শেখ শামীম: মন্ত্রী, এমপি বা ভিআইপিদের অভ্যর্থনা জানাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ করে বা রোদে পুড়িয়ে রাস্তার দুই পাশে দাঁড় করিয়ে রাখার সংস্কৃতি দেশের অনেক জায়গাতেই দেখা যায়। তবে এবার নিজের অভ্যর্থনায় শিক্ষার্থীদের এভাবে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হননি তিনি, এ ঘটনার জন্য দায়ী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন ইউনিয়নের গুড়াডুবা হাওড়ে নির্মাণাধীন বাঁধের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তার যাওয়ার পথে উপজেলার উদয়পুর বাজার এলাকায় ‘উদয়পুর মিতালী উচ্চ বিদ্যালয়’ এর শিক্ষার্থীদের রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখে স্কুল কর্তৃপক্ষ। উদ্দেশ্য ছিল এলাকার সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকারকে বর্ণাঢ্য অভ্যর্থনা জানানো।
এরআগে গতকাল বৃহস্পতিবার এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে।
জানা যায়, গাড়িবহর নিয়ে ও এলাকা অতিক্রম করার সময় শিক্ষার্থীদের এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল । তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে উপস্থিত কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলামকে ডেকে নেন এবং এ ঘটনার জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
রাস্তায় শিক্ষার্থীদের দেখে তিনি সোজা চলে যান ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সেখানে গিয়ে তিনি শিক্ষার্থী ও উপস্থিত শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, “তোমাদের প্রধান ও একমাত্র কাজ হচ্ছে পড়াশোনা করা। শিক্ষা অর্জনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অবস্থাতেই, কাউকে খুশি করার জন্য বা অভ্যর্থনা জানানোর জন্য শিক্ষার্থীদের এভাবে রাস্তায় দাঁড় করানো ঠিক নয়।”
ভিআইপি সংস্কৃতির সমালোচনা করে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আরও বলেন, “কে মন্ত্রী বা এমপি- এটা কোনো বড় বিষয় নয়। আমরা জনগণের সেবক। প্রয়োজন হলে আমরা জনপ্রতিনিধিরাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলব। তাদের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজখবর নেব। কিন্তু এর জন্য তাদের রাস্তায় এনে দাঁড় করানো যাবে না।”
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে কড়া বার্তা দিয়ে কায়সার কামাল জানান, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগে থেকে যদি তাকে জানাতো, তবে তিনি নিজেই সময় বের করে বিদ্যালয়ে যেতেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এভাবে ব্যবহার করা একেবারেই অনুচিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভবিষ্যতে কলমাকান্দা-দুর্গাপুরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে তিনি শিক্ষকমণ্ডলীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেন।
ডেপুটি স্পিকারের নির্দেশের পর উপজেলা প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। এ বিষয়ে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম জানান, “ডেপুটি স্পিকার মহোদয় শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড় করানোর বিষয়টি দেখে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তার নির্দেশনার প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরকারি বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে আমরা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। দ্রুতই এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
ডেপুটি স্পিকারের এমন সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও কড়া অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল। তারা মনে করেন, জনপ্রতিনিধিদের এমন দায়িত্বশীল আচরণই পারে যুগ যুগ ধরে চলে আসা অপসংস্কৃতি দূর করে শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে।
