নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা এক নিভৃত জনপদ রানীখং। পাশ দিয়েই বয়ে গেছে পাহাড়ি নদী সোমেশ্বরী। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীটি ধারণ করে এক রুদ্রমূর্তি। আর প্রমত্ত সোমেশ্বরীর করাল গ্রাসে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী রানীখং সাধু যোসেফ ধর্মপল্লী এবং এর আওতাধীন দুটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে চরম উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তার সেই মুহূর্তে আশার আলো হয়ে দেখা দেয় সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামালের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে আপাতত ভয়াবহ ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো।
দুর্গাপুরের ১নং কুল্লাগড়া ইউনিয়নের এই এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ি ঢল ও নদীভাঙনের শিকার। প্রতি বছর বর্ষা এলেই অজানা আতঙ্ক ভর করে স্থানীয়দের মনে। বিশেষ করে রানীখং উচ্চ বিদ্যালয়, রানীখং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সাধু যোসেফ ধর্মপল্লী নদীর একেবারেই তীরবর্তী হওয়ায় ঝুঁকিটা ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রবল স্রোতে যখন নদীর পাড় একটু একটু করে ভেঙে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীরের খুব কাছাকাছি চলে আসে, তখন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয়দের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব যখন হুমকির মুখে, তখন এলাকাবাসী বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে অবহিত করেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজ উদ্যোগে এবং নিজস্ব অর্থায়নে ভাঙনপ্রবণ স্থানগুলোতে জিওব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করেন। জরুরি এমন পদক্ষেপের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয় নদীর পাড় ভাঙন, আর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন ওই এলাকার সর্বস্তরের মানুষ।
ভয়ংকর সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে রানীখং উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এনি মৃ বলেন, “আমাদের স্কুলটা একদম নদীর গা ঘেঁষে। ভারত থেকে ঢলের পানি এলেই নদীর স্রোত ভয়ংকর রূপ নেয়। পাড় ভাঙতে ভাঙতে স্কুলের সীমানা প্রাচীর পর্যন্ত চলে আসছিল। আমরা খুব ভয়ে ছিলাম। তবে ডেপুটি স্পিকার স্যার জিওব্যাগ দিয়ে বাঁধের ব্যবস্থা করে দেওয়ায় আমরা এখন অনেকটা নিশ্চিন্ত।”
রানীখং উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রবীর পলিনোস রিছিল জানান, বর্ষায় উত্তাল সোমেশ্বরীর স্রোতে স্কুলের ওয়ালগেটের পাশে বিশাল এক গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি বলেন, “প্রতি বছর গর্তটি বড় হয়ে বিদ্যালয়ের গেটটি প্রায় ধসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ঠিক সে সময়েই মাননীয় ডেপুটি স্পিকার মহোদয়ের নজরে আসে বিষয়টি। তার নিজস্ব অর্থায়নে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলায় ভাঙন আপাতত বন্ধ রয়েছে। আমরা তার প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।”
দীর্ঘদিনের আতঙ্ক থেকে মুক্তি পাওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ধর্মপল্লীর সিস্টার মিলিনিউটি। তিনি বলেন, “বর্ষা ও বন্যার সময় পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবল বেগে নেমে এলে নদীভাঙন শুরু হয়। মিশনের আশপাশেও ভাঙন দেখা দিয়েছিল। মহোদয় আমাদের জন্য বাঁধের ব্যবস্থা করে দেওয়ায় আমরা তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”
একইভাবে রানীখং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুমা আরেংও পাহাড়ি নদী সোমেশ্বরীর ভয়ংকর রূপের কথা তুলে ধরে সময়োপযোগী পদক্ষেপের জন্য সাধুবাদ জানান। স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জানান, সময়ের সঙ্গে ভাঙন বাড়তে থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা, বসতবাড়ি ও স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল, যা বর্তমান পদক্ষেপে অনেকটাই লাঘব হয়েছে।
আপাতত জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ করা গেলেও, এটি একটি সাময়িক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। স্থানীয়দের চাওয়া এখন একটি স্থায়ী সমাধান। শিক্ষার্থী এনি মৃ থেকে শুরু করে প্রধান শিক্ষক প্রবীর পলিনোস রিছিল এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সবার একটাই দাবি- দীর্ঘমেয়াদে শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান ও জনপদকে বাঁচাতে সিসি ব্লক স্থাপনের মাধ্যমে টেকসই নদীতীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ করা হোক।
জরুরি এমন উদ্যোগ শুধু ইট-পাথরের কয়েকটি ভবনকেই রক্ষা করেনি, বরং বাঁচিয়ে রেখেছে শত বছরের ইতিহাস, হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং এই জনপদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এখন অপেক্ষার পালা স্থায়ী সমাধানের, যা সোমেশ্বরীর তীরের মানুষগুলোকে দেবে চিরস্থায়ী নিরাপত্তা।




