কেন্দুয়া প্রতিনিধি: প্রতিদিনের মতোই বেচাকেনা শেষে হয়তো দোকান গোছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মো. খলিলুর রহমান। কিন্তু কে জানতো, রাতের শান্ত পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যেই এক ভয়ংকর নিষ্ঠুরতায় রূপ নেবে! নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার সাহিদপুর বাজারে ঘটে যাওয়া বর্বরোচিত এক ঘটনায় ওই মুদি দোকানির জীবনে এখন ঘোর অন্ধকার। পেট্রোলের আগুনে ঝলসে যাওয়া শরীর নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় তিনি এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাত তখন সাড়ে ১০টা। আশপাশের দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করেছে। ঠিক সেই সময়েই সান্দিকোনা ইউনিয়নের সাহিদপুর বাজারের খলিলুর রহমানের মুদি দোকানে ঘটে যায় রোমহর্ষক ঘটনা।
স্থানীয়দের বিবরণ ও অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় দোকানে উপস্থিত ছিলেন পার্শ্ববর্তী চেংজানা গ্রামের মৃত কাদেনামাজের ছেলে সুমন মিয়া। হঠাৎ করেই খলিলের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনের লেলিহান শিখায় মুহূর্তেই ঝলসে যায় খলিলের শরীর। পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দোকানের বেশ কিছু মালামালও।
আগুনে খলিলুর রহমানের শরীরের ৫০ শতাংশের বেশি মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছে। তার আর্তনাদে ছুটে আসেন আশপাশের মানুষ। গুরুতর ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাতেই তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার বার্ন ইউনিটে স্থানান্তরের জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্বজনরা।
এমন অমানবিক ঘটনার পেছনের কারণ নিয়ে এলাকায় চলছে নানা বিশ্লেষণ। স্থানীয় কয়েকজনের মতে, দোকানের সামান্য বাকি লেনদেন নিয়ে খলিল ও সুমনের মধ্যে বিরোধ চলছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই ক্ষোভ থেকেই সুমন ভয়াবহ এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তবে পুলিশ বলছে, এটি এখনো প্রাথমিক ধারণা মাত্র; প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গভীর তদন্ত চলছে।
ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই সাহিদপুর বাজারে ছুটে যায় কেন্দুয়া থানা পুলিশ। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে।
ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। অভিযুক্তকে ধরতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে অভিযোগ দায়ের হওয়া মাত্রই কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে এমন ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে। সান্দিকোনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “খলিলের শরীরের বিভিন্ন স্থান ভয়াবহভাবে পুড়ে গেছে। তার অবস্থা খুবই গুরুতর।”
ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত সুমন মিয়া পলাতক রয়েছেন। তার কোনো বক্তব্য বা খোঁজ পাওয়া যায়নি।
খলিলুর রহমানের স্বজনদের চোখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তার অন্ধকার। সামান্য একটি মুদি দোকান চালিয়ে যে মানুষটি জীবিকা নির্বাহ করতেন, আজ তিনি হাসপাতালের বিছানায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। স্থানীয়রা এখন দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি খলিলুর রহমানের অলৌকিক সুস্থতার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।




