের হাত ধরেই দেশের উন্নয়নমূলক কাজগুলো দুর্নীতিমুক্ত ও টেকসই হবে। মুন মুন জাহান লিজার এই পদক্ষেপ অন্যান্য কর্মকর্তাদের জন্যও এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।


