নিজস্ব প্রতিবেদক: যিনি নিজের যৌবন আর জীবনের মায়া ত্যাগ করে লাল-সবুজ মানচিত্রের জন্য লড়েছিলেন, তাঁর শেষ বিদায়টুকু অন্তত হবে পরম সম্মানের- এমনটাই তো জাতির কাছে তাঁর পাওনা। সেই অন্তিম যাত্রায় যখন বাধা আসে, তখন তা কেবল একজন বীর সন্তানকে নয়, বরং পুরো জাতির বিবেককেই যেন কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা প্রদান এবং তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান থেকে বঞ্চিত করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে নেত্রকোনা। একইসঙ্গে এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও উচ্চারিত হয়েছে দৃপ্ত হুংকার।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ১১টায় নেত্রকোনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের সামনের সড়কটি পরিণত হয়েছিল একখণ্ড প্রতিবাদী মোহনায়। জেলা ও সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভায় জেলার সর্বস্তরের মানুষ, সুশীল সমাজ এবং প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধারা এক কাতারে এসে দাঁড়ান। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও সহযোদ্ধাকে অসম্মানের যে গ্লানি, তা যেন মুহূর্তেই তাঁদের ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল একাত্তরের সেই তেজোদীপ্ত দিনগুলোতে। হাতে ধরা ব্যানার আর চোখেমুখে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে তাঁরা জানান দিয়েছেন- মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান এ দেশের মাটি কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
সুব্রত ঘোষের সাবলীল সঞ্চালনায় প্রতিবাদী মানববন্ধনে উঠে আসে এক বেদনার আখ্যান। বক্তারা অভিযোগ করেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর একটি বিশেষ চক্র, বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের ইন্ধনে তাঁর জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়ায় ন্যক্কারজনকভাবে বাধা সৃষ্টি করা হয়। এটি কেবল একজন মৃত মানুষের প্রতি অবমাননা নয়, বরং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত।
সভায় আবেগঘন ও জোরালো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, নেত্রকোনা জেলা সংসদের যুগ্ম-আহ্বায়ক শামসুল হক মাহবুব এবং সদস্য সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান তালুকদার। তারা বলেন, “যাঁদের রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীন দেশে শ্বাস নিচ্ছি, তাঁদের অন্তিম শয়ানে এমন ধৃষ্টতা জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত করেছে।”
মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে আরও বক্তব্য রাখেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের আহ্বায়ক হায়দার জাহান চৌধুরী, আব্দুল মতিন খান, মোজাম্মেল হক বাচ্চু, আক্কাস আলী, তরিকুল ইসলাম, আলী আজগর খান পন্নী, বোরহান উদ্দিন প্রমুখ। শুধু সদর নয়, দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন পূর্বধলার আবদুল আজিজ, কেন্দুয়ার নুরুল হক এবং কলমাকান্দার আব্দুল বারী চান মিয়ার মতো বীর যোদ্ধারা। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পক্ষে তীব্র নিন্দা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন উদীচীর জেলা সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান।
মানববন্ধন থেকে বক্তারা সর্বসম্মতভাবে একটি সুনির্দিষ্ট ও জোরালো দাবি উত্থাপন করেন। তারা বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন যেভাবে তড়িঘড়ি বা অসম্মানের মধ্য দিয়ে করা হয়েছে, তা বাতিল করতে হবে। অবিলম্বে তাঁর লাশ কবর থেকে সসম্মানে উত্তোলন করে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় (গার্ড অব অনার প্রদানপূর্বক) পুনরায় দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। রাষ্ট্রীয় সম্মান ছাড়া একজন মুক্তিযোদ্ধার বিদায় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, দাফনে বাধার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি জামায়াত-শিবিরের চলমান দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ। এই অপশক্তি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে এবং দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্টের পাঁয়তারা করছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল শ্রেণির মানুষকে আজ ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
সবশেষে, স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীদের এমন পরিণতি যেন আর কখনোই দেখতে না হয়, সেই অঙ্গীকার ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় প্রতিবাদ কর্মসূচি।


