কেন্দুয়া প্রতিনিধি: একসময় শ্রেণিকক্ষেই বিলিয়েছেন শিক্ষার আলো, গড়েছেন কতশত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। দীর্ঘ সময় পর সেই চেনা আঙিনাতেই তিনি ফিরলেন, তবে এবার আর কেবল শিক্ষক হিসেবে নয়, বরং শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সম্মানিত সভাপতি হিসেবে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সান্দিকোনা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (স্কুল অ্যান্ড কলেজ) এমনই এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জাহানা আফরোজকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় আড়ম্বরপূর্ণ সংবর্ধনা ও মেধাবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের দাবি হিসেবে উঠে আসে শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয়করণের বিষয়টি।
কেবল সংবর্ধনাই নয়, দিনটি ছিল শিক্ষার্থীদের মেধার মূল্যায়নেরও। সদ্য সমাপ্ত এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত সাতজন অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীকে এদিন ‘হাসেম বৃত্তি’ প্রদান করা হয়। কৃতী শিক্ষার্থীদের হাতে বৃত্তির সম্মাননা তুলে দিয়ে তাদের আগামী দিনে আরও ভালো ফলাফল করার অনুপ্রেরণা জোগানো হয়।
দুপুর ২টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শুরু হওয়া প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আলহাজ্ব বাবুল আহম্মদ। সহকারী শিক্ষক ফারুক আহম্মেদ রাসেলের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন। বক্তব্য দেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ভূইয়া রুকন, উপজেলা কৃষকদলের সভাপতি মাহবুবুর রহমান খান মহসীন, উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ইয়াকুব আলী ভূইয়া জুয়েল এবং অভিভাবক সদস্য শহীদুল ইসলাম সবুজ।
দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এতদঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে সান্দিকোনা স্কুল অ্যান্ড কলেজ। বক্তারা তাদের আলোচনায় সুদীর্ঘ ইতিহাসের কথা স্মরণ করে প্রতিষ্ঠানটিকে অবিলম্বে জাতীয়করণের জোর দাবি জানান। তারা বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং এলাকার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় গুণগত শিক্ষা পৌঁছে দিতে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠের জাতীয়করণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সংবর্ধনার জবাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালীর সহধর্মিণী ও সংবর্ধিত অতিথি জাহানা আফরোজ। স্মৃতির পাতা উল্টে তিনি বলেন, “আমি এক সময় এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলাম। দীর্ঘদিন পর আবার আমার প্রিয় প্রতিষ্ঠানে আসতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। এই প্রতিষ্ঠানটি আমার কাছে একটি পরিবারের মতো।”
জাতীয়করণের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে তিনি উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আশ্বস্ত করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে প্রাণের এই দাবিটি পূরণে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবেন।
আলোচনা, স্মৃতিচারণ আর দাবির গণ্ডি পেরিয়ে অনুষ্ঠানের শেষ পর্বটি হয়ে উঠেছিল আনন্দমুখর। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পরিবেশিত হয় মনোজ্ঞ নাট্যাংশ, গান ও নৃত্য। এরপর মঞ্চ মাতান ‘গানপাগল’ ব্যান্ডের শিল্পীরা। তাদের সুরেলা পরিবেশনার মধ্য দিয়েই শেষ হয় কেন্দুয়ার বুকে দাগ কেটে যাওয়া সুন্দর এক বিকেলের।
এদিনের এই আয়োজন কেবল সংবর্ধনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি হয়ে উঠেছিল প্রাক্তন ও বর্তমানের মিলনমেলা, যেখানে শতবর্ষের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে আগামী দিনে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন বুনেছে সান্দিকোনা।


