নিজস্ব প্রতিবেদক: তিল তিল করে জমানো অর্থে বাজারের এক কোণে একখণ্ড জমি কিনেছিলেন যাদবপুর গ্রামের নিরীহ ব্যবসায়ী অনন্ত সরকার। স্বপ্ন ছিল সেখানে গড়ে তুলবেন নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নিচু ও গর্তে ভরা সেই জায়গাটিতে নিজের ঘাম ঝরানো অর্থে মাটি ভরাট করেছিলেন। স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হিসেবে কিনে রেখেছিলেন ইটসহ প্রায় দুই লাখ টাকার নির্মাণসামগ্রী। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আদালতও তার পক্ষে রায় দিয়েছিল। এত কিছুর পরও শেষ রক্ষা হয়নি। আদালতের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেই জমিতে জোরপূর্বক টিনের চালা তুলে দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় দুই ব্যক্তি- কামাল মিয়া ও মুজিবুর মিয়ার বিরুদ্ধে।
নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুর কুতুবপুর বাজারে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী অনন্ত সরকার বিচার চেয়ে খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর প্রভাবশালী কামাল মিয়া ও মুজিবুর মিয়া দলবল নিয়ে অনন্ত সরকারের কেনা ওই দেড় শতাংশ জমিতে জোরপূর্বক ঘর নির্মাণ করেন। শুধু জমি দখলই নয়, সেখানে ঘর নির্মাণের জন্য আগে থেকে রাখা প্রায় আট হাজার ইট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী তারা সরিয়ে ফেলেন, যার বাজারমূল্য আনুমানিক দুই লাখ টাকা।
অনন্ত সরকার আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘প্রায় ছয় বছর আগে তৎকালীন বাজার কমিটির মাধ্যমে আমি কল্যাণপুর কুতুবপুর বাজারে এই জমি কিনি। জায়গাটি নিচু থাকায় নিজ খরচে মাটি ফেলে ব্যবহার উপযোগী করি। জমিটি এত দিন আমার দখলেই ছিল। কামাল মিয়া আমার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করলেও, আদালত বিচার-বিশ্লেষণ করে আমার পক্ষেই রায় দেন। এরপরও তারা গায়ের জোরে আমার জমিতে ঘর তুলেছে এবং আমার রাখা ইট ও মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে।’
জানা যায়, বাজার প্রতিষ্ঠার সময় তৎকালীন কমিটির তিন সদস্য- নাজিমুদ্দিন সরকার, আবুল কাসেম সরকার ও খেলু মিয়ার নামে কামাল মিয়া ৩০ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। এর মধ্যে খেলু মিয়ার নামে থাকা ১০ শতাংশ জমি থেকে অনন্ত সরকার দেড় শতাংশ কেনেন। এই জমির অবস্থান কুতুবপুর মৌজার বিআরএস ৬৭ নম্বর খতিয়ান এবং সাবেক ২৫ ও ২৬ নম্বর দাগ (নতুন ৬৭ নম্বর দাগ)-এর অন্তর্ভুক্ত।
মামলার রায় প্রসঙ্গে অনন্ত সরকারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনোরঞ্জন সরকার জানান, জমি নিয়ে কামাল মিয়া আদালতে মামলা করেছিলেন এবং স্থায়ী নিষেধাজ্ঞাও চেয়েছিলেন। ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সহকারী জজ মো. শাহ পরাণ সম্পূর্ণ বিচার-বিশ্লেষণ শেষে অনন্ত সরকারের পক্ষে রায় দেন। কামাল মিয়া ওই রায়ের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো আপিল করেননি, ফলে এখন আর আপিল করার আইনি সুযোগও তার নেই।
দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে কামাল মিয়া জানান, অনন্ত সরকারের সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। তবে তার দাবি, তিনি তৎকালীন বাজার কমিটির তিন সদস্যের কাছে মাত্র ১০ শতাংশ জমি বিক্রি করলেও তারা প্রতারণার মাধ্যমে ৩০ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন। এই ক্ষোভ থেকেই তিনি আদালতে মামলা করেছিলেন। বর্তমান দখল প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, ‘জমিটি আগে থেকেই আমার দখলে ছিল এবং আমি নিজের জায়গাতেই ঘর তুলেছি। বাজার কমিটি আমাকে চারটি ভিটি ও নগদ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও রাখেনি।’
অন্যদিকে, মুজিবুর মিয়া নিজেকে কেবল ভাড়াটিয়া হিসেবে দাবি করে বলেন, ‘জমিটি আমার নয়, কামাল মিয়ার। তিনি সেখানে আগে থেকেই দখলে ছিলেন এবং অনন্ত সরকারের রাখা নির্মাণসামগ্রী কামাল নিজেই সরিয়ে নিয়েছেন।’ মুজিবুর আরও জানান, তিনি ওই ঘরে ভাড়ায় ব্যবসা করেন এবং মালামাল সুরক্ষিত রাখতেই ঘরের দুই পাশে বেড়া দিয়েছেন। তার দাবি, এক সালিশে বিরোধ মীমাংসার জন্য কামালকে একটি ঘরের ভিটি ও নগদ সাড়ে চার লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এ ঘটনায় হতবাক স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাজার কমিটির নেতারা। বণিক সমিতির সভাপতি মো. বাশার মিয়া নিশ্চিত করেন, বাজার প্রতিষ্ঠার সময় বিক্রি হওয়া ৩১টি ভিটির মধ্যে অনন্ত সরকার একটি কিনেছিলেন এবং নিজের খরচে মাটি ভরাট করেছিলেন। আদালতের রায়ের পরও সেখানে জবরদখল করে ঘর তোলার ঘটনায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
বর্তমান বাজার কমিটির সভাপতি মো. গোলাপ মিয়া (গোপাল মাস্টার) আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘অনন্ত সরকার একজন অত্যন্ত সহজ-সরল ও নিরীহ ব্যবসায়ী। তাকে এভাবে হয়রানি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’ তিনি জানান, বাধা দেওয়া সত্ত্বেও কামাল মিয়া তা উপেক্ষা করে টিনের চালা নির্মাণ করেছেন।
জমির মূল দলিলদাতা খেলু মিয়াও অনন্ত সরকারের পক্ষ নিয়ে বলেন, ‘অনন্ত সরকারকে আমরাই জমি বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। সে নিরীহ হওয়ায় একটি পক্ষ ইচ্ছে করেই তার জমি নিয়ে বিরোধ তৈরি করছে।’
এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বিএনপি নেতা অভিযোগ করেন, বণিক সমিতি ও পুরোনো কমিটিকে পাশ কাটিয়ে সম্প্রতি নতুন বাজার কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাদের অনেকের বাজারেই কোনো ব্যবসা নেই। এই ভুঁইফোড় নেতারাই ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছেন। তিনি এই অন্যায়ের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
এ বিষয়ে খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসির উদ্দিন লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গত বৃহস্পতিবার দুই পক্ষকে নিয়ে বসার কথা থাকলেও বিবাদী পক্ষ উপস্থিত হয়নি। আগামী সপ্তাহে পুনরায় বসার দিন ধার্য করা হয়েছে।’
আদালতের সুস্পষ্ট রায় থাকার পরও একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর বৈধ জমি কীভাবে গায়ের জোরে দখল হয়ে যায়, তা নিয়ে কল্যাণপুর কুতুবপুর বাজারের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। এখন সবার দৃষ্টি প্রশাসনের দিকে- কবে ন্যায়বিচার পাবেন অনন্ত সরকার? ফিরে পাবেন কি তার স্বপ্নের সেই একখণ্ড জমি?


