নিজস্ব প্রতিবেদক: বনায়ন বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় নাগরিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। একইসঙ্গে নেত্রকোনায় পর্যটন খাতের বিকাশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শিশু পার্ক স্থাপনের জোর দাবি জানিয়েছেন জেলার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪টায় নেত্রকোনা সার্কিট হাউজে যাত্রা বিরতির সময়ে প্রাঙ্গণে নিম গাছের চারা রোপন এবং আকস্মিক ঘরোয়া মতবিনিময় সভায় তারা এসব কথা বলেন। নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এ সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মো. আরিফুল ইসলাম সরদার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুখময় সরকার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুনমুন জাহান লিজা, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলামসহ জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
সভার শুরুতে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এই অনানুষ্ঠানিক ও স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজনের জন্য জেলা ও পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান। এরপর তিনি নেত্রকোনা জেলার সার্বিক উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন।
ডেপুটি স্পিকার নেত্রকোনার পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ন্যূনতম ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন হলেও নেত্রকোনায় এর পরিমাণ মাত্র ০.৩০ থেকে ০.৭০ শতাংশ, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি জেলা প্রশাসন এবং বন বিভাগকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই হার অন্তত এক শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়ার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের শুধুমাত্র জেলা সদরে সীমাবদ্ধ থাকার প্রবণতার সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা সদরের বাইরে না যাওয়ার ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের নাগরিকেরা রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি শিক্ষা কর্মকর্তাসহ অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শনের আহ্বান জানান।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্যোগে প্রবর্তিত নতুন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং হেলথ কার্ড বিতরণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব কার্ডগুলো বিতরণে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি বা দলীয়করণ বরদাস্ত করা হবে না। অতীত সরকারের সময়ের বৈষম্য ও দুর্নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, প্রকৃত বঞ্চিত মানুষরাই যেন এই রাষ্ট্রীয় সুবিধা পান।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আবেগঘন কণ্ঠে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তার গাড়িতে থাকা জাতীয় পতাকা কোনো বিলাসিতা বা লোক দেখানো বিষয় নয়, বরং এটি সততা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং শহীদদের রক্তের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এক মহান দায়িত্ব।
তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে কাজ না করে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে সাধারণ জনগণের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় নেত্রকোনার সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান। ডেপুটি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “আপনার নেতৃত্বে আমাদের ডেভেলপমেন্টের নতুন মাত্রা পাওয়া শুরু হয়েছে। আমরা আশা করি আরও কয়েকটি মেজর প্রজেক্ট আপনি ইনিশিয়েট করবেন।”
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশের ওপর জোর দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, “আমার ব্যক্তিগত চাওয়া হচ্ছে নেত্রকোনা জেলাতে একটি শিশু পার্ক নির্মাণ। আগামী প্রজন্মের বাচ্চাদের মানসিক বৃদ্ধির জন্য এটি খুব প্রয়োজন। শিশু পার্কের জন্য আমি জায়গা দেব, জায়গার সমস্যাটি আমি সমাধান করব।”
নেত্রকোনার পর্যটন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক অবকাঠামোগত উন্নয়নের তাগিদ দেন। তিনি বলেন, “আমার ব্যক্তিগত ১৪ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতায় দেখেছি, নেত্রকোনা অবকাঠামোগত দিক দিয়ে কিছুটা পিছিয়ে আছে। নেত্রকোনার একটি বড় শক্তি হচ্ছে পর্যটন (ট্যুরিজম)। কিন্তু আমাদের যদি অবকাঠামো না থাকে, তবে আমরা ট্যুরিজম সেক্টরকে বুস্টআপ করতে পারব না।”
সভার শেষাংশে ডেপুটি স্পিকার জেলা প্রশাসকের এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সাথে সমন্বয় করে কাজ করার আশ্বাস প্রদান করেন। সুন্দর, দুর্নীতিমুক্ত ও মাদকমুক্ত নেত্রকোনা গড়তে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের একসাথে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘটে।


