জামালপুর প্রতিনিধি: প্রতিদিনের মতোই বেচাকেনা শেষে দোকানের ঝাঁপ ফেলে বাড়ি ফিরেছিলেন ব্যবসায়ীরা। চোখে ছিল দিনান্তের ক্লান্তি শেষে নিশ্চিন্ত ঘুমের তৃপ্তি আর নতুন ভোরের স্বপ্ন। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রাত যে তাদের একেবারে নিঃস্ব করে দেবে, তা কে জানত! গভীর রাতের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে চোখের পলকেই ছাই হয়ে গেছে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার পাঁচজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বেঁচে থাকার সম্বল।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে উপজেলার পার্থশী ইউনিয়নের পূর্ব গামারিয়া এলাকার দালালবাড়ি মোড় বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে পাঁচটি দোকান, আংশিক ক্ষতি হয়েছে আরও কয়েকটির। সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের দাবি, সর্বনাশা আগুনে তাদের অন্তত ৩০ লাখ টাকার বেশি সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
আগুনের লেলিহান শিখা শুধু কাঠ আর টিনই পোড়ায়নি, পুড়িয়েছে খেটে খাওয়া মানুষগুলোর তিল তিল করে জমানো পুঁজি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন বাজারের ‘রাজ মেডিকেল’ নামের ওষুধের দোকানের মালিক রাজিব। পোড়া দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার দোকানে এক থেকে দুই লাখ টাকার শুধু ওষুধই ছিল। আর ফ্লেক্সিলোড ব্যবসার জন্য মোবাইলে ব্যালেন্স ছিল প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। চোখের সামনে আগুনে আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমি এখন পথে বসে গেলাম।”
একই অবস্থা বাজারের মনোহারি দোকানি ছালামের। তার দোকানে থাকা তিন থেকে চার লাখ টাকার মালামালের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কয়লা হয়ে যাওয়া দোকানের দিকে তাকিয়ে নির্বাক তিনি।
কীভাবে শুরু হলো এই ধ্বংসযজ্ঞ? বাজারের নৈশপ্রহরী মো. আঞ্জু মিয়ার চোখের সামনেই ঘটে আগুনের সূত্রপাত। তিনি জানান, প্রতিদিনের মতো রাত ১২টার দিকে তিনি পাহারার কাজে আসেন। চারপাশ ছিল সুনসান। হঠাৎ রাত ১টার দিকে তিনি রাজিবের ওষুধের দোকান থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া বের হতে দেখেন। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ধোঁয়া থেকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। তার চিৎকারে আশপাশের মানুষজন ছুটে আসেন।
আরেক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর সেই রাতের বিভীষিকার কথা স্মরণ করে বলেন, “রাত ১০টার পর দোকান বন্ধ করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাত ১২টা থেকে ১টার দিকে হঠাৎ বাইরে মানুষের চিৎকার আর হইচই শুনে দৌড়ে বের হই। দেখি, পুরো বাজারের মোড় কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। আগুনের তাপে কাছে যাওয়ারও কোনো উপায় ছিল না।”
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ইসলামপুর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট। স্থানীয় সাহসী মানুষদের সঙ্গে নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রায় আধা ঘণ্টার নিরলস চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। তাদের প্রচেষ্টায় পুরো বাজারটি বড় ধরনের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেলেও, ততক্ষণে ওই পাঁচটি দোকান সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। তবে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের তৎপরতায় অন্য দোকানগুলো থেকে লাখ টাকার মালামাল অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ইসলামপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম জানান, অগ্নিকাণ্ডে পাঁচটি দোকান সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত। তবে ঠিক কোথা থেকে বা কীভাবে এই আগুনের সূত্রপাত হলো, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে। ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ নিরূপণের কাজও চলছে বলে জানান তিনি।
ক্ষতির সরকারি হিসাব যাই হোক না কেন, দালালবাড়ি মোড় বাজারের বাতাসে এখন শুধুই পোড়া গন্ধ আর দীর্ঘশ্বাস। যে দোকানগুলো একদিন ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর থাকত, সেখানে এখন শুধুই পোড়া টিন আর ছাইয়ের স্তূপ। ব্যাংক বা এনজিওর ঋণ আর জমানো পুঁজি হারিয়ে নতুন করে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন, সেই দুশ্চিন্তায় এখন দিশেহারা সর্বস্বান্ত হওয়া ব্যবসায়ীরা। ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় এখন তারা চেয়ে আছেন সরকারি বা বিত্তবানদের সহায়তার দিকে।


