কেন্দুয়া প্রতিনিধি: সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিল শুক্রবার। কর্মব্যস্ততা পেরিয়ে স্ত্রী আর দুই সন্তানকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি থেকে কেন্দুয়ায় ফিরছিলেন মাহমুদুল হক শাহিন। হয়তো অন্য আট-দশটা দিনের মতোই আনন্দঘন ও স্বাভাবিক দিন কাটানোর কথা ছিল চার সদস্যের ওই ছোট্ট পরিবারটির। কিন্তু সড়কের বাঁকে ওত পেতে থাকা মর্মান্তিক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সব আনন্দ কেড়ে নিয়ে তছনছ করে দিল সাজানো সংসারটি। বাবার সঙ্গে চিরতরে থেমে গেল পাঁচ বছরের শিশুসন্তান রাজিনের পৃথিবী, আর হাসপাতালের বিছানায় এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন গুরুতর আহত মা ও মেয়ে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের লাহিড়ী বাড়ি মোড়ে দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর বাবা মাহমুদুল হক শাহিন (৪৫) ও তার পাঁচ বছরের ছেলে রাজিনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। গুরুতর আহত অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন শাহিনের স্ত্রী তুহিন এবং তাঁদের ছয় বছরের শিশুকন্যা মুমু।
নিহত মাহমুদুল হক শাহিন কেন্দুয়া উপজেলার দলপা ইউনিয়নের আমতলী গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় তিনি ছিলেন কেন্দুয়া সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একজন দলিল লেখক।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকালে গ্রামের বাড়ি আমতলী থেকে স্ত্রী তুহিন, মেয়ে মুমু ও ছেলে রাজিনকে মোটরসাইকেলে নিয়ে কেন্দুয়া সদরের দিকে আসছিলেন শাহিন। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাদের মোটরসাইকেলটি নওপাড়া ইউনিয়নের লাহিড়ী বাড়ি মোড়ে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা অপর একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদের সজোরে ধাক্কা দেয়। মুখোমুখি সংঘর্ষের তীব্রতায় দুটি মোটরসাইকেলই দুমড়েমুচড়ে যায় এবং আরোহীরা সড়কের ওপর ছিটকে পড়ে গুরুতর রক্তাক্ত হন।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন ছুটে এসে হতাহতদের উদ্ধার করেন। দ্রুত অটোরিকশায় করে তাদের কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাহমুদুল হক শাহিন ও তার শিশুপুত্র রাজিনকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, স্ত্রী তুহিন ও মেয়ে মুমুর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে মা ও মেয়ে সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দুর্ঘটনায় কবলিত অপর মোটরসাইকেলটির চালকের নাম মো. শফিক (২৮)। তিনি পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার অরণ্যপাশা গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রের দাবি, সংঘর্ষে আহত হওয়ার পর শফিকও কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েছিলেন। তবে বাবা-ছেলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনি হাসপাতালের খাতায় নিজের নাম নিবন্ধন বা কোনো চিকিৎসা না নিয়েই কৌশলে সেখান থেকে সরে পড়েন। তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কেন্দুয়া থানার ডিউটি অফিসার মোশাররফ হোসেন এই দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহত বাবা ও ছেলের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে, একই পরিবারের দুই সদস্যের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে আমতলী গ্রামসহ পুরো কেন্দুয়া এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এক নিমেষে হাসিখুশি একটি পরিবারের এমন অপূরণীয় ক্ষতি মেনে নিতে পারছেন না স্বজন ও প্রতিবেশীরা। একদিকে বাবা-ছেলের নিথর দেহ, অন্যদিকে হাসপাতালের বিছানায় কাতরানো মা ও মেয়ের সামনে এখন কেবলই দীর্ঘ চিকিৎসা আর প্রিয়জন হারানোর কঠিন বাস্তবতা।




