নিজস্ব প্রতিবেদক: বর্ষাকাল মানেই হাওরের রূপ বদল। দিগন্ত বিস্তৃত থইথই জলরাশি, যেন কূলহীন এক সাগর। নেত্রকোনার হাওরবেষ্টিত উপজেলা খালিয়াজুরী এ সময় যেন পরিণত হয় বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে। সড়ক যোগাযোগের কোনো চিহ্নমাত্র থাকে না। চারপাশের অথৈ জলে জেলা সদর বা অন্য কোনো উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা নৌকা। স্বাভাবিক সময়ে জলযাত্রা কিছুটা সাধারণ মনে হলেও চরম বিপত্তি ঘটে জরুরি মুহূর্তে। বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগীদের জন্য থইথই জলরাশি হয়ে ওঠে এক আতঙ্কের নাম। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে, বিশেষ করে মধ্যরাতে বা বৈরী আবহাওয়ায় কোনো নৌযান পাওয়া যায় না। তখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীদের নিয়ে স্বজনদের দিশেহারা হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
কখনো কখনো জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে চরম অসহায়ত্বের শিকার হতে হয় হাওরবাসীকে। বাধ্য হয়ে চড়া ভাড়ায় ট্রলার রিজার্ভ করে খালিয়াজুরীর বোয়ালীঘাট, মদন উপজেলার উচিতপুর কিংবা দিরাই উপজেলার শ্যামারচর ঘাটে ছুটতে হয়। দরিদ্র, অসচ্ছল ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা জোগাড় করা যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমন পরিস্থিতিতে অনেক সময় সঠিক চিকিৎসার অভাবে চোখের সামনেই নিভে যায় প্রিয়জনের প্রাণ।
ঠিক এমন এক ঘোর অমানিশায়, হাওরের বুকে মানবতার আলোকবর্তিকা হয়ে এসেছে একটি ব্যক্তিগত স্পিডবোট। মুমূর্ষু রোগীদের বিনামূল্যে জরুরি নৌযান সেবা দিতে নিজের স্পিডবোট নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর গ্রামের আসিফ ইকবাল চৌধুরী শাকিল। তার মহতী উদ্যোগে হাওরের বুকে যেন এখন স্বস্তির সুবাতাস বইছে।
খালিয়াজুরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন কিংবা যাদের জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ বা অন্যত্র নেওয়া প্রয়োজন- এমন রোগীদের জন্য শাকিল তার ব্যক্তিগত স্পিডবোটটি সম্পূর্ণ বিনা ভাড়ায় ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছেন। বয়স্ক রোগী, গর্ভবতী ও প্রসূতি মা, শিশু এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত উপজেলা সদরের বাইরে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এই স্পিডবোট এখন আক্ষরিক অর্থেই ‘লাইফ সাপোর্ট’ হিসেবে কাজ করছে। রোগীদের শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বোয়ালীঘাট, উচিতপুর কিংবা শ্যামারচর ঘাট পর্যন্ত নিরাপদে ও দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাধিক মুমূর্ষু রোগী এই স্পিডবোটের মাধ্যমে বিনামূল্যে জরুরি সেবা পেয়ে নতুন জীবন লাভ করেছেন।
উপকারভোগীদের চোখে-মুখে এখন কেবলই কৃতজ্ঞতার অশ্রু। খালিয়াজুরী সদরের বাসিন্দা অরবিন্দু দেবের কণ্ঠে ঝরে পড়ে সেই স্বস্তি। তিনি জানান, গত ১ আগস্ট রাতে তার বৃদ্ধা মা হঠাৎ স্ট্রোক করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। মাকে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই চরম উৎকণ্ঠার মুহূর্তে ত্রাতা হয়ে আসে শাকিলের স্পিডবোট। বিনামূল্যে মাত্র ২০ মিনিটে মাকে নিয়ে বোয়ালী পৌঁছাতে সক্ষম হন তিনি। অরবিন্দু বলেন, “দ্রুত হাসপাতালে নিতে পারায় আমার মা এখন অনেকটাই সুস্থ। এতে আমাদের সময় ও যাতায়াত খরচ- দুটোই বেঁচে গেছে। শাকিল ভাইয়ের সহায়তা না পেলে সেদিন কী হতো, তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।”
নগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য অমর চৌধূরী এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “বিনা পয়সায় স্পিডবোট সার্ভিসটি আমাদের অবহেলিত হাওরের গরিব ও অসহায় রোগীদের জন্য রীতিমতো আশীর্বাদ। খালিয়াজুরীতে প্রয়োজনের সময় ভালো যানবাহন পাওয়া স্বপ্নের মতো। শাকিলের এমন ব্যক্তিগত উদ্যোগে রোগীরা যেভাবে উপকৃত হচ্ছেন, তার কোনো তুলনা হয় না। তিনি সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।”
কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মুসা মিয়ার অভিজ্ঞতা আরও বেশি আবেগঘন। তিনি বলেন, “শাকিল ভাইয়ের স্পিডবোট সেবা না পেলে আমার ছোট ভাইকে হয়তো আর বাঁচানোই সম্ভব হতো না। স্ট্রোক করার পর চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে দ্রুত ময়মনসিংহে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। স্পিডবোটে শাল্লা থেকে উচিতপুর খুব অল্প সময়ে পৌঁছাতে পারায় আল্লাহর রহমতে ভাইকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছি। এ বছর কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এত টাকা খরচ করে ট্রলার ভাড়া করে যাতায়াত করা আমাদের মতো পরিবারের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ছিল।”
মানবতার খেয়ার নিবেদিতপ্রাণ মাঝি হলেন স্পিডবোট চালক মো. উছমান মিয়া। তিনি জানান, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি নিজেই এই বোট পরিচালনা করেন। রাতে কেবল বৈরী আবহাওয়া ও নিরাপত্তাজনিত কারণে সার্ভিসটি সাময়িক বন্ধ রাখতে হয়। উছমান মিয়ার কথায়, “উন্নত চিকিৎসার পর রোগী যখন সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন এবং স্বজনরা এসে কৃতজ্ঞতা জানান, তখন বুকের ভেতরটা শান্তিতে ভরে যায়। অনেক অসহায় ও দরিদ্র রোগী এই সেবা পেয়ে দুহাত তুলে দোয়া করেন। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওনা।”
ব্যক্তি উদ্যোগের এমন মানবতা যখন হাওরবাসীর মুখে হাসি ফোটাচ্ছে, তখন সরকারি অব্যবস্থাপনার এক করুণ ও হতাশাজনক চিত্রও ফুটে উঠেছে খালিয়াজুরীতে। স্থানীয়রা জানান, ২০১৭ সালে আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের কৃষকদের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখতে খালিয়াজুরী সফরে এসেছিলেন তৎকালীন রাস্ট্র প্রধান। সে সময় হাওরবাসীর স্বাস্থ্যসেবার কথা বিবেচনা করে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য একটি আধুনিক নৌ-অ্যাম্বুলেন্স উপহার দিয়েছিলেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দক্ষ চালকের অভাব এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অমূল্য সেই নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ধরে ঘাটে বাঁধা থেকে এখন সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
এ বিষয়ে খালিয়াজুরী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আরিফিন আজিমের কণ্ঠেও ফুটে ওঠে অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, “হাওরাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো এই নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা। ২০১৭ সালে পাওয়া নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটি দক্ষ চালক ও অন্যান্য সুবিধার অভাবে আজ অকেজো। আমরা মুমূর্ষু রোগীদের কথা চিন্তা করে নতুন আরেকটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন পাঠিয়েছি।”
শাকিলের স্পিডবোট সার্ভিস সম্পর্কে ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) এ বিষয়ে অবগত আছেন। কোনো মুমূর্ষু রোগীর জরুরি প্রয়োজনে আরএমও শাকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে বিনামূল্যে স্পিডবোট পাঠিয়ে দেন। দুর্গম হাওরাঞ্চলে ব্যক্তিগত এই সেবার কারণে রোগীরা যে অভাবনীয়ভাবে উপকৃত হচ্ছেন, তা অকপটে স্বীকার করেন তিনি।
খালিয়াজুরীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামান বলেন, “বিনা ভাড়ায় শাকিল চৌধূরীর স্পিডবোট সার্ভিস দেওয়ার বিষয়টি প্রশংসনীয়। এটি জনস্বার্থে চমৎকার ব্যক্তিগত উদ্যোগ। সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটি অকেজো থাকায় নতুন নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।”
মানবতার সেবক আসিফ ইকবাল চৌধুরী শাকিল তার উদ্যোগ প্রসঙ্গে বলেন, “খালিয়াজুরী হাওর এলাকা। বর্ষাকালে এখানকার মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌযান। মুমূর্ষু রোগীদের সময়মতো উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে নিতে না পারলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। তাই আমার ব্যক্তিগত স্পিডবোটটি অসুস্থ রোগীদের জন্য বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছি। একজন অসুস্থ মানুষকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারাটাই আমার কাছে তৃপ্তির। যতদিন প্রয়োজন হবে, মানবিক দিক বিবেচনা করে এই সেবা চালু রাখার চেষ্টা করব।”
সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সচল না থাকায় শাকিলের স্পিডবোটই এখন হাওরবাসীর প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত মেরামত করে দক্ষ চালক নিয়োগের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা জরুরি নৌযান ব্যবস্থা চালু করা হোক। এতে হাওরবাসীর চিকিৎসাসেবায় দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।


