নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে নেত্রকোনায় দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল ১০টায় নেত্রকোনা জেলা প্রশাসনের আয়োজনে স্থানীয় পাবলিক হলে প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে সাম্য, স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, কর্ম ও দর্শনের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করা হয় এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে তাঁর আদর্শ ছড়িয়ে দিয়ে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানানো হয়।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ওয়াহিদুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনা জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. নুরুজ্জামান এবং পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সাম্য, স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় ও আত্মপ্রত্যয়ের কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট বর্ষকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মাঝে কবি নজরুলের আদর্শকে ছড়িয়ে দেওয়া।”

দেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, “বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি জাতীয় জাগরণেই কবি নজরুলের রচনা জাতিকে দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছে।” তরুণ শিক্ষার্থীদের ‘ভোরের পাখি’ হিসেবে সম্বোধন করে জেলা প্রশাসক আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সামাজিক ও আত্মমর্যাদাশীল, সাম্য ও নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই প্রজন্মই নেতৃত্ব দেবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. নুরুজ্জামান কবির অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, “নজরুল জন্ম থেকেই জ্বলছিলেন। অভাব-অনটনের মাঝেও তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।” তিনি ‘বিশ্বকবি সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ’ উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, নজরুলকে কেবল মুসলমানদের কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা ভুল; তিনি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে নজরুলের কঠোর অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, নজরুলকে নিয়ে গভীরভাবে চর্চা ও গবেষণা করলে আমরা সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারব।

অনুষ্ঠানের শুরুতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা শৃঙ্খলার অভাব লক্ষ্য করে বিশেষ অতিথি পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম নিয়মানুবর্তিতা ও আদবকেতা শিক্ষার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “নজরুল ছিলেন সাম্যের কবি, শোষণের বিরুদ্ধে ও নবজাগরণের কবি।” তরুণদের পাঠ্যাভ্যাস বৃদ্ধির তাগিদ দিয়ে তিনি নজরুলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’ পড়ার আহ্বান জানান। পুলিশ সুপার বলেন, “সমাজে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কীভাবে মানুষকে জর্জরিত করে, তা বুঝতে হলে এই উপন্যাসটি পড়া প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, নজরুলকে শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, তাঁর দর্শন চর্চা করে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কাজে লাগাতে হবে।

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন লেখক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী। তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের সৃষ্টিকর্মের অবদান স্মরণ করে বলেন, নজরুলের ‘চল চল চল’ এবং ‘কারার ঐ লৌহ কবাট’ এর মতো উদ্দীপনামূলক গানগুলো রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের বিপুল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ম. কিবরিয়া চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে নজরুলের গভীর ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রমাণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “একসময় কিছু মানুষ না বুঝে নজরুলকে ‘কাফের’ আখ্যা দিয়েছিল, অথচ তাঁর আধ্যাত্মিক সৃষ্টিকর্মগুলো অতুলনীয়।”

সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জনাব ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন বিদ্রোহী ও প্রেমের কবি, যিনি সমাজের সকল অন্যায়, অবিচার ও নারীদের প্রতি বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করে গেছেন।” প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের তিনি শুধু পুরস্কারের আশায় অংশ না নিয়ে, নজরুলের জীবন ও আদর্শকে নিজেদের জীবনে ধারণ করার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন, জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক এস এম মনিরুজ্জামান দুদু, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম শফিকুল কাদের সুজা, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব গাজী আব্দুর রহীম রুহি, জাসাসের জেলা শাখার আহ্বায়ক সাদমান চৌধুরী পাপ্পু, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি সজীব সরকার রতন।

আলোচনা সভা শেষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়, যেখানে নজরুলের বিখ্যাত গান ও কবিতা পরিবেশনের মাধ্যমে কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক, সাংবাদিক ও সুধীজন উপস্থিত ছিলেন।

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed by themailbd.com.
Exit mobile version