নিজস্ব প্রতিবেদক: কলম যার হাতিয়ার, সত্য প্রকাশই যার ব্রত- তাকে থামাতে বুলেটের ব্যবহার সমাজের জন্য অশনি এক সংকেত। দুর্নীতি, মাদক আর অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে একজন কলম সৈনিককে যখন প্রাণ দিতে হয়, তখন শুধু একটি সম্ভাবনাময় জীবনই ঝরে যায় না, বরং সমাজের আয়নাটাই যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের নির্মম হত্যাকাণ্ড সেই রূঢ় বাস্তবতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
এই শোক, ক্ষোভ আর বিচারহীনতার আশঙ্কার প্রতিবাদে রবিবার (১৮ অক্টোবর) সকাল ১১টায় এক কাতারে নেমে এসেছিলেন নেত্রকোনার পূর্বধলার গণমাধ্যমকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। পূর্বধলা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে প্রেসক্লাব চত্বরে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশটি নিছক কোনো কর্মসূচি ছিল না; বরং এটি ছিল স্বাধীন সাংবাদিকতা বাঁচিয়ে রাখার এক আকুল আর্তনাদ।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পূর্বধলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. জায়েজুল ইসলাম এবং সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক নোমান শাহরিয়ার। সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে প্রতিবাদী আয়োজন এক আবেগঘন রূপ নেয়।
বক্তাদের কণ্ঠে বারবার উঠে এসেছে একটি গভীর আক্ষেপ- প্রশাসন আরেকটু তৎপর হলে হয়তো বাঁচানো যেত আলিফকে। কারণ, হত্যার শিকার হওয়ার আগে আলিফ নিজে থেকেই তাকে দেওয়া প্রাণনাশের হুমকি ও হামলার আশঙ্কার বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন। তারপরও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে? এমন প্রশ্ন তুলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সমাবেশে উপস্থিত সাংবাদিকেরা।
প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শফিকুল আলম শাহীন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা, দৈনিক আমার সংবাদের জেলা প্রতিনিধি গোলাম কিবরিয়া সোহেল, এনটিভি অনলাইন প্রতিনিধি এস এম ওয়াদুদসহ জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মীরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, “মাদক, সন্ত্রাস ও অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে সাংবাদিকদের যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয় এবং মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়, তবে দেশে মুক্ত সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। আমরা চাই না আর কোনো সাংবাদিককে সত্য প্রকাশের কারণে জীবন দিতে হোক।”
হত্যাকাণ্ডের পর একজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হলেও মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় সাংবাদিক সমাজে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। অবিলম্বে মূল আসামিদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয় সমাবেশ থেকে। অন্যথায় আগামীতে গণমাধ্যমকর্মীরা আরও কঠোর ও বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।
একইসঙ্গে, স্থানীয় প্রশাসন এবং দুর্গাপুর-কলমাকান্দা আসনের সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বক্তারা। বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালীদের শনাক্ত করে দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতে তিনি যেন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন, সেই আহ্বান জানানো হয়।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত সোয়া ৮টার দিকে এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হয় দুর্গাপুর পৌরসভা এলাকার মানুষ। শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের পাশে তেলুঞ্জিয়া এলাকায় একটি দোকানে বসে থাকার সময় দুর্বৃত্তদের অতর্কিত গুলির শিকার হন বেসরকারি আইপি টেলিভিশন ‘রূপসী বাংলা’র নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। ঘটনাস্থলেই তার প্রাণবায়ু ঝরে যায়।
রবিবারের এই প্রতিবাদী মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন ও সংহতি জানান সাংবাদিক নুর উদ্দিন মণ্ডল দুলাল, জাকির আহমদ খান কামাল, এমদাদুল ইসলাম, মো. শফিকুজ্জামান, হাবিবুর রহমান, আজকের আরবানের সহসম্পাদক আবুল আরশাদ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সাকিব আব্দুল্লাহ, ডা. মো. শহিদুল্লাহ, অর্থ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন শিমুল, দিনকালের উপজেলা প্রতিনিধি আল-ইমরান, আল মনসুর।
পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারের দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে উপস্থিত ছিলেন আজকের আরবানের স্টাফ রিপোর্টার নাহিদ আলম, ইমতিয়াজ আহমেদ সজিব, সাইফুল্লাহ মনসুর, মিঠু সরকার, শাহীন খন্দকার, আমিনুল হক, তুষার দত্ত, মুজিবুর রহমানসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের অসংখ্য কর্মী।
সবার একটাই চাওয়া- আলিফের রক্ত যেন বৃথা না যায়। সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরতে গিয়ে আর কোনো কলম সৈনিকের পরিবারকে যেন এমন শোক বইতে না হয়।


