নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার বারহাট্টায় সাত বছর বয়সী প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিশুকে ধর্ষণের মর্মান্তিক ঘটনায় অবশেষে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার প্রায় আড়াই মাস পর ভুক্তভোগী শিশুর বাবা বাদী হয়ে বারহাট্টা থানায় মামলা দায়ের করেন। ধর্ষণের কারণে সৃষ্ট মারাত্মক ইনফেকশনে শিশুটির জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন চিকিৎসকরা। ফলে, শিশুটি ভবিষ্যতে আর কখনোই মা হতে পারবে না বলে জানিয়েছেন তার পরিবার।
অমানবিক এমন ঘটনাটি ঘটেছে নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বাউসী ইউনিয়নের শাসনউড়া গ্রামে। অভিযুক্ত কিশোরের নাম নুরজামাল (১৬)। সে একই এলাকার নিজামউদ্দিনের ছেলে এবং সম্পর্কে ভুক্তভোগী শিশুটির প্রতিবেশী চাচা হয়।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বারহাট্টা থানার ওসি মো. নাজমুল হাসান মামলা দায়েরের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে মেয়েটির বাবা বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। আসামির বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে নিজ বাড়ি ফাঁকা থাকার সুযোগ নেয় অভিযুক্ত নুরজামাল। সে কৌশলে অবুঝ শিশুটিকে ডেকে নিজের ঘরে নিয়ে যায় এবং তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। ঘটনার ভয়াবহতায় এবং মেরে ফেলার হুমকিতে শিশুটি প্রথমে কাউকে কিছু জানাতে সাহস পায়নি।
ঘটনার পর বেশ কিছুদিন বিষয়টি গোপন থাকলেও, কিছুদিন পর শিশুটির পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। স্থানীয় চিকিৎসকদের ওষুধে সাময়িক উপশম হলেও ব্যথা বারবার ফিরে আসতে থাকে।
ভুক্তভোগী শিশুর বাবা সরিকুল ইসলাম জানান, “ঘটনার পর আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। কিছুদিন পর মেয়ের পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হলে আমরা তাকে স্থানীয় ডাক্তার দেখাই। ওষুধ খেলে সে কিছুদিন সুস্থ থাকে, কিন্তু এরপর আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে। কয়েকদিন আগে পেটের ব্যথা চরম আকার ধারণ করলে ডাক্তার আমাদের আল্ট্রাসনোগ্রাম করানোর পরামর্শ দেন।”
আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই পরিবারটি জানতে পারে শিশুটির সাথে মারাত্মক কোনো ঘটনা ঘটেছে। পরে মেয়েকে অভয় দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে জানায়, কীভাবে নুরজামাল তাকে ঘরে ডেকে নিয়ে এমন সর্বনাশ করেছে। সরিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর একদিন তার স্ত্রী নুরজামালকে শিশুটিকে ডাকতে দেখেছিলেন। তখন সন্দেহ হওয়ায় তাকে জিজ্ঞেস করা হলে সে সুকৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যায়।
পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে জীবন বাঁচানোর তাগিদে চিকিৎসকরা তার জরুরি অস্ত্রোপচার করেন। গত মঙ্গলবার হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার সময় চিকিৎসকরা পরিবারকে জানান এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ। পাশবিক নির্যাতনের কারণে শিশুটির ডিম্বাণু ও জরায়ুতে মারাত্মক ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই তাকে বাঁচাতে বাধ্য হয়ে জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সরিকুল ইসলাম আরও বলেন, “আমার বাচ্চাটা আর কোনোদিন মা হতে পারবে না। এলাকা থেকে অনেকেই আমাকে ফোন করে চাপ দিচ্ছে যেন আমি মামলা না করি। তারা টাকা-পয়সা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে ফেলতে বলছে। কিন্তু আমি আমার মেয়ের এই সর্বনাশের বিচার চাই।”
বর্বর এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য পরিবারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়।
এই কঠিন সময়ে পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছে ‘স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা। সংস্থাটির প্রোগ্রাম ম্যানেজার কোহিনূর বেগম জানান, “আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছি।”


