নিজস্ব প্রতিবেদক: গণতান্ত্রিক সমাজে মতের ভিন্নতা থাকবে, থাকবে আদর্শিক বিতর্কও। সেই বিতর্কের জবাব কি হতে পারে হামলা কিংবা পেশিশক্তির প্রদর্শন? এমনই এক মৌলিক প্রশ্নকে সামনে রেখে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছিল নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী উপজেলা দুর্গাপুরের প্রেসক্লাব মোড়।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে সমাবেশের আয়োজন করে সিপিবি দুর্গাপুর উপজেলা কমিটি। বিকেলের নরম আলোয় অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে কেবল ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই ঘটেনি, বরং উঠে এসেছে পরমতসহিষ্ণুতা ও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক জোরালো আহ্বান।
সমাবেশে বক্তাদের কণ্ঠে ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার তাগিদ। তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা কোনো নির্দিষ্ট স্লোগান নিয়ে কারও আপত্তি থাকতেই পারে। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তার মোকাবিলা হতে হবে যুক্তি, সংলাপ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। স্লোগানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কোনো স্লোগানকে অজুহাত বানিয়ে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর চড়াও হওয়া কিংবা তাদের কার্যালয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কোনোভাবেই সুস্থ রাজনীতির পরিচায়ক হতে পারে না।
বক্তারা দেশের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সিপিবির ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে দলটির অবদান পর্যালোচনার আহ্বান জানান তারা। নেতৃবৃন্দ বলেন, সোমবার রাতে পুরানা পল্টনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কারা অনভিপ্রেত হামলা চালিয়েছে, তা দেশের মানুষের কাছে অস্পষ্ট নয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষার খাতিরেই এ ঘটনার দায়ভার সরকারকে নিতে হবে।
প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেওয়া নেতৃবৃন্দ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নিজস্ব কার্যালয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার থাকা অপরিহার্য। কেবল রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা স্লোগানের ভিন্নতার কারণে যদি কাউকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের জন্য এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
সিপিবি দুর্গাপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি আলকাছ উদ্দীন মীরের সভাপতিত্বে এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় সমাবেশটি পরিচালিত হয়। এতে দলের অবস্থান ও দাবি তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন সিপিবি উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুপন কুমার সরকার এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি সায়মন মিয়া। এ ছাড়া স্থানীয় ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন।
সমাবেশের শেষভাগে ভয়ভীতি, হামলা ও বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি পরিহার করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দেশের সব রাজনৈতিক শক্তিকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রবীণ ও তরুণ রাজনীতিকরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন।
সুপারিশগুলো হলো- অবিলম্বে পুরানা পল্টনের ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা। সব রাজনৈতিক দলের কার্যালয় এবং নেতা-কর্মীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা।




