নিজস্ব প্রতিবেদক: ময়মনসিংহ বিভাগের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ খ্যাত নেত্রকোনা জেলায় শিল্প-সংস্কৃতির চর্চাকে আরও বেগবান করতে এবং নতুন প্রজন্মের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সনদ বিতরণ ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেল ৫টায় নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমি।
অনুষ্ঠানে জেলা শিল্পকলা একাডেমি নেত্রকোনার প্রশিক্ষণ বিভাগের কোর্স সমাপনী পরীক্ষা-২০২৫ এ উত্তীর্ণ প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে সনদপত্র প্রদান করা হয়। একইসঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃক আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতা ২০২৫’-এ নেত্রকোনা জেলা থেকে অংশগ্রহণকারী বিজয়ীদের সংবর্ধনা ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান। জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের পর প্রথমবারের মতো তিনি নিজ হাতে শিশু-কিশোরদের মাঝে সনদ ও সম্মাননা তুলে দেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুনমুন জাহান লিজা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি পহেলি দে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান নেত্রকোনার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে বলেন, “নেত্রকোনা হলো ময়মনসিংহ বিভাগের কালচারাল রাজধানী। এখানের মাটিতে অসংখ্য গুণীজন, সাহিত্যিক ও সেলিব্রেটি জন্ম নিয়েছেন, যা দেশের খুব কম জেলাতেই দেখা যায়। অত্যন্ত বেদনার বিষয় হলো, জেলায় শিল্পকলা একাডেমির নিজস্ব কোনো অডিটোরিয়াম বা ভবন নেই।”
তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, “ডিসি কনফারেন্সে আমি বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছি। মাননীয় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন নেত্রকোনা তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যও ডিও লেটার দিয়েছেন। সর্বপরি, বর্তমানে অডিটোরিয়াম নির্মাণের কাজ ‘ফাস্ট ট্র্যাকে’ রয়েছে এবং খুব দ্রুতই আমরা এর ইতিবাচক ফলাফল পাবো।”
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দিতে তিনি আগামী আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং কালচারাল অফিসারদের নিয়ে বিশেষ সভার ঘোষণা দেন। এছাড়াও ক্রীড়া ক্ষেত্রে ‘ডিসি গোল্ডকাপ’ এর আদলে সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও প্রতিভা অন্বেষণে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা ব্যক্ত করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুনমুন জাহান লিজা বলেন, “প্রায় ১৭-১৮ বছর পর বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা পুনরায় শুরু হয়েছে। এ প্রতিযোগিতায় তৃণমূল থেকে আমাদের নেত্রকোনা জেলার সাত-আট জন শিশু অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, যা একটি জেলার জন্য বিশাল প্রাপ্তি।”
তিনি আরও বলেন, “জেলা প্রশাসক মহোদয় শিক্ষা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতির প্রতি কতটা আন্তরিক, তা আজকের এই অনুষ্ঠানেসশরীরে উপস্থিত হয়ে শিশুদের হাতে সনদ তুলে দেওয়ার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়।” তিনি শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষকদের আন্তরিকতা ও আবেগের প্রশংসা করেন এবং অভিভাবকদের প্রতি তাদের সন্তানদের প্রতিভা বিকাশে আরও যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও ‘কচি কাঁচার মেলা’র সাথে দীর্ঘকাল যুক্ত থাকা সংগঠক শ্যামলেন্দু পাল। তিনি তার বক্তব্যে বর্তমান সময়ে শিশু সংগঠনগুলোর প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবের কথা তুলে ধরে আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “১৯৬৫ সাল থেকে শিশুদের নিয়ে কাজ করছি। একটা সময় এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রতিযোগিতা হতো। আজ শিল্পকলা একাডেমির নিজস্ব ভবন না থাকাটা অত্যন্ত কষ্টের।” তিনি ১৯৩০ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেত্রকোনায় আসার ঐতিহাসিক পরিকল্পনার কথা স্মরণ করে বলেন, “উপমহাদেশের মধ্যে নেত্রকোনাতেই প্রথম বিশ্বকবির জন্মজয়ন্তী পালনের কথা ছিল, যা দুর্ভাগ্যবশত সম্ভব হয়নি।” তিনি অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত ‘অধরা’ নামক শিশু শিল্পীর ভূয়সী প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান উত্তীর্ণ প্রশিক্ষণার্থী এবং নতুন কুঁড়ির বিজয়ীদের হাতে সনদপত্র ও সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে জেলা প্রশাসক বলেন, “যতই বড় হও না কেন, গুরুজন এবং শিক্ষকদের সবসময় সম্মান করতে হবে। এটি কখনো ভোলা যাবে না।”
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মাঝে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, জেলা কালচারাল অফিসার, শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষকবৃন্দ, প্রশিক্ষণার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান নেত্রকোনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।


