মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইয়েমেনের হুতিরা এখন অন্যতম আলোচিত সশস্ত্র গোষ্ঠী। সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হুমকি এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও তাদের গুরুত্ব বেড়েছে। কিন্তু কারা এই হুতিরা, কীভাবে তাদের উত্থান এবং কেন সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সংঘাত?
ইয়েমেনের ধর্মীয় আন্দোলন থেকে উত্থান
হুতিদের আনুষ্ঠানিক নাম ‘আনসার আল্লাহ’, যার অর্থ ‘আল্লাহর সাহায্যকারী’। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের সাদা প্রদেশে ১৯৯০-এর দশকে তাদের আন্দোলনের বিকাশ ঘটে। গোষ্ঠীটি মূলত জায়দি শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে শিকড় গেড়ে ওঠে। এই সম্প্রদায় ইয়েমেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় জনগোষ্ঠী।
হুসেইন আল-হুতি ছিলেন আন্দোলনটির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ও আদর্শিক নেতা। তাঁর নাম থেকেই ‘হুতি’ পরিচিতি জনপ্রিয় হয়। শুরুতে ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক অধিকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষকে ঘিরে আন্দোলনটি গড়ে উঠলেও ২০০৪ সালে ইয়েমেনের সরকারের সঙ্গে তাদের সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়।
কীভাবে ইয়েমেনের বড় শক্তি হয়ে উঠল হুতিরা?
২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রভাবে ইয়েমেনে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা ছাড়ার পর দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে হুতিরা নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি বাড়ায়।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তারা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বুহ মানসুর হাদির সরকার ভেঙে পড়ে এবং দেশটি গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়। হুতিরা ইয়েমেনের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত কেন?
ইয়েমেনের সীমান্তবর্তী দেশ সৌদি আরব হুতিদের উত্থানকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানো।
এরপর দুই পক্ষের সংঘাত আরও তীব্র হয়। হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে। এই সংঘাতে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ ভয়াবহ মানবিক সংকটে পড়েছে।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা গভীর?
হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইরানের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অস্ত্র, প্রযুক্তি ও সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ইরান গোষ্ঠীটির সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে হুতিদের শুধু ইরানের নির্দেশে পরিচালিত একটি গোষ্ঠী হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য, স্থানীয় সমর্থন এবং ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বও রয়েছে।
ইরান ও সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ইয়েমেনের সংঘাত বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে।
কেন আবার আলোচনায় হুতিরা?
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির ফলে সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমেছিল। তবে স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি। ২০২৩ সাল থেকে গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা এবং ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনায় হুতিরা নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে।
২০২৬ সালের অক্টোবরে সৌদি আরবে বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের হামলার খবর নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এসব হামলার পেছনে ইয়েমেনের চলমান সংঘাত, সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপ এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক বিরোধের প্রভাব রয়েছে।
সব মিলিয়ে, হুতিদের উত্থান শুধু একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সামরিক শক্তি অর্জনের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইয়েমেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট, ধর্মীয় ও আঞ্চলিক পরিচয়, ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান তাই কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগে নয়, ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপরও নির্ভর করছে।


