এদিকে, রামিসার মা পারভীন আক্তার কান্নাজড়িত করে গণমাধ্যমকে বলেন, রামিসা প্রতিদিনই ঘুম থেকে উঠে নানা বাহানা করতো। ওই দিনও ঘুম থেকে ওঠার পর বাসা থেকে বের হয়ে যায়। স্কুলের সময় হয়ে যাচ্ছে বলে আমি ওকে ডাকাডাকি শুরু করি। কিন্তু অনেকক্ষণ চিল্লাচিল্লি করার পরও আশপাশ থেকে কোনো আওয়াজ না পাওয়ায় আমি বাসা থেকে বের হয়ে রামিসাকে খুঁজতে থাকি। এরই মধ্যে দেখি আমাদের পাশের বাসার সোহেলের ফ্ল্যাটের সামনে ওর স্যান্ডেল পড়ে রয়েছে।
আমি মনে করছি রামিসা মনে হয় ওদের বাসায়। আমি তখন বাইরে থেকে দরজায় নক করি। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ কোনো সাড়া দিচ্ছিল না। বাইরে থাকা সকলের জুতা-স্যান্ডেল দেখে আমার তখন সন্দেহ হয়। আমি আশপাশের মানুষকে ডাক দিই। অনেকেই আবার চিল্লাচিল্লি শুনে এগিয়ে আসে। পরে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিই। এরপর পুলিশ এসে দরজা ভেঙে দেখে ভেতরে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না রয়েছে। ওদের জানালার গ্রিল ভাঙা। আর ওদের রুমের খাটের নিচে আমার রামিসার মাথা ছাড়া রক্তাক্ত লাশ। পরে ওদের বাথরুমের বালতির মধ্যে থেকে আমার ছোট্ট রামিসার খণ্ডিত মাথা খুঁজে পায় পুলিশ।
অশ্রুসিক্ত হয়ে তিনি বলেন, আমি যখন ওদের দরজায় নক করছিলাম তখনই ঘরের ভেতর সোহেল ও তার স্ত্রী আমার মেয়েটাকে হত্যা করছিল। ওর ওই ছোট্ট দেহটা টুকরো টুকরো করছিল। আর সোহেল যেন পালিয়ে যায় এই জন্যই ওর স্ত্রী দরজা খুলছিল না।বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বিলাপ করতে করতে বলেন, আমার ছোট্ট মা’টা কই। আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো।
কে আমাকে ফোন করে বলবে- বাবা তাড়াতাড়ি বাসায় আসো। বাবা আমার জন্য চিপস্ নিয়ে এসো। আমি কার জন্য আর বাসায় ফিরবো। আমি তো আর বাঁচতে পারবো না। আমার তো কারোর সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না। কারোর তো কখনো কোনো ক্ষতি করিনি। তাহলে কি দোষে আমার ছোট্ট এই নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে এইভাবে হত্যা করলো? কেন করলো? এমন বীভৎস্যতা কি কেউ কারোর সঙ্গে করতে পারে? আমি কি আমার বাচ্চাকে এভাবে হত্যার বিচার পাবো?এদিকে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে ঘাতক সোহেল রানা (৩৪)কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয় ঘাতক সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে।
সোহেল পেশায় রিকশার মেকানিক। গ্রেপ্তারের পর গতকাল দুপুরে তাদের দুজনকে আদালতে হাজির করে সোহেলের বিরুদ্ধে দশ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। পরে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয় সোহেল। বিকাল সোয়া ৩টার দিকে হাজতখানা থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে সোহেল রানাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে হাজির করা হয়।সোহেলের বরাত দিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক ওহিদুজ্জামান বলেছেন, সোহেল তার জবানবন্দিতে বলেছে, ঘটনার দিন সকালে সে প্রথমে ইয়াবা সেবন করে।
এরপর দরজা খুলে রামিসা দেখতে পেয়ে তাকে ঘরের মধ্যে জোর করে ধরে নিয়ে আসে। এরপর বাথরুমে নিয়ে প্রথমে ৮ বছর বয়সী রামিসাকে ধর্ষণ করে সোহেল। এরপর চিল্লাচিল্লি শুরু করলে গলাটিপে শ্বাসরোধ করে রামিসাকে হত্যা করে সোহেল। হত্যার পর লাশের নামচিহ্ন মুছে ফেলতে কয়েক টুকরো করে লাশ বাইরে ফেলে দিতে চেয়েছিল সোহেল। এই উদ্দেশ্যেই ধারালো ছুরি দিয়ে প্রথমে রামিসার শরীর থেকে মাথা আলাদা করে ফেলে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নিহত শিশুর সুরতহাল প্রস্তুত, প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় ঘটনাস্থল ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে পল্লবী থানা পুলিশের একটি চৌকস দল তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে ঘটনার মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
তিনি বলেন, ভিকটিম শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর ধারালো ছুরি দ্বারা মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক ও নৃশংসভাবে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর ধারালো ছুরি দিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় ব্যবহৃত ছুরি এবং মৃতদেহের বিচ্ছিন্ন মাথাসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনায় রাসিমার বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।


