নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার হাওর অধ্যুষিত খালিয়াজুরী উপজেলায় চলতি মৌসুমে কৃষক ও জেলেরা বহুমুখী সংকটে পড়েছেন। অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতির পর, এখন ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, গো-খাদ্যের তীব্র সংকট এবং মাছ ধরায় বাধা- সব মিলিয়ে হাওরের মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে। ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এখানকার নিম্ন আয়ের মানুষ।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে খালিয়াজুরীতে ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় সাত হাজার পাঁচশো হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাওড়ে জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকরা সময়মতো ধান কাটতে পারেননি। মাঠে পানি থাকায় কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে দৈনিক দেড় থেকে দুই হাজার টাকা চড়া মজুরিতে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটতে হয়েছে। এরপর পর্যাপ্ত রোদ না পাওয়ায় কৃষকের কষ্টার্জিত ধানের রং কালচে হয়ে গেছে, যা এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। ধানের মান খারাপ হওয়ার অজুহাতে বাইরের জেলার ব্যবসায়ীরা এবার খালিয়াজুরীতে তেমন আসেননি। ফলে স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতার অভাবে ধানের দাম তলানিতে ঠেকেছে।
“এ বছর ধান বিক্রি করতে পারছি না। বাজারে দাম কম, আবার আড়তদারও আসে না। দু-একটি নৌকা এলেও সিন্ডিকেট করে ধানের দাম কমিয়ে দেয়।”- হামিদ আলী, কৃষক, গছিখাই গ্রাম।
“অতিরিক্ত খরচ করে ধান তুলেছি। এখন যদি প্রতি মণ ধান ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়, তাহলে কৃষকের টিকে থাকা কঠিন।”- ইদ্রিস আলী, কৃষক, পাঁচহাট গ্রাম।
ধান ব্যবসায়ীরাও নিজেদের লোকসানের কথা জানাচ্ছেন। ধান ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ধানের রং কালচে হওয়ায় মিল মালিকরা ধান নিতে চাইছেন না, তাছাড়া মিলগুলোতে পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় চাহিদাও কম। কাদিরপুর গ্রামের ব্যবসায়ী ভোলা সরকারের মতে, এলাকা থেকে ধান কিনে আশুগঞ্জে নিয়েও পরিবহন ও শ্রমিকের খরচের কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
ফসলহানির প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে গবাদিপশুর খাদ্যের ওপর। ধান নষ্ট হওয়ায় খড় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। গো-খাদ্যের তীব্র সংকটের কারণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে তাদের গবাদিপশু পানির দরে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফসল উৎপাদন ও পশু পালনের জন্য নেওয়া ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার ভাঁজ কৃষকদের কপালে।
বছরের ছয় মাস কৃষিকাজ ও বাকি ছয় মাস মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা হাওড়ের মানুষের মৎস্য খাতেও নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা। মাছের প্রজনন রক্ষায় গত ২৮ মে থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও উন্মুক্ত জলাশয়ে জেলেরা নির্বিঘ্নে মাছ ধরতে পারছেন না।
“নিষেধাজ্ঞা মেনে এক মাস নদীতে যাইনি। কিন্তু এখনো মাছ ধরতে ভয় লাগে। নদীতে গেলেই বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। মাছ ধরতে না পারায় পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।”- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে, সদর ইউনিয়ন।
খালিয়াজুরী সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম আবু ইসহাক জানান, কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ঋণের বোঝা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জেলেদের জন্য বিশেষ সরকারি সহায়তার জোর দাবি জানান।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার হাওড়াঞ্চলের এই সংকটকে জাতীয় পর্যায়ের প্রভাব বলে উল্লেখ করেন। তিনি নদী-নালা ভরাট, বিএডিসির বীজ ব্যবস্থাপনা এবং ইজারানীতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “অবিলম্বে ইজারানীতি বাতিল করে উন্মুক্ত জলাশয়ে প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং হাওড়াঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।”
সংকটের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষতির খবরে বাইরের আড়তদাররা আসেননি। তবে সরকারি গুদামে কৃষকদের ধান বিক্রির সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) এস. এম. শারীকুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ চলমান রয়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান জানান, মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরায় কোনো বাধা নেই। নিষেধাজ্ঞার সময় নিবন্ধিত জেলেদের ৩০ কেজি করে ভিজিএফ চাল দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামান সার্বিক বিষয়ে বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকার বিভিন্ন সহায়তা দিচ্ছে। সরকারি গুদামে আবেদনকারী কৃষকদের ধান বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। হাওড়ে মাছের প্রজনন বৃদ্ধিতে ২৬ মেট্রিক টন পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। প্রকৃত জেলেদের হালনাগাদ তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে যাতে ভবিষ্যতে তাদের সহায়তার আওতায় আনা যায়।”
প্রশাসনের নানা আশ্বাসের পরও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, হাওড়াঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষকদের বিশেষ প্রণোদনা ও গো-খাদ্য সহায়তা প্রদান এবং প্রকৃত জেলেদের নির্বিঘ্নে মাছ ধরার সুযোগ তৈরি করতে সরকারকে আরও দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে হাওড়ের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পঙ্গুত্বের শিকার হবে।



