নিজস্ব প্রতিবেদক: উত্তরের মেঘালয় পাহাড় ঘেঁষা নেত্রকোনা সীমান্ত। প্রকৃতিতে এখন হেমন্তের মিষ্টি হিমেল হাওয়া আর ভোরের ঘন কুয়াশা। প্রকৃতির এই শান্ত রূপ আর রাতের নির্জনতাকে কাজে লাগিয়ে ঠিক এই সময়েই সক্রিয় হয়ে ওঠে সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাকারবারিরা। তবে তাদের সেই অপতৎপরতা রুখে দিতে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। টানা ২৪ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে নেত্রকোনা সীমান্তের ১০টি ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্ট থেকে প্রায় ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ৫৭০ টাকা মূল্যের চোরাই পণ্য জব্দ করেছে নেত্রকোনা ব্যাটালিয়ন (৩১ বিজিবি)।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এসব অভিযানের বিস্তারিত তথ্য জানান নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের (৩১ বিজিবি) অধিনায়ক ও পরিচালক লে. কর্নেল তৌহিদুল বারী (পিএসসি)। নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল (মঙ্গলবার) সকাল ১১টা থেকে আজ (বুধবার) সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে এই সাঁড়াশি অভিযান।
হিমালয় ছুঁয়ে আসা শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গেই সীমান্তে বেড়েছে ভারতীয় কম্বল ও প্রসাধনী পাচারের চেষ্টা। তবে বিজিবির সতর্কতায় ভেস্তে গেছে পাচারকারীদের সেই ছক। সবচেয়ে বড় সফলতাটি আসে বিজয়পুর বর্ডার অবজারবেশন পোস্ট (বিওপি) এলাকা থেকে। বুধবার ভোরে সীমান্ত পিলার ১১৪৮ এমপির কাছে প্রেমবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার টাকা মূল্যের ১১৩টি ভারতীয় কম্বল জব্দ করা হয়। এর আগে মধ্যরাতে একই এলাকার কয়লারপোট থেকে উদ্ধার হয় আরও ২২টি কম্বল ও ১৬৩ পিস প্রসাধনী।
এছাড়া চারুয়াপাড়া ও খারনই বিওপির জোয়ানরা গোবরচনা এবং গোপালবাড়ী এলাকা থেকে উদ্ধার করেন আরও সাতটি কম্বল। অন্যদিকে, মঙ্গলবার সকালে বরুয়াকোনা বিওপির টহল দল কুয়ারপাড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় জিরা (৪৮ কেজি) এবং দুই হাজার ২৯২ পিস বিভিন্ন ধরণের প্রসাধনী জব্দ করে, যার মূল্য প্রায় ৭৩ হাজার টাকা।
কেবল প্রসাধনী বা শীতবস্ত্রই নয়, গবাদিপশু ও খনিজ সম্পদ রক্ষায়ও বিজিবির নজরদারি ছিল চোখে পড়ার মতো। মঙ্গলবার রাতে লেংগুড়া বিওপির সদস্যরা টকলেটবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের আটটি ভারতীয় গরু উদ্ধার করেন। পরদিন বুধবার সকালে মহেষখোলার নকলাই নামক স্থান থেকে জব্দ করা হয় ২.২ মেট্রিক টন (দুই হাজার ২০০ কেজি) ভারতীয় কয়লা। শুধু অবৈধ অনুপ্রবেশ নয়, দেশ থেকে পাচার হওয়ার পথেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজিবি। বুধবার ভোরে পাচারের উদ্দেশ্যে জড়ো করা ৩১৫ কেজি দেশি রসুন আটক করে বিজয়পুর বিওপির টহল দল।
এদিকে, মাদক প্রতিরোধে সীমান্তে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রেখেছে ৩১ বিজিবি। বুধবার সকালে পাঁচগাঁও বিওপির সদস্যরা সন্ন্যাসীপাড়া থেকে ২৪ বোতল এবং মঙ্গলবার বিকেলে মোহনপুর বিওপি নয় বোতল ভারতীয় মদসহ মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল জব্দ করে।
বিজিবি সূত্র জানায়, প্রতিটি অভিযানেই জোয়ানদের উপস্থিতি টের পেয়ে মালামাল ফেলে রাতের আঁধারে গা ঢাকা দেয় চোরাকারবারিরা। ফলে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে আইনি প্রক্রিয়া শেষে জব্দকৃত গবাদিপশুগুলো কাস্টমস প্রতিনিধির উপস্থিতিতে প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করা হবে। উদ্ধারকৃত কম্বল, কয়লা, জিরা ও অন্যান্য সামগ্রী নেত্রকোনা কাস্টমস অফিসে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি জব্দকৃত ৩৩ বোতল মদ ও মোটরসাইকেলটি হস্তান্তর করা হচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে।
দেশের অর্থনীতি বাঁচানো এবং যুবসমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দূরে রাখতে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীদের নজরদারি ও কঠোর অভিযান আগামীতেও একইভাবে অব্যাহত থাকবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে বিজিবি।


