আন্তর্জাতিক ডেস্ক | The Mail BD
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। আদালতটির কার্যক্রম সীমিত করা এবং এর সঙ্গে যুক্ত আর্থিক ও ব্যবসায়িক সহযোগিতা বন্ধ করার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন এলাকায় আইসিসির কোনো সম্পদ থাকলে তা অবরুদ্ধ করা হবে। পাশাপাশি আদালতের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে এমন মার্কিন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সেই সম্পর্ক গুটিয়ে নিতে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে। খবর রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়ে মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করার সুযোগ দেবে না। তাঁর অভিযোগ, আদালতটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অন্যায্যভাবে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা করছে। রুবিওর ভাষ্য, আইসিসির সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করে আদালতটির সম্পদ ও কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত করতে চায় ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে আদালতের কার্যক্রম নিয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
কেন আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র?
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০২ সালে। গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং আগ্রাসনের অপরাধের মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধে ব্যক্তির দায় নির্ধারণ ও বিচার করা আদালতটির মূল দায়িত্ব। জাতীয় বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে এসব অপরাধের বিচার সম্ভব না হলে বা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নিতে অনিচ্ছুক কিংবা অক্ষম হলে নির্দিষ্ট শর্তে আইসিসি হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আদালতটির সদস্য নয়। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের আপত্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া মার্কিন নাগরিকদের বিচার করার এখতিয়ার আইসিসির নেই। আদালতটির কিছু তদন্ত ও বিচারিক পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্র নিজের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবেও দেখে।
বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর আদালতটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ আরও তীব্র হয়। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় ওই পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। এ ছাড়া আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে আইসিসির অতীত তদন্তও ওয়াশিংটনের আপত্তির একটি কারণ। আইসিসির ওই তদন্তের বিষয়টি অগ্রাধিকার থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে বলে আদালত জানিয়েছে; এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে—এমনটি বলা ঠিক হবে না।
কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু আদালতের সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংক, বিমা কোম্পানি, সফটওয়্যার সরবরাহকারী ও অন্যান্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সাধারণত সতর্ক অবস্থান নেয়। ফলে আইসিসির দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় আর্থিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।আদালতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক সম্পর্ক বন্ধ হলে সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক সেবা ও অন্যান্য চুক্তি নিয়ে নতুন ব্যবস্থা নিতে হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইসিসির কর্মকর্তারা আগেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আদালতটি কম্পিউটার ব্যবস্থায় মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের বিকল্প ব্যবহারের মতো প্রস্তুতিও নিয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ অনুমতিও দিয়েছে। এর আওতায় আইসিসির টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার, পেনশন পরিশোধ এবং আদালতের হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট কিছু লেনদেন করা যাবে। ফলে নিষেধাজ্ঞা ব্যাপক হলেও সব ধরনের লেনদেন একেবারে বন্ধ এমনটি বলা যাবে না।
নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানাল আইসিসি
যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। আদালত এক বিবৃতিতে বলেছে, এ নিষেধাজ্ঞা বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি এবং আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা। আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আখানে বলেছেন, আদালত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে। গুরুতর অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আদালত আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতেই কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
আদালতটি আরও বলেছে, তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহায়তা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয়; তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশসহ মোট ১২৫টি রাষ্ট্র আদালতটির সদস্য। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা ছাড়া আদালতের পক্ষে সব দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করা কঠিন হতে পারে বলে বিবৃতিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপের উদ্বেগ, আলোচনার আহ্বান
আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে নেদারল্যান্ডস। দেশটিতে আদালতের সদর দপ্তর অবস্থিত। নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেন্ডসেন মার্কিন পদক্ষেপকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে ছয় মাসের সময়সীমা আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাড়াতে পারে। কারণ, আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইউরোপের দেশগুলোর বড় অংশ রয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আদালতটির বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছে, অন্যদিকে আদালতের সমর্থকেরা বলছেন, গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। রুবিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদেরও আইসিসির কার্যক্রম নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলছে। ওয়াশিংটনের উদ্বেগের সমাধান না হলে আদালতটির বিরুদ্ধে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আইসিসির কার্যক্রমে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে আদালতটির বিকল্প আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ওপর। তবে এ পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং গুরুতর অপরাধের দায় নির্ধারণের ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।





